প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট বার্তা

সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চায় সরকার

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৫৬ | আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:০৩

প্রতীক ইজাজ

আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত ক্ষণগণনা। চলতি সেপ্টেম্বরেই ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলোচিত নানা ইস্যুর সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে। এরই মধ্যে এ নিয়ে বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে নির্বাচনী রাজনীতি। নিজেদের অবস্থান ও নির্বাচনী ভাবনা জানান দিতে নতুন করে মাঠেও নেমেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।

ঠিক এমন সময়ে গত রোববার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারের মনোভাব তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে দেশের নির্বাচনী রাজনীতি আরেক দফা গতি পেল। এত দিন ধরে চলে আসা নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা ইস্যুর ব্যাপারে সরকারের মনোভাবও স্পষ্ট হলো।

বিশেষ করে ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে। এই সময়ে সবচেয়ে আলোচিত যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারটি সরকার ইতিবাচক হিসেবে নিলেও সরকারের মধ্যে এ নিয়ে যে সমালোচনা রয়েছে তাও প্রকাশ পেয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ইভিএম চাপিয়ে না দিয়ে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পক্ষে সরকারের মত তুলে ধরেছেন শেখ হাসিনা।

নির্বাচন নিয়ে এত দিন ধরে চলে আসা বিএনপির নানা রাজনৈতিক বক্তব্যেরও জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও দল উত্থাপিত নির্বাচনকেন্দ্রিক অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধানে সংলাপের ব্যাপারে সরকারের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপির নির্বাচনী রাজনীতিতে কোনো ধরনের বাধা না দেওয়ার কথা যেমন বলেছেন; তেমনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিতান্তই দলের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এজন্য কোনো ধরনের সংলাপের সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন।

অবশ্য নির্বাচনী রাজনীতিতে এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের এমন মনোভাবকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। দল মনে করছে, এর মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মহলে নির্বাচনকে ঘিরে যেসব প্রশ্ন ছিল, তার উত্তর মিলল। একই সঙ্গে যদি কারো মধ্যে কোনো ধরনের সংশয় থেকে থাকে তাও দূর হবে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের বার্তা পেল। আগে থেকেই মাঠে থাকা দলের নেতাকর্মীরা আরো বেশি সোচ্চার হবেন।

এ ব্যাপারে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নির্বাচনের জন্য ইতিবাচক। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যেটুকু সমালোচনা ছিল, এবার যেন সে সুযোগও কেউ না পায়—আমাদের সভাপতি শেখ হাসিনা তা অনেক আগেই আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি দলকেও বলেছেন, এবারের নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। দলকে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে বলেছে। আমরাও সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্য সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সেই মনোভাবই আরেকবার প্রকাশ পেল।

এই মনোভাব ও সদিচ্ছা সার্বিক নির্বাচনী রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।

তবে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছে। দল মনে করছে, বিএনপির ব্যাপারে সরকার এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মনে হচ্ছে, সরকার কোনো ব্যাপারেই ছাড় দেবে না। বিশেষ করে এই বক্তব্যের পর নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপি প্রতিনিধি না রাখা ও নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন ইস্যুতে সংলাপের ব্যাপারে দল হতাশ। এমনকি যে যুক্তফ্রন্ট বা জাতীয় ঐক্যের কথা ভাবা হচ্ছে সেখানেও সরকার বিএনপিকে খুব একটা সুবিধা করতে দেবে না বলেও ধারণা করছেন দলের নেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিএনপিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন তাতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছেও দলের করুণ অবস্থা ফুটে উঠেছে। বিএনপি নির্বাচনে না গেলেও সরকার নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করবে—সেই আভাস মিলছে।

এ ব্যাপারে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য গোটা জাতিকে হতাশ করেছে। সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন করার ইচ্ছা বর্তমান সরকারের নেই—তা স্পষ্ট হয়েছে। তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি নিরপেক্ষ নির্বাচন কীভাবে করতে হয় তা দেখিয়ে দেবে বলেও মন্তব্য করেন এই নেতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে সরকারের জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে সার্বিক চিত্র উঠে এসেছে বলে মনে করছেন। তাদের মতে, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেসব ইস্যু আলোচনায় সরকার সেগুলো তুলে ধরেছেন। এমনকি এসব ইস্যুতে বিএনপি বা অন্য কোনো মহল যেন কোনো ধরনের আন্দোলনের সুযোগ নিতে না পারেÑ সে দিকে লক্ষ্য রেখে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের কথাও প্রকাশ পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি তা হলো নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সরকার তাদের দৃঢ়তা প্রকাশ করেছে। সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, নির্বাচন হবে, রাজনৈতিক জোট হোক—একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই। নির্বাচন হবে, নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারো নেই। ষড়যন্ত্র আছে, থাকবে। তাই বলে ভয় করে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। মৃত্যু লেখা থাকলে, হবে।

বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবির সঙ্গে দুর্নীতির মামলায় দ-িত তাদের দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তির শর্তও যোগ করেছে। তারা সংলাপ ডাকতে সরকারকে আহ্বান জানিয়ে আসছে। গত শনিবার ঢাকায় এক সমাবেশে বিএনপি নেতারা বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং ভোটের তফসিল ঘোষণার আগে শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না তারা।

এসব দাবির ব্যাপারেও সরকারের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে কোনো পদক্ষেপ তো নেবেনই না, তাদের সঙ্গে আর কখনো সংলাপে বসার সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালে খালেদা জিয়ার ছেলের মৃত্যুর পর সান্ত¡না জানাতে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে আসার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তার সঙ্গে আর কখনো কোনো আলোচনায় বসতে এই অনাগ্রহের কথা জানান শেখ হাসিনা। এমনকি খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারেও কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি পাওয়া না পাওয়া আদালতের বিষয় এক্ষেত্রে সরকারের কিছু করার নেই। খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে গ্রেফতার করা হয়নি। সে গ্রেফতার হয়েছে এতিমের টাকা চুরি করে। এখন মুক্তি পেতে হলে কোর্টের মাধ্যমে পেতে হবে। আর যদি দ্রুত চায় তাহলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবে।

বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তাদের দল যদি মনে করে (নির্বাচন) করবে না, করবে না। যদি মনে করে করবে, করবে। এটা বিএনপির সিদ্ধান্ত, তারা কী করবে, না করবে। এখানে তো আমাদের বাধাও দেওয়ার কিছু নেই বা দাওয়াত দেওয়ারও কিছু নেই।

বিশেষ করে এই মুহূর্তে আলোচিত নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে সরকারের মনোভাবও উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। সেখানে আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, এটা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ এটা প্র্যাকটিসের ব্যাপার। আমাদের পরীক্ষামূলক করে দেখতে হবে।

২০১০ সালে বাংলাদেশে চালুর পর এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেই কেবল ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) পরীক্ষামূলক ব্যবহার হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবহারের জন্য ইসি এরই মধ্যে নির্বাচনী আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছে। এক-তৃতীয়াংশ আসনে ইভিএম ব্যবহারের একটি পরিকল্পনার কথা প্রকাশ পেলেও সিইসি বলেছেন, তারা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। ইসির আকস্মিক পদক্ষেপের পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম ইভিএম নিয়ে। বিএনপি এর বিরোধিতা করে বলেছে, ভোটে ‘ডিজিটাল কারচুপি’ করতে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা হচ্ছে। গত রোববারের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাও পাল্টা বলেন, কারচুপি করতে পারবে না বলে বিএনপি ইভিএমে আপত্তি জানাচ্ছে। এর জন্য তিনি মাগুরা ও ঢাকা-১০ আসনের নির্বাচনে বিএনপির ভোট কারচুপির কথা উল্লেখ করে বলেন, ইভিএমে এই সুযোগ নেই, এ কারণে বিএনপি এটি চায় না।

সম্প্রতি জোট নিয়ে যে আলোচনা রাজনীতিতে, সরকার সে ব্যাপারেও তাদের মনোভাব প্রকাশ করেছে। কামাল হোসেনের গণফোরামের সঙ্গে বি চৌধুরীর যুক্তফ্রন্টের ঐক্যবদ্ধ হওয়াকে স্বাগত জানালেও তাদের ‘অগণতান্ত্রিক পথে’ ক্ষমতায় যাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে সমালোচনাও করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা নতুন জোট যুক্তফ্রন্টের নেতাদের রাজনৈতিক জীবনের ব্যবচ্ছেদও করেন এবং বিভিন্ন সময় তাদের সমালোচিত রাজনীতি তুলে ধরেন। পাশাপাশি বিএনপি ভোটে না এলে যুক্তফ্রন্টের অংশগ্রহণ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে আশা করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

বিএনপির নিরপেক্ষ সরকারের দাবিরও উত্তর মিলেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। ভারতে নির্বাচনের সময় পার্লামেন্ট বহাল থাকে উদাহরণ দিয়ে বিএনপির নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিও নাকচ করে দেন শেখ হাসিনা।

পিডিএসও/হেলাল