নির্বাচনকালীন সরকার

সংলাপ প্রশ্নে দূরত্ব ঘোচেনি

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৮, ০৮:০৩ | আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৮, ০৮:৫১

প্রতীক ইজাজ

গত জানুয়ারিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের পর নির্বাচনী সংলাপের বিষয়টি এ বছর প্রথম আলোচনায় আসে। ভাষণে নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।’

ভাষণের পর প্রধানমন্ত্রী যে নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলেছিলেন, সেটা স্পষ্ট নয় দাবি করে তখন সংলাপ চায় বিএনপি। দলের নেতারা বলেন, এমন এক নির্বাচনকালীন সরকার দরকার, যারা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। এর জন্য আলোচনা দরকার। কিন্তু বিএনপির সে আহ্বান নাকচ করে দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের নেতারা সাফ জানিয়ে দেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই। বর্তমান সরকারই হবে নির্বাচনকালীন সরকার।

অবশ্য নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে সংলাপের বিষয়টি নাকচ করে দিলেও সংলাপের দরজা খোলা রাখে আওয়ামী লীগ। তখন বিএনপির সংলাপ আহ্বানের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সংলাপের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করতে চাই না, আমরা একটা রাজনৈতিক দল। প্রয়োজনে সংলাপ হতে পারে, তবে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা দেখছি না। তিনি এমনো বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির অধিকার, এটা সুযোগ নয়। সরকারের দয়ার ওপর বিএনপি নির্বাচন করবে? তাহলে সংলাপে বসাবসির কী প্রয়োজন? এখানে জটিলতা আছে বলে জনগণ মনে করে না। সংলাপ কেন হবে না? প্রয়োজন হলে হবে কিন্তু এখন নির্বাচনের ব্যাপারে সংলাপের প্রয়োজন দেখছি না।

তাছাড়া সংলাপের রাস্তা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেই বন্ধ করেছেন। টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অসৌজন্য আচরণ করেছিলেন তিনি। সেদিন প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে গণভবনে এলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অন্যরকম হতো।

পরে অবশ্য সংলাপের বিষয়টি আর বেশিদূর এগোয়নি। বরং নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে সংলাপ বা আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে আগের মতোই সরাসরি বিপরীত অবস্থানে থাকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। এ সময় নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের কথা হলেও সংলাপের বিষয়টি আসেনি।

গত জুলাইয়ের শেষের দিকে হঠাৎ করেই আবার আলোচনায় আসে সংলাপের বিষয়টি। এ সময় বিএনপিই প্রথম একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে যাওয়ার পথ বের করতে তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানায়। আলোচনায় বসার জন্য তারা সব সময় প্রস্তুত জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব সংলাপের জন্য কবে, কোথায় বসবেন সেই তারিখ ঠিক করার আহ্বানও জানান। এবার আগের মতোই বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি না হলেও ফোনালাপে আলোচনা করতে রাজি বলে জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপ না হলেও টেলিফোনে কথা হতে পারে।

গত কয়েক দিন ধরে নির্বাচনী রাজনীতিতে আবারও সংলাপ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহেই পুনরায় সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে সমাধান করতে ক্ষমতাসীনদের আলোচনায় বসার কথা বলেন দলের নেতারা। এর উত্তরে গত ৯ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি সংলাপ চায় না, চায় সংঘাত। সংলাপে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। অবশ্য তার একদিন পর গত শনিবার পুনরায় সংলাপে সদিচ্ছা প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, পূর্বশর্ত দিয়ে নয়, শর্তহীনভাবে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। আওয়ামী লীগ ফোন দিলে বিএনপি কথা বলবে—এমন শর্ত দিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। আলোচনা হতে হবে খোলা মনে।

একই দিন একইভাবে বিএনপির সংলাপের বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ষড়যন্ত্র করে সরকার পতনের আন্দোলন করবেন, অশুভ কার্যকলাপ করবেন আর মুখে সংলাপের কথা বলবেন, তা হবে না। সংলাপ ও ষড়যন্ত্র একসঙ্গে চলে না। আপনাদের ষড়যন্ত্রের পথ পরিহার করতে হবে। তারপর সরকার ভেবে দেখবে আলোচনায় বসা যায় কিনা। ষড়যন্ত্র করে আলোচনায় বসার সুযোগ নেই।

প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মুখে সংলাপের আলোচনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নির্বাচনের মাত্র সাড়ে ৪ মাসের মতো বাকি। অথচ নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখনো বিপরীত মেরুতে দুই দল। এমন অবস্থায় সংলাপ প্রয়োজন। শুরুতেই এক টেবিলে বসা না হলেও অন্য যেকোনো মাধ্যমে আলোচনা শুরু হোক। এতেও ধীরে ধীরে সমাধান আসবে। তবে সংলাপ হওয়াটা জরুরি। এতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা কমবে।

এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, যদিও সংবিধানেই নির্বাচনের সবকিছু স্পষ্ট করা আছে; তবে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান ও সমঝোতার জন্য সংলাপে বসাটা জরুরি। আলোচনায় টেবিলে অনেক সমাধানই আসে। তবে কোনো ধরনের শর্তের মধ্যে থেকে আলোচনায় বসা উচিত নয়। খোলা মন নিয়ে বসতে হবে। আশা করছি—এতে সমাধান আসবে।

এর আগে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে সংকট সমাধানে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংলাপ। চিঠি চালাচালির পর ফোনালাপে অংশ নেন আওয়ামী লীগের সে সময়ের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সে সময় আলোচনার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তাতে সাড়া দেননি খালেদা জিয়া।

নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আবারও রাজনীতির মাঠে উঠে এসেছে দুই দলের আলোচনার বিষয়টি। যেখানে সরকারের সঙ্গে সংলাপ আগ্রহী বিএনপি। আওয়ামী লীগও আগ্রহী। তবে সংলাপের ধরন নিয়ে ভিন্ন অবস্থান দল দুইটির। বিএনপি চায় প্রকাশ্য সংলাপ। আর আওয়ামী লীগের আগ্রহ ফোনালাপে। পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপের প্রয়োজন নেই। কিন্তু রাজনৈতিক বোঝাপড়ার কারণে দলের নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা হতে পারে। আলোচনা হতে পারে। তবে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপ নয়।

এ ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশে এখন অস্থিরতা চলছে। সামনে নির্বাচন। সুস্থ রাজনীতি দরকার। বিশেষ করে সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ বের করতে সংলাপের বিকল্প নেই। আলোচনায় বসতে হবে। আমরা আলোচনার জন্য সব সময় প্রস্তুত রয়েছি। এখন আওয়ামী লীগ নেতারা কোথায় কখন বসবেন, জানালেই হবে। সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করছে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও। দলের কো চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, সংলাপের প্রয়োজন আছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলই বড়। নির্বাচনে দুই দলকেই অংশ নিতে হবে। সুতরাং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করার জন্য অব্যশই সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে। এখানে দোষের কিছু নেই। বরং সংকটের সমাধান হবে।

তবে সংলাপের বিষয়ে দলের আগের অবস্থানের কথাই পুনর্ব্যক্ত করেছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বিএনপি চাইলে টেলিফোনে কথা বলতে পারেন। কিন্তু সংলাপ হবে না। কারণ বাংলাদেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১১ সালে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দেওয়ার পর থেকে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়। এর ফলে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। বিএনপি এমন একটি নির্বাচনকালীন সরকার চায়, যারা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। সরকারে বিএনপিসহ সব দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। কিন্তু সংবিধানের বাইরে যেতে নারাজ আওয়ামী লীগ। ফলে এ নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে।

বিশ্লেষকরা এমনও জানান, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংবিধানে সরাসরি কিছু বলা নেই। তবে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা কমিয়ে নতুন-পুরনো মিলিয়ে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠন করে আওয়ামী লীগ। এই সরকারে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও জাতীয় পার্টিকে (জেপি) রাখা হয়েছিল। অন্য দল থেকে তিনজনকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়, যারা নির্বাচিত ছিলেন না। এর আগে প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের নেতারা নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এবার ঠিক একই রকম নির্বাচনকালীন সরকারের কথা জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব না থাকায় এই সরকারে বিএনপিকে রাখা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

পিডিএসও/হেলাল