মহাসংকটে বিএনপি

গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ১০ অক্টোবর

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:১৮

প্রতীক ইজাজ

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে। দুর্নীতিসহ নানা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘদিন লন্ডনে পালিয়ে। সহিংসতাসহ নানা ধরনের মামলায় পলাতক দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা ও কর্মী। ফলে দলের অবস্থা খুবই নাজুক। খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ও নির্বাচনী দাবি আদায়ে বারবার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েও মাঠে নামতে পারছে না দল। নানা ইস্যুতে দলের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে। তৃণমূল আস্থা রাখতে পারছে না কেন্দ্রের ওপর। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১০ অক্টোবর ঘোষণা হতে যাওয়া বর্বরোচিত ও নৃশংস ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলেছে বিএনপিকে। ফেলেছে মহাসংকটে। এই রায় পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশেষ করে নির্বাচনী রাজনীতি ও নির্বাচন কীভাবে সামাল দেবে দলটি—এ নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় এখন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা।

এ নিয়ে নানা আলোচনা রাজনীতিতে। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মতো বাকি। নানা নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ সামনে। যদিও বলা হচ্ছে খালেদা জিয়াকে ছাড়াই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে বিএনপি; কিন্তু এর জন্য চোখে পড়ার মতো কোনো প্রস্তুতি দৃশ্যমান হচ্ছে না। অথচ ৩০ অক্টোবরের পর যে কোনো দিন নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। এর আগেই ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে দলকে। সব বোঝাপড়া শেষ করতে হবে নিজেদের ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে। সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনী মাঠে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনী দাবি আদায়ে অব্যাহত রাখতে হবে আন্দোলন। অথচ দলের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় নির্বাচনী মাঠে এখনো শক্তভাবে দাঁড়াতে পারছে না দল। তারপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় নতুন করে সংকটে ফেলবে দলকে।

যদিও দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সরকার ষড়যন্ত্র করে বিএনপিকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে। কিন্তু দল সব চ্যালেঞ্জ ও সংকট মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। কিন্তু দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে, এই মামলার রায়সহ সার্বিক বিষয়ে দল আরো বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। নেতৃত্ব শূন্য হবে। নতুন সংকট ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ নিয়ে দল বিপদে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা ছিল বর্বরোচিত ও নৃশংস। হামলায় ২৪ নেতাকর্মীর মর্মন্তুদ মৃত্যুর পাশাপাশি শতাধিক নেতাকর্মী মারাত্মক আহত হন। সে সময় বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় ছিল। মামলায় বিএনপির তারেক রহমানসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা আসামি। রাষ্ট্রপক্ষ মনে করছেন, মামলায় আসামিদের বড় ধরনের সাজা হতে পারে। যদি তাই হয় সেক্ষেত্রে বিএনপিতে নতুন করে নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দেবে। ভাবমূর্তিরও বিষয় আছে। এসব পরিস্থিতি নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। দলটি এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয় সেটিই দেখার বিষয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মোট ৫২ জন আসামি। তারেক রহমানসহ মোট ১৯ জন আসামিকে পলাতক দেখানো হয়েছে। তারেক রহমান ছাড়াও পলাতকের তালিকায় বিএনপির কয়েকজন নেতা ও ঘনিষ্ঠদের নাম রয়েছে। এরা হলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ। এছাড়া আসামিদের মধ্যে বিএনপি নেতা ও ঘনিষ্ঠজনদের নাম রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম খালেদা জিয়ার বোনের ছেলে ও তার এপিএস লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক। হাজতি ২৫ জন আসামির নামের তালিকার মধ্যে রয়েছেন মুফতি হান্নান মুন্সী, বিএনপি সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী মো. আবদুস সালাম পিন্টু ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. লুৎফুজ্জামান বাবর এবং সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। মুফতি হান্নান ও আলী আহসান মুজাহিদের অন্য মামলায় এরই মধ্যে মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে।

এই মামলার রায় পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চলছে রাজনীতিতে। এর ফলে বিএনপি নতুন করে সংকটে পড়বে—এমন আশঙ্কা করছেন স্বয়ং ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হলে তারা (বিএনপি) নতুন করে সংকটে পড়বে। কারণ বিএনপি সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে, হাওয়া ভবনের সরাসরি পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সেদিন ওই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছিল। এখন এই মামলার রায় হচ্ছে—এজন্য সবাই খুশি। বিএনপি কেবল অখুশি। চিন্তিত। তারা জড়িত বলে তাদের এই গাত্রদাহ। কারণ রায় বের হলে তারা নতুন করে সংকটে পড়বে। তারা এমনিতেই সংকটে রয়েছে।

তবে এ নিয়ে কোনো কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় নিয়ে এখন কোনো মন্তব্য করব না, আনুষ্ঠানিকভাবে বলব।

বিএনপি দলীয় সূত্র মতে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সাজা হতে পারে। সেটি হলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে বিএনপি আরো একটি বড় সংকটের মুখে পড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা জানান, বিএনপি ক্লান্ত। প্রায় ৭৮ হাজার মামলায় ১৫ লাখেরও বেশি বিএনপি কর্মী আসামি। মামলার কারণে এরই মধ্যে মাঠছাড়া বিএনপির কর্মীরা। মামলা থাকায় নেতারাও মাঠে নামছেন না। ফলে কোনো আন্দোলনই জমাতে পারছে না দলটি। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতি মামলায় দন্ডিত হয়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর বড় ধরনের আন্দোলনের সম্ভাবনা দেখেছিলেন অনেকে। কিন্তু দল সেখানেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

বিএনপির নেতারা আরো জানান, খালেদা জিয়া গ্রেফতারের পর জনগণের সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি মাঠ গোছাতে পারবে বলেও ভেবেছিলেন অনেকে। কিন্তু তাও হয়নি। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিদেশে ‘পলাতক’ তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পাওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীরা কিছুটা সাহস ধরে রেখেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে তারেক জিয়ার নির্দেশেই নির্বাচনকালীন সরকার ও খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং আন্দোলন একসঙ্গে চালাবেন। কিন্তু তা হয়নি। উল্টো নেতৃত্ব নিয়ে এখন দলের মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলা চলছে। এর মধ্যে যদি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয় এবং তাতে তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা দণ্ডিত হন তাহলে দলটি সত্যিকার অর্থেই বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।

বিএনপি এমনও মনে করছে, আলোচিত এ মামলার রায়ে তারেক রহমানের সাজা হলে জনগণের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার জন্য জনগণের যে সহানুভূতিটুকু জন্ম নিয়েছিল, তারেক রহমানের সাজার মধ্য দিয়ে ঠিক ততটাই অনাগ্রহও তৈরি হতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে সেটি হবে বিএনপির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা বা চাপ। নির্বাচনের আগে এমন চাপ দলের ভেতর ও বাইরে, এমনকি জোট রাজনীতিতেও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

এই মামলার রায়ের ব্যাপারে সতর্ক সরকার ও আওয়ামী লীগও। রায় পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উভয়পক্ষ প্রস্তুত বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ মনে করছে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টায় লিপ্ত হতে পারে বিএনপি। সেইসঙ্গে দুর্নীতির মামলায় কারারুদ্ধ খালেদা জিয়ার আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে দেশজুড়ে অস্থির পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। এ কারণেই বিএনপির ওপর সতর্ক নজর রাখছে ক্ষমতাসীনরা। প্রয়োজনে কঠোর হবে। বিএনপিকে নিরুত্তাপ কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হচ্ছে। আন্দোলন-সংগ্রামের নামে জনগণ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের চেষ্টা হলে সরকার যেকোনো মূল্যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত থাকবে। সেইসঙ্গে দলের নেতাকর্মীরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকবেন।

পিডিএসও/হেলাল