তিন সিটির নির্বাচন

আত্মবিশ্বাস বেড়েছে আওয়ামী লীগের

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০১৮, ০৯:১৯ | আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৮, ১১:২৬

প্রতীক ইজাজ

দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ সিটির মধ্যে চার সিটিতেই বড় ভোটের ব্যবধানে জয় পাওয়ায় বেশ স্বস্তিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এর আগে গত মে ও জুনে খুলনা ও গাজীপুরের জয়ে প্রথম স্বস্তি আসে ক্ষমতাসীন শিবিরে। সেই স্বস্তি আরো এক ধাপ এগিয়ে দিল গত সোমবার অনুষ্ঠিত রাজশাহী ও বরিশালের জয়। এই নির্বাচনে ধানের শীষের সঙ্গে নৌকার ভোটের বড় ব্যবধান স্বস্তির পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে সরকার ও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তারও প্রমাণ হলো। এর ফলে আওয়ামী লীগের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনে জয়ের প্রত্যাশা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। বাড়ল আত্মবিশ্বাসও। এই জয় জাতীয় নির্বাচনেও অব্যাহত থাকবে বলেও মনে করা হচ্ছে।

একইভাবে রাজশাহী ও বরিশালের জয়কে তৃণমূলে দলের সাংগঠনিক ঐক্য ও কেন্দ্রের সুশৃঙ্খল রাজনীতি হিসেবেও দেখছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলটি মনে করছে, এসব জয়ের মূলে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঠিক নেতৃত্ব। তার কঠোর নির্দেশনার মধ্য দিয়েই দল ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগোচ্ছে। এতে জাতীয় নির্বাচনেও ইতিবাচক ফল আসবে। পাশাপাশি মনোনয়নের ব্যাপারে দল যে ব্যক্তি নয়, প্রার্থীর মাঠের জনপ্রিয়তাকেই যোগ্যতা হিসেবে দেখছে- সে বার্তাও গেল দলের সর্বস্তরের নেতাদের মধ্যে। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় নির্বাচনেও যোগ্য প্রার্থী মনোনয়নের পথ স্পষ্ট হলো।

এমনকি এসব জয়ের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতি ও মাঠে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দেওলিয়াত্ব প্রমাণ হয়েছে বলেও মনে করছে আওয়ামী লীগ। দলের নীতিনির্ধারণী মহলের মতে, তৃণমূলে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা যে খুবই দুর্বল এবং নেতৃত্বশূন্য- তা উঠে এসেছে। বিএনপির ভোট কমেছে। সাধারণ ভোটাররা আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে দুর্নীতির মামলায় কারান্তরীণ খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ দলের নির্বাচনকেন্দ্রিক দাবিকে যে সাধারণ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে- নৌকার বিজয়ে তা স্পষ্ট।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, তিন সিটির ফলাফলে আমরা সন্তুষ্ট। আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। প্রতিটি গ্রামে সংগঠন আছে। ভিত্তি শক্ত। সুসংগঠিত দল। সেটা আবারও প্রমাণ হয়েছে। এই ফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। আশা করছি জনগণের আস্থা নৌকার পক্ষেই থাকবে। তবে জাতীয় নির্বাচনে জিততে হলে দলের সাংগঠনিক ঐক্য দরকার ও ভালো প্রার্থী দিতে হবে।

‘আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিশ্বাস করে, তার প্রমাণ সিলেট’- উল্লেখ করে এই প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, পাঁচ সিটির মধ্যে আমরা চারটাতেই জয় পেয়েছি। শেষের তিনটার মধ্যে দুটিতে জয় পেয়েছি। এতই যদি কারচুপি হতো তা হলে সিলেটে আমাদের প্রার্থী মাত্র দেড়-দুই হাজার ভোটের ব্যবধানে পিছিয়ে থাকত না। রাজশাহী ও বরিশালে আমাদের এত বেশি ভোট দিত না মানুষ। তার মানে মাঠ পর্যায়ে সরকার ও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা রয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকান্ডের প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে এই জয় নতুন মাত্রা যোগ করবে। আশা করছি, জাতীয় নির্বাচনেও মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে।

অন্যদিকে, দেশের পাঁচ সিটির চারটিতে ভরাডুবি হলেও নিজেদের ‘সফল’ বলে দাবি করছে বিএনপি। দলের মতে, নির্বাচনে অংশগ্রহণই দলের বড় সফলতা। এর মধ্য দিয়ে সরকার, আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী মনোভাব প্রকাশ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ও এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়—সেটা প্রমাণিত হয়েছে। দলের নেতারা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো না। নির্বাচনে জয়ের পরিস্থিতি নেই। জয়ী হতেও দল অংশ নেয়নি। দলের লক্ষ্য ছিল জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে সরকার ও আওয়ামী লীগের মনোভাব বোঝা। সেটা স্পষ্ট হয়েছে।

এমনকি এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলের মাঠের নির্বাচনী রাজনীতির ব্যাপারেও একটা ধারণা মিলেছে। দল মনে করছে, জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে হলে দলকে আরো বেশি সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও নির্দেশনা স্পষ্ট ও কঠোর হতে হবে। বিশেষ করে ভোটারদের আস্থায় আনতে গেলে দলীয় এজেন্ডার বাইরে জাতীয় ইস্যু নিয়ে উপস্থিত হতে হবে। কারণ এসব নির্বাচনে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ দলীয় ইস্যুগুলো ভোটারদের কাছে গুরুত্ব পায়নি বলেই ভোট কমেছে।

অন্যদিকে, খুলনা ও গাজীপুরের পর রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেটেও দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় স্বস্তিতে সরকারও। সরকারের নীতি নির্ধারকদের মতে, এই তিন সিটির ভোট ও ফল সারা দেশে, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই আশা করা হচ্ছে। বিশেষ সিলেটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ও বিএনপি প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা এবং অন্য দুই সিটিতে নিরবচ্ছিন্ন ভোট গ্রহণ হওয়ায় সরকারের অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, এসব নির্বাচন বিএনপিসহ অন্যান্য দলকে এই সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহী করবে। এমনকি অংশগ্রহণমূূলক নির্বাচনে আন্তর্জাতিক চাপও সরকারের পক্ষেই থাকবে।

গত সোমবার গুরুত্বপূর্ণ তিন সিটিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে রাজশাহী সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনকে ইতোমধ্যেই বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি ১৩৮ ভোট কেন্দ্রে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৭০০ ভোট। বরিশালে ১২৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৬টি স্থগিত হওয়ায় মেয়র প্রার্থী কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি। তবে ঘোষিত ফলে দেখা যায়, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের চেয়ে ৮৭ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে আছেন সাদিক। স্থগিত কেন্দ্রের মোট ভোট ৩২ হাজার ৯৩০টির সব কয়টি সরোয়ার পেলেও তিনি সাদিককে অতিক্রম করতে পারবেন না বলে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা মাত্র। সিলেটে দুই কেন্দ্র স্থগিত থাকায় ফলাফল দেওয়া হয়নি। সেখানে ১৩৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩২টি কেন্দ্রের ফলাফলে এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি পেয়েছেন ৯০ হাজার ৪৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৮৭০ ভোট।

নির্বাচনের পরদিন নির্বাচনের ব্যাপারে বিএনপির সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) বিতর্কিত করতে বিএনপি তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তবে এই নীলনকশা বাস্তবায়নে দলটি ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য তার। মন্ত্রী বলেন, তারা (বিএনপি) নির্বাচন করতে আসেনি। এসেছিল নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে। এসেছিল সরকার ও ইসিকে বিতর্কিত করার নীলনকশা বাস্তবায়নে। তবে তারা এটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এমনও বলেন, আমাদের সরকারের গত টার্মে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন। এবার আমরা চারটিতে জিতেছি তারা জিতেছে একটিতে। এর অর্থ সিটির পাঁচ ভাগের চার ভাগ জনগণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন ও অর্জনের রাজনীতি গ্রহণ করেছে। বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতিকে বর্জন করেছে। আসলে জনগণের ওপর বিএনপির কোনো আস্থা নেই। তারা কি করে প্রত্যাশা করে জনগণ তাদের ভোট দেবে।

এমনকি আওয়ামী লীগ নেতারা ভোটের পরদিন জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের মনোভাব পুনরায় তুলে ধরেন। তারা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সবকিছু নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তারপরও বিএনপি নির্বাচনে না এলে আমাদের কিছু করণীয় থাকবে না। বিএনপি না এলেও ওই নির্বাচনে অন্যান্য রাজনৈতিক দল অংশ নেবে।

তবে সিলেট ছাড়া বরিশাল ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে দুই সিটিতে পুনঃনির্বাচন দাবি করেছে বিএনপি। এই দাবিতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশে মহানগর ও জেলা সদরে প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। নির্বাচন পরবর্তী এক প্রতিক্রিয়ায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গাজীপুর ও খুলনার মতো এই নির্বাচনে ভোট চুরি বা কারচুপি নয়, ভোট ডাকাতির মহোৎসব হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ ‘আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের’ জয়ী করার জন্য সোমবারের নির্বাচনকে ‘প্রহসনে’ পরিণত করেছে বলেও অভিযোগ করেন ফখরুল।

দলের নেতাদের মতে, যে উদ্দেশে তারা খুলনা, গাজীপুর, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে তা সফল হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় স্থানীয় সরকারের এই পাঁচ সিটির নির্বাচনের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে পাঁচ সিটি নির্বাচন সব দলের কাছে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা ছিল আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশনের জন্য পরীক্ষা। তারা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয় না, অথচ সেই নির্বাচনগুলোও তারা সুষ্ঠু করেনি। বিএনপি যে বিভিন্ন সময় দাবি করে আসছিল, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না, পাঁচ সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল