বিএনপির টার্গেট খালেদার মুক্তি

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৮, ০১:০৬

বদরুল আলম মজুমদার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। সরকারি দল এরই মধ্যে নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও বিএনপি এখনো ঘর গোছাতে পারেনি। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকায় করণীয় নিয়ে দ্বন্দ্বে রয়েছে দলে। শীর্ষ নেতারা নেত্রীর কারামুক্তিকেই এই মুহূর্তে প্রাধান্য দিয়েছেন।

বিএনপির অধিকাংশ নেতা মনে করেন, একাধিক রাজনৈতিক ইস্যু দেশে তৈরি হলেও সেটাকে কাজে লাগিয়ে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে সফল হয়নি দলটি। ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলকে আন্দোলনের উপযোগী করে গড়ে তোলা যাচ্ছে না। সামনে হবে কি না তা নিয়েও দ্বন্দ্বে রয়েছেন নেতারা। সর্বশেষ দলীয় চেয়ারপারসনকে অন্তরীণের পরও দলের নেতারা একটি কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন খালেদাবিহীন দল নিয়ে নির্বাচনের পথে হাঁটা দলটির জন্য যেমন আত্মঘাতী হতে পারে আবার জিয়া পরিবারের নেতৃত্ব ছাড়া ক্ষমতার বাইরে থেকে দলকে টেনে নিয়ে যাওয়াও দুরূহ হতে পারে। এমন বাস্তবতায় বিএনপির সব পক্ষই এখন খালেদা জিয়ার মুক্তির অপেক্ষাতেই আছেন।

গত নির্বাচনের অংশ না নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত বলে সমালোচনায় মুখর থাকা নেতারাও এখন বলছেন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া বিএনপির জন্য কোনোভাবেই ঠিক হবে না। তারা বলছেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। দলকে সংঘবদ্ধ রাখতে খালেদা জিয়ার বিকল্প নেই।

এমন কথা শুরু থেকেই বলে আসছেন দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। গতকাল তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বিএনপির অবস্থান খুব পরিষ্কার। নো খালেদা নো ইলেকশন। এ অবস্থান থেকে দল সরে যায়নি, বরং যারা খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে নির্বাচনের বিকল্প নেই বলে যেসব তত্ত্ব দিচ্ছিলেন তারাও স্বীকার করছেন খালেদা জিয়া ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়। এটা দলের জন্য একটা বড় সুখবর। তাছাড়া বিএনপির নেতৃত্বে বড় একটি জোট হওয়ার কথা রয়েছে, তারাও বিএনপির এ দাবির সঙ্গে মোটামুটি একমত। এখন বিএনপির কাজ বিএনপিকেই করতে হবে। অর্থাৎ খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে রাজপথেই নামবে বিএনপি। এটাই শেষ কথা।

খালেদা জিয়ার জেল জীবন গতকাল ৬ মাস পূর্ণ হয়েছে। শুরুর দিকে আইনজীবী নেতারা আইন আদালতের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বললেও তারাও আস্তে আস্তে সুর পাল্টাচ্ছেন। এখন তারা বলছেন, সরকার বেগম জিয়াকে জেলে রাখতে আদালতের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করছে। সেটা না করলে গ্রেফতারের দুই দিনের মাথায় তার জামিন হয়ে যেত। চেয়ারপারসনকে মুক্ত করতে রাজপথেই নামতে হবে। কারণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই সরকার তাকে জেলে দিয়েছে। সেটা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। দলের একাধিক সূত্র জানায়, অক্টোবর থেকেই চূড়ান্ত আন্দোলনে নামবে বিএনপি।

এদিকে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের দন্ডের বিরুদ্ধে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার খালাস চেয়ে করা আপিল আবেদনের শুনানি দ্বাদশ দিনের মতো শুরু হয়েছে। গত বুধবার পর্যন্ত খালেদার আপিল শুনানি মুলতবি করেছিলেন হাইকোর্ট। গতকাল শুনানি শেষে আগামী রোববার আদেশের দিন ধার্য করেন আপিল বিভাগ।

এদিকে, আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে আবারও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে বিএনপি। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান। কিন্তু দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি রেখে নির্বাচনে লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড ছাড়া বর্তমান সংসদের অধীনে নির্বাচন হলে সেটা কোনোভাবে সুষ্ঠু হবে না। এ ছাড়া সম্প্রতি মতবিনিময়কালে দলের তৃণমূল নেতারা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাংলাদেশে কর্মরত ১৮টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের বৈঠকের শুরুতেই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তিন পৃষ্ঠার একটি লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বৈঠক সূত্র জানায়, সে বক্তব্যে সদ্য অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষপাত, নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলা, গণমাধ্যমের ওপর নতুন নির্দেশনা জারি, সার্বিক রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কূটনীতিকদের ব্রিফ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সূত্র জানায়, বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের পর কূটনীতিকরা আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চান। জবাবে মির্জা আলমগীর কূটনীতিকদের জানান, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে সরকার। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। তিনি আইনের শাসন থেকে বঞ্চিত। এ অবস্থায় নির্বাচনী লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড না থাকলে তারা কীভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন?

সূত্র জানায়, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী বিএনপি চেয়ারপারসনের মামলা ও তার জামিন নিয়ে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন।

পিডিএসও/রিহাব