বিএনপির মতবিনিময়

আন্দোলন জোরদারে তৃণমূলের তাগিদ

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৮, ১০:৪২

বদরুল আলম মজুমদার

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে আপাতত রাজপথই দলটির একমাত্র ভরসা। আন্দোলন ছাড়া খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা যাবে না। আর খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে না পারলে আগামীতে সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায়ের দাবিও পূরণ হবে না। কিন্তু আন্দোলনের পালে হাওয়া লাগছে না। সব আন্দোলনই ব্যর্থ। আর এ জন্য তৃণমূল দূষছে কেন্দ্রকে। এ অবস্থায় ‘ডু অর ডাই’ আন্দোলন চান দলের তৃণমূলের নেতারা। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে এই কথাই জানিয়েছেন তারা।

মতবিনিময়কালে বিএনপির জেলা পর্যায়ের নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলন জোরদারের কথা বলেছেন। তৃণমূল যেকোনো আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানানো হয়। মতবিনিময়কালে দেশের অধিকাংশ নেতা যেকোনো মূল্যে রাজপথে কঠোর আন্দোলনে নামার তাগিদসহ দলের সংস্কার নিয়েও কথা বলেন। এ ছাড়া জামায়াতের সঙ্গ-ত্যাগে অনেকের মত এলেও স্পষ্ট করে জোর অবস্থানে ছিলেন না তৃণমূল নেতারা। বিষয়টিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দুর্বলতা থাকায় সতর্কভাবেই মত দেন তারা।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে কী কৌশল নেবে বিএনপি এবং ২০ দলের শরিক জামায়াতের ব্যাপারে দলটির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই মতামত জানতে তৃণমূলকে ঢাকায় ডাকেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। গত দুই দিনে দেশের আটটি বিভাগীয় অঞ্চলের প্রায় ৮০টি সাংগঠনিক জেলার সুপার ফাইভ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারা। মহাসচিব মির্জা ফখরুলের উপস্থিতিতে দলের স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য তাদের বক্তব্য শোনেন।

ধারাবাহিক মতবিনিময়ের অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার সকালে চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লা এবং বিকেলে ঢাকা, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন নেতা বলেন, আমরা ঢাকাকে সারা দেশ থেকে বিছিন্ন করেছি দীর্ঘ সময় ধরে, অথচ ঢাকায় কিছুই হয়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। এর মাশুল গুনতে হয়েছে গোটা দলকে। শুনেছি ঢাকায় নেতায় নেতায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিভক্ত হয়ে আছে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর কমিটি নিয়ে বিশৃঙ্খল অবস্থার কথা পত্রপত্রিকায় দেখেছি, অবস্থা যদি এমন থাকে তাহলে আন্দোলন সফলতা আসবে কীভাবে-প্রশ্ন তাদের। তাছাড়া অঙ্গ দলের কমিটি গঠন নিয়ে বাণিজ্যসহ পকেট কমিটি করার বিষয়ে কথা বলেছেন কেউ কেউ।

তৃণমূল বৈঠকের অন্য একটি সূত্র জানায়, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে। গত ১০ বছর ধরে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীরা সরকারের নির্যাতন ও হামলা-মামলার শিকার। এমন অবস্থায় ‘ডু অর ডাই’ আন্দোলন ছাড়া বিকল্প নেই বলে সিনিয়র নেতাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বিএনপির তৃণমূল নেতারা। জেলা পর্যায়ের নেতারা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের জানিয়েছেন-চেয়ারপারসনকে কারাগারে রেখে ও বর্তমান সংসদ বহাল রেখে এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে ভোটে যাওয়া উচিত হবে না। তাহলে গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো অবস্থা হবে। অন্যদিকে, আগামী সেপ্টেরের মধ্যে কঠোর আন্দোলনের ডাক আসতে পারে বলে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে তৃণমূলকে প্রস্তুতিও নিতে বলা হয়েছে। বৈঠকে অংশ নেওয়া যশোর জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামছুল হুদা বলেন, আমরা তৃণমূলের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারক ফোরামের নেতাদের জানিয়েছি—এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে গত ১০ বছরে দু-একজন বিএনপি নেতাকর্মী নিহত হননি। এমন কোনো নেতা নেই যিনি ২-৪টা মামলার আসামি হননি। এ অবস্থায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় কারাগারে বন্দি। তাই আর পেছন ফেরার সময় নেই। ‘ডু অর ডাই’ আন্দোলন চাই আমরা।

নওগাঁ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ধলু জানান, সিনিয়র নেতারা আগামী দিনের আন্দোলন সংগ্রামে আমাদের করণীয় জানতে চেয়েছেন, আমরা জানিয়েছি। সবার কথার মধ্যে উঠে এসেছে—খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে ও এই সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনে যাওয়া উচিত হবে না। তাছাড়া আন্দোলন করতে হলে আগে ঢাকাকে সংগঠিত হতে হবে।

এ ছাড়া সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার বাইরে দলের অঙ্গ-সংগঠনের কমিটি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তৃণমূলের নেতারা। তাদের অভিযোগ, কোনো একজন বা দুইজন ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে বিএনপির অঙ্গ-সংগঠনের কমিটিগুলো দেওয়া হচ্ছে। কমিটি দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া মানা হচ্ছে না। অর্থাৎ জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই কমিটি দেওয়া হচ্ছে।

শুক্রবারের মতো গতকালের বৈঠকেও জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গ উঠেছে বলে জানা যায়। এতে তৃণমূল নেতারা জামায়াত বিষয়ে বলেছেন, জামায়াতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে এখনই নেওয়া উচিত। বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়। যাতে পরবর্তীতে বিএনপি গুছিয়ে উঠতে পারে। এদিকে, জামায়াতে বিষয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেট জেলা বিএনপির নেতারা। তাদের বক্তব্য, আমরা বারবার অনুরোধ করার পরও জামায়াত সিটি নির্বাচনে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি। অপরদিকে কক্সবাজারের একটি পৌর-সভায় জামায়াত তাদের প্রার্থী দিয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখিয়ে দিয়েছি যে, জামায়াত ছাড়াও বিএনপি জিততে পারে।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন জীবন জানান, বৈঠকে সব বিভাগীয় নেতারা বলেছেন, নির্বাচন ও আন্দোলনের প্রস্তুতির কথা। তবে বেগম জিয়ার মুক্তিই সবার প্রধান লক্ষ্য। এ ছাড়া বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া কেউ নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষেও নয়।

পিডিএসও/হেলাল