সার্বিক বিজয় দেখছে আওয়ামী লীগ

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৮, ০৮:৪২

প্রতীক ইজাজ

খুলনায় মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীর জয়কে সার্বিক বিজয় হিসেবে দেখছে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এই বিজয় খুলনার পাশাপাশি সারা দেশে, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই আশা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ মনে করছে, এই নির্বাচনে মানুষের ভোট প্রদানের মধ্য দিয়ে স্থানীয় ইস্যু ও ব্যক্তির জনপ্রিয়তা

এবং সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ড প্রতিফলিত হয়েছে। খুলনার মানুষ সার্বিক বিচারে ভেবেচিন্তেই আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রতি মানুষের যে আস্থা রয়েছে; বড় ব্যবধানে মেয়র পদে তালুকদার আবদুল খালেকের জয় সে তথ্যই প্রমাণ করেছে।

খুলনায় জয়ের মধ্য দিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগ যে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; তারও প্রমাণ মিলেছে বলে মনে করছে সরকার ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, খুলনায় ভোটের ব্যবধান এবং নির্বাচনী পরিবেশ তৃণমূলে সরকার ও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার বহিঃপ্রকাশ। এর আগের দফায় দলীয় কোন্দলের কারণেই খুলনায় হেরেছিল আওয়ামী লীগ। এবার সেখানে দলীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। খুলনার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকেও দলীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবেই দলীয় প্রার্থীর হয়ে কাজ করেছেন। এমনকি বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ সংঘবদ্ধভাবে খুলনায় আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেছে। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থারও প্রকাশ ঘটেছে।

একইভাবে এই নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়েরও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। তাদের মতে, পরাজয়ের মূল কারণ দুটি। একটি হচ্ছে—বিগত বিএনপিদলীয় মেয়র মনিরুজ্জামান মনির সময় খুলনার কোনো উন্নয়ন হয়নি। এমনকি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় খুলনা সন্ত্রাসীর নগরীতে রূপ নিয়েছিল। মানুষ ওই সরকারের ওপর বিরক্ত ছিল। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এবারের নির্বাচনে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে—বিএনপির রাজনীতির ওপর মানুষ আস্থা হারিয়েছে। খুলনায় বিএনপির নির্বাচনের মূল এজেন্ডা ছিল দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সরকারের জনবিচ্ছিন্নতা প্রমাণ করা। যেহেতু খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় কারাদন্ড, তাই মানুষ এই এজেন্ডা মেনে নেয়নি। একইভাবে প্রকৃত অর্থে সরকার তৃণমূলে যে কাজ করেছে, ভোটের মাধ্যমে তার প্রমাণ দিয়েছে জনগণ। অর্থাৎ বিএনপির সার্বিক রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে মানুষ।

খুলনায় প্রাপ্ত ভোট ও নির্বাচনী পরিবেশ নিয়েও সন্তুষ্ট আওয়ামী লীগ। দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, এবার নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে ৬৭ হাজার ৯৪৬ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এর আগে ২০১৩ সালে বিএনপি প্রার্থীর কাছে হেরেছিলেন ৬০ হাজারের কিছু বেশি ভোটে। তারও আগে ২০০৮ সালে ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন তালুকদার আবদুল খালেক। সে হিসেবে আওয়ামী লীগের ভোট বেড়েছে। এমনকি মেয়র পদের পাশাপাশি এবার সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলের বেশির ভাগ পদে জয় পেয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। ১৩টিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। আর বিএনপির সমর্থকরা জিতেছেন আটটি ওয়ার্ডে। অন্যদিকে, ভোটের পরিবেশ নিয়েও সন্তুষ্ট আওয়ামী লীগ। যদিও বিএনপি ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে ফল প্রত্যাখ্যান করেছে; কিন্তু নির্বাচন কমিশন ও পর্যবেক্ষক মহলের মতে, নির্বাচনী ফলে প্রভাব পড়তে পারে—এমন কোনো বড় ধরনের কারচুপি হয়নি। ইসি নির্বাচন নিয়ে সন্তুষ্ট। আর নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মোর্চা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি) বলেছে, নির্বাচনে বেশ কিছু কেন্দ্রে সহিংসতা ও অনিয়মের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনার ব্যাপকতা বেশি না হওয়ায় ভোটের ফলাফল পরিবর্তনে প্রভাব ফেলেনি। দলের নেতারাও মনে করেন, বিএনপি প্রার্থী শেষ পর্যন্ত মাঠে ছিলেন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিভিন্ন কেন্দ্র পাহাড়া দিয়েছেন। কোথাও ভোট কারচুপি বা কেন্দ্র দখল নিয়ে কোনো ধরনের গোলযোগ হয়নি। আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়নি। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।

এই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীনরা সামনের অন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচনেও জয়ের ব্যাপারে আরো বেশি আশাবাদী বলে জানা গেছে। দলের শীর্ষ নেতাদের মতে, বিএনপি চেয়েছিল খুলনায় বিজয়ী হয়ে সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন প্রমাণ করতে। এর জন্য তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। ভোটারদের সামনে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার প্রচেষ্টায় ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে ভোটাররা বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আস্থা রেখে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছে। জাতীয় নির্বাচনে অবশ্যই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এমনকি সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জনগণ আওয়ামী লীগের পক্ষেই থাকবে বলেও মনে করছেন দলের নেতারা।

এভাবেই খুলনা নির্বাচনকে দেখছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। দলীয় সূত্রমতে, নির্বাচনের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন দলের নেতাদের। নির্বাচন নিবিড়ভাবে তদারকি করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ ছাড়া শীর্ষ পর্যায়ের কেন্দ্রীয় এবং নির্বাচনে দায়িত্বরত নেতারাও যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, এই জয় খুলনাবাসীর। তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন। তারা উন্নয়নের পক্ষে। দেশের মানুষ উন্নয়ন চায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উন্নয়নে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ উন্নয়নের রাজনীতি করে। মানুষ তাই আওয়ামী লীগকে আস্থায় রেখেছে।

বিএনপির পরাজয়ের কারণ তুলে ধরে এই নেতা বলেন, নির্বাচনে বিএনপির দলীয় এজেন্ডা ছিল। মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নে কোনো এজেন্ডা ছিল না। তারা চেয়েছিল জয়ী হয়ে দুর্নীতির মামলায় কারাদন্ড খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন করবে। কিন্তু জনগণ দুর্নীতি চায় না। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। দুর্নীতিবাজ খালেদা জিয়া ও দুর্নীতিগ্রস্ত বিএনপির প্রতি তাদের কোনো সহানুভূতি নেই। তারা বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মাহবুব-উল আলম হানিফ আরো বলেন, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। প্রমাণ হয়েছে মানুষ দুর্নীতির সঙ্গে নেই। উন্নয়নের সঙ্গে।

খুলনায় আওয়ামী লীগের বিজয় জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করেন এই আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি বলেন, খুলনায় প্রমাণ হয়েছে, জনগণ উন্নয়নের পক্ষে। এই সরকারের পক্ষে। এই উন্নয়ন যদি অব্যাহত রাখতে চায়, তা হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকবে। কারণ আওয়ামী লীগ উন্নয়নের রাজনীতি করে, দুর্নীতির নয়; খুলনা দেশকে সেই বার্তা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও খুলনা নির্বাচনের দলীয় সমন্বয়ক এস এম কামাল হোসেন বলেন, জনগণ উন্নয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়ন হয়। তাই আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছে তারা। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি করে। মানুষের জন্য কোনো কাজ করে না। বিএনপির মেয়র থাকাকালীন খুলনায় কোনো উন্নয়ন হয়নি। এমনকি ২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় খুলনা সন্ত্রাসী জনপদে রূপ নিয়েছিল।

আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, এবার খুলনায় আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ ছিল। তৃণমূলে দ্বন্দ্ব ছিল না। আওয়ামী লীগ প্রার্থী সৎ ও জনপ্রিয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডে মানুষ সন্তুষ্ট বলেই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। আশা করছি, আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ জয়ী হবে। কারণ বিএনপিকে মানুষ বিশ্বাস করে না। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে মিথ্যা বলে। দুর্নীতির রাজনীতি করে।

পিডিএসও/হেলাল