জামায়াত ছাড়ছে না বিএনপি

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৫০

বদরুল আলম মজুমদার

বহুল আলোচিত যুক্তফ্রন্ট বা জাতীয় ঐক্যের মতো জোট-মহাজোট যাই হোক বিএনপি জামায়াতকে ছাড়ছে না। নিজেদের ২০ দলীয় জোট অটুট রেখেই সামনে এগোবে বিএনপি।

বিএনপি থেকে জামায়াতকে এমন সংকেত দিয়ে রাখা হয়েছে। তাই আপাতত জাতীয় ঐক্য নিয়ে কোনো প্রকার মন্তব্যও করবে না জামায়াত। এ সময় দলটি নিজেদের কর্মকৌশল নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। আগামী নির্বাচনে প্রায় ৩৫টি আসনে নির্বাচন করার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াত। বিএনপি ও জামায়াতের সূত্রগুলো এমনটা নিশ্চত করেছে।

অতীতে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, বিএনপির সামনের সারির কিছু নেতা জামায়াতকে জোট থেকে বাদ দিতে তৎপর থাকলেও দলের শক্তিশালী একটি পক্ষ বরারবই জামায়াতের পক্ষে ছিল। আবার দলের দুই শীর্ষ নেতাও জামায়াতের ব্যাপারে বরারবই নমনীয়। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জেলখানায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে নিজেদের জোট ধরে রাখার ব্যাপারে কড়া নির্দেশনা পান। খালেদা জিয়ার নির্দেশনার পর জামায়াতও অনেকটা ‘রিলাক্স’ মুডে।

কেননা, জাতীয় ঐক্যের কথা বলে এখনই জামায়াতকে জোট থেকে বের করার চেষ্টায় ছিলেন বিএনপির কিছু নেতা। যুক্তফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তারাও এখনই জামায়াতকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারে বেশ তৎপর ছিলেন। কিন্তু সর্বশেষ মির্জা ফখরুল বেগম জিয়ার পক্ষ থেকে সংকেত পাওয়ার পর সে আলোচনা আপাতত বিএনপির পক্ষ থেকে আর উঠবে না বলে দলের একজন সিনিয়র নেতা জানান।

বিএনপি নেতারা মনে করেন, জামায়াতের মতো শক্তিশালী একটি ফোর্সকে জোট থেকে বিদায় করে দিলে সেই সুযোগ নিয়ে নেবে আওয়ামী লীগ। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে জামায়াতও সরকারকে কৌশলগত সঙ্গ দিতে কার্পণ্য করবে না। তবে বিশেষ করে আগামী সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি প্রশ্নে যদি বিএনপি জোটকে ছেড়ে যেতে চায় জামায়াত, সেখানে আপত্তি করবে না বিএনপি। দুই দলের বেশ কয়েকটি সূত্রে কথা বলে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

জোট ধরে রাখার ব্যাপারে খালেদা জিয়ার নতুন নির্দেশনা পাওয়ার পর বিএনপির সিনিয়র নেতারা মনে করেন, বৃহৎ ঐক্যের পথে জামায়াতকে সমস্যা মনে করা হলেও বিষয়টি তেমন গুরুতর নয়। দলটির নিবন্ধন না থাকায় তেমন সমস্যা হবে না বৃহৎ ঐক্যে। তাছাড়া ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যেসব দল জড়িত তারা বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী বা আন্দোলনের জোট করবে। যেখানে যুক্তফ্রন্ট বা জাতীয় ঐক্য যে নামেই দলগুলো জোট করুক না কেন সেখানে ২০ দল সম্মিলিতভাবে একটি অংশ হবে মাত্র। নির্বাচনী জোটের এমন হিসেবে আসন ভাগাভাগি প্রশ্নে বিএনপিই জামায়াতকে হেনডেল করবে। তাই থাকা না থাকায় বড় কোনো প্রশ্ন উঠবে না।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘যেখানে আমরা সব রাজনৈতিক দলকে সরকারবিরোধী প্লাটফর্মে আনতে চাই, সেখানে কেন আমরা একটা মিত্র দলকে দূরে ঠেলে দেব। জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ও জোটের কোনো সমস্যা নেই। এত বড় দলে নেতাকর্মীদের নানামত থাকতেই পারে। এখানে তিনি কোনো সমস্যা দেখছেন না। তাছাড়া জামায়াতকে আমরা দূরে দিলে সরকার তাদের নিয়ে নেবে।’

তবে জামায়াতকে এখনই বিদায় করার পক্ষে থাকা নেতারা মনে করছেন, জামায়াতের জন্য বিএনপিকে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। সম্প্রতি সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে জামায়াত মেয়র প্রার্থী দাঁড় করানোয় দলটির সঙ্গ ছাড়ার দাবি আরো জোরালো হয়ে উঠেছে বিএনপির ভেতর। বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী, জোটের শরিক অন্যান্য দল এবং ‘বৃহৎ ঐক্যজোট’ গড়তে আগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলো জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের ব্যাপারে সহমত প্রকাশ করছে।

কারণ হিসেবে তাদের জোরালো অভিমত হচ্ছে জামায়াতের ওপর কোনোভাবেই নির্ভর করা যায় না। জোটসঙ্গী হিসেবে তারা কখনো বিশ্বস্তও নয়। গত ১০ বছরে দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অধিকাংশ জায়গায় সরকারি দলের পক্ষ হয়ে কাজ করেছে জামায়াত। তাছাড়া তাদের পরিচালিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও আওয়ামী লীগ নেতাদের বসিয়ে শক্ত লিয়াজোঁ রক্ষা করে চলেছে। এমন অবস্থায় জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়াতেই বিএনপির লাভ বেশি।

এ বিষয়ে দলের একজন ভাইস চেয়ারম্যান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, জামায়াত নিজেদের স্বার্থে রাজনীতি করে। তাদের কাছে দেশ ও জোট মুখ্য নয়। তিনি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এই দলটি নির্বাচনে জয়লাভ নয়, নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণে সংকীর্ণ রাজনীতি করে। সেই নির্বাচন বিতর্কিত হলেও তারা অংশগ্রহণ করে। ২০০৮ সালে বিএনপি অপ্রস্তুত থাকা অবস্থায় নির্বাচনে যেতে বাধ্য করে এ দলটি। বিএনপিকে বাদ দিয়ে হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করত, যদি তাদের নিবন্ধন থাকত। তাই জামায়াতকে বিশ্বাস করার কিছু নেই।

তবে জোটের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সম্প্রতি ২০ দলীয় জোটের এক বৈঠকে নতুন করে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ও জোটের ক্ষোভ ও অস্বস্তি প্রকাশ পেয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত বিবৃতি দেওয়ায় ক্ষোভ ঝাড়েন জোটের নেতারা। এ সময় বৈঠকে উপস্থিত জামায়াত প্রতিনিধিকে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি যেন তাদের দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের এসব ক্ষোভের কথা জানিয়ে দেন। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, তিনি সব সময় আপ্রাণ চেষ্টা করছেন জোটের ঐক্য ধরে রাখতে। আর তারা তাকে জড়িয়ে যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুব্ধ এবং ব্যথিত। এমন পরিস্থিতিতে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যান ওই বৈঠকে উপস্থিত জামায়াত নেতা মাওলানা আবদুল হালিম। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে তিনি বললেন, তাদের বিবৃতিকে যেভাবে দেখা হচ্ছে, আসলে তা ঠিক নয়।

তবে জামায়াতের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সিলেটে জামায়াত নির্বাচন করেছে, তাদের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ থেকে। তবে প্রাপ্ত ভোটের ফলাফল নিয়ে তারা খুবই হতাশ হয়েছে। আগে ভুল স্বীকার না করলেও ভোটের সংখ্যা দেখে দলটির সিলেটের অবস্থান ভুল ছিল বলেই মনে করেন বর্তমান নেতৃত্ব। তাই তারা জোট রক্ষার স্বার্থে সব রকম সহযোগিতা করে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েই এগিয়ে যেতে চায়। যেটুকু ভুল বোঝাবুঝি বিএনপি বা ২০ দলের সঙ্গে হয়েছে তা পূরণে সামনের দিনগুলোতে দলটি চেষ্টা করে যাবে বলে তারা জানিয়েছে। তার পরও সম্মানজনক সুযোগ না থাকলে জোট নিয়ে দলটি নতুন চিন্তাও করতে পারে।

জামায়াতের দায়িত্বশীল এক নেতা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘সারা দেশে জামায়াত কোণঠাসা থাকলেও সিলেটে তারা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছিলেন গত কয়েক বছর থেকে। তাছাড়া নির্বাচনের মাঠেও সুযোগ পেয়ে কাজে লাগিয়েছে জামায়াত। তবে সিলেটের প্রার্থী থাকা নিয়ে জামায়াতের অধিকাংশ নেতাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রার্থীকে মাঠে রাখার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি মাঠপর্যায়ের কর্মী-সমর্থকরাও। সিলেটে আমাদের ৩০ হাজার কর্মী ও সমর্থক রয়েছে, এটা মিথ্যা নয়। কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্ব সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারেও জামায়াতকে ভুলভাবে দেখছেন সাধারণ ভোটাররা। এটা আমাদের জন্য ব্যর্থতা।

পিডিএসও/তাজ