বিএনপির সামনে কঠিন সময়

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:২০ | আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৪:০৬

প্রতীক ইজাজ ও বদরুল আলম মজুমদার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র চার মাসের মতো বাকি। আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত ক্ষণগননা। ডিসেম্বরের শেষের দিকে নির্বাচন করতে চায় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ সরগরম নির্বাচনী রাজনীতি। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই প্রথমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের নির্বাচনী ভাবনা প্রকাশ করেছেন। ঠিক একইভাবে রাজধানীতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করে নির্বাচনকেন্দ্রিক দাবি দাওয়া তুলে ধরেছে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি জোট রাজনীতিও গতি পেয়েছে। নির্বাচনী প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে এনেছে নির্বাচন কমিশনও।

এমন পরিস্থিতিতে দেশে নির্বাচনী আলোচনার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। এর মধ্যে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্ভার থাকলেও বেশ বেকায়দায় ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। কঠিন সময় পার করছে দলটি। দিন যত যাচ্ছে দলের নির্বাচনী রাজনীতিতে সংকট ততই বাড়ছে। ঠিক এই মুহূর্তে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মোটা দাগের তিন ধরনের চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে দলের সামনে। এগুলো হলো সাংবিধানিক, আইনগত ও রাজনৈতিক। এর মধ্যে মূল উদ্বেগ দেখা দিয়েছে খালেদার জিয়ার মুক্তির বিষয়টি। মুক্তি না পেলে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই দলটি নির্বাচনে যাবে কিনা—সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে দলের পক্ষে। এমনকি জামিনে মুক্তি পেলেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা—সে ভাবনাও রয়েছে। এমন অবস্থায় সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় হতে পারে—আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্য রায় পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আরো বেশি উদ্বেগে ফেলেছে দলকে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সংবিধানের ক্ষেত্রে সরকার শেষ পর্যন্ত ছাড় দেবে না—এমনটা ভেবে নিয়েই দল নির্বাচনের পথে হাঁটছে। কিন্তু বড় সংকট দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। নির্বাচনকেন্দ্রিক দাবি আদায় ও দলকে গুছিয়ে নির্বাচনের জন্য সংগঠিত করা শেষ পর্যন্ত ঠিক কোন অবস্থায় পৌঁছাবে তা এখনোবুঝতে পারছেন না তারা। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন রক্ষা করতে হলে এবার বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে। কিন্তু দলের সাংগঠনিক যে অবস্থা তাতে মাঠে ঠিক কতটা শক্ত অবস্থান নিতে পারবে দল এ নিয়েও সংশয় রয়েছে। এমনকি খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ নির্বাচনী দাবি আদায়ে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্যসহ যে জোট রাজনীতির ওপর এত দিন ভরসা করেছিল দলটি, যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামী প্রশ্নে এখন সেখানেও হতাশ হতে হচ্ছে। কারণ যুক্তফ্রন্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, জামায়াতকে না ছাড়লে বিএনপিকে ফ্রন্টে নেওয়া হবে না। অবশ্য এর আগে কারাগারে থেকে খালেদা জিয়া নিজেদের ২০ দলীয় জোটের ঐক্যের ওপর জোর দিতে বলেছেন। ফলে রাজনীতির মাঠে বিএনপিকে একাই লড়তে হবে বলে মনে করছেন দলের এসব নীতিনির্ধারক।

অন্যদিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিএনপির এমন সব দাবি শেষ পর্যন্ত টিকবে না বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞরা। বিএনপি নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ, নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির প্রতিনিধি রাখা ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের মধ্য থেকে এসব দাবি পূরণ সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সেটা নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। কিন্তু সরকার বলছে নির্বাচন হবে সংবিধানের মধ্যে থেকেই। ফলে বিএনপির এসব দাবি শেষ পর্যন্ত পূরণ হচ্ছে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। এমনকি ইভিএম নিয়ে বিএনপির যে ইস্যু, শেষ পর্যন্ত সেখানেও সরকার নমনীয় হওয়ায় এই ইস্যুটিও হাত ছাড়া হতে চলেছে বিএনপির।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মূল দায়িত্ব সরকারের। নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে তা সরকার চাপিয়ে না দিয়ে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। একইভাবে বিএনপিরও উচিত হবে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়েই নির্বাচনে অংশ নেওয়া। সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাাশি গণতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে সংবিধানে এসব ইস্যুর ব্যাপারে সুস্পষ্ট বিধান থাকায় এবং এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা অব্যাহত থাকায় শেষ পর্যন্ত এসব ইস্যু কোনো সংকট তৈরি করবে না বলে মত দিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে কিনা—সবকিছুই সংবিধানের ১১৮-১২৬ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে। এক কথায় বলতে গেলে, নির্বাচন করবে ইসি, তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে সরকার। সহযোগিতার বিষয়টি সরকারের দায়িত্ব নয়, সাংবিধানিক কর্তব্য। নির্বাচনের সময় সরকার ছোট হবে, ইসি বড় হবে। আর এসব যদি আলোচনা করে ঠিক করতে পারি তাহলে সংকট হবে না। এজন্য আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট সবারই উচিত ইসিকে সহযোগিতা করা।

সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে কী নির্দেশনা রয়েছে—জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংবিধানের ৫৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকিবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে যেরূপ স্থির করিবেন সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী লইয়া এই মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে।’

৫৬ অনুচ্ছেদের দুই উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।’

নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারে সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই। প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করতে পারেন। যদি তিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা হারান অথবা রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের জন্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন কাউকে না পান, কেবল ওই কারণেই রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিতে পারেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন কাউকে পাওয়া গেলে মেয়াদ অবসানের একদিন আগেও রাষ্ট্রপতির সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা নেই।

নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের যে দাবি, সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংসদের মেয়াদ শেষের ৯০ দিনের মধ্যে। ফলে সরকারের পদত্যাগের প্রশ্ন ওঠে না। কোনো কারণে যদি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগও করেন তাহলেও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আস্থাভাজন কাউকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন।

একইভাবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী সেনা মোতায়েনে বিএনপির দাবির কোনো যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় পুলিশ, আর্মড পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীর কথা নেই।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক সংকটও বেশ ভাবনায় ফেলেছে বিএনপিকে। বিশেষ করে দলের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভালো না। গত ১০ বছরেও দলকে নির্বাচনী সংগঠনে রূপ দেওয়া যায়নি। দলের পুনর্গঠনও কাক্সিক্ষত মাত্রা পায়নি। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিভিন্ন জেলা ও থানা কমিটি গঠন থেমে আছে। কোন্দল ও প্রতিবাদের ভয়ে ছাত্র ও যুবদলের কমিটি ঘোষণা দিতে পারছেন না দলের হাইকমান্ড। মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই বছর পরও কমিটি ঘোষণা হয়নি ছাত্রদলের।

দলের শীর্ষ দুই কান্ডারী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের আগে দল ও জোটকে অটুট রাখার বিষয়ও বিএনপিকে ভাবিয়ে তুলেছে। দলের একটি সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে সরকারি দল বিএনপিকে যেমন ভাঙার চেষ্টা করবে, আবার টেকনোক্রেট কোটায় জোটের দুই-একজনকে সরকারের নেওয়ার পরিকল্পনার বিষয়েও অবগত বিএনপির হাইকমান্ড। এমন অবস্থায় নিজের জোট ধরে রাখার বিষয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে সর্তক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন কারারুদ্ধ চেয়ারপারসন। দলের ও জোটের নেতাদের কাউকে কাউকে বাগে নিতে পারলে বিএনপিকে সরকার দুর্বল করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিএনপি অংশ না নিলে জোট ও জোটের বাইরের কিছু রাজনৈতিক দল সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এমনকি বিএনপিরও একটি খন্ডিত অংশকেও নির্বাচনে নিতে সক্ষম হতে পারে সরকার।

তবে এসব পরিকল্পনায় সরকার কখনো সফল হবে বলে মনে করেন না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সরকার তো অনেক পরিকল্পনা নিয়েই হাঁটছে। কোনোটাতে সফল হতে পারবে না। বিএনপি ও তার জোট আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে। যদিও বলা হচ্ছিল খালেদাকে জেলে গেলে বিএনপি ভেঙে যাবে। বর্তমান সময়ে সরকারের এমন অবস্থা নেই যে, যে কেউ তাদের সাড়া দেবে। আমি মনে করি প্রতিটি গণতন্ত্রমনা দল ডুবন্ত একটি সরকারকে সঙ্গ দিতে যাবে না।

পিডিএসও/হেলাল