এরশাদের কৌশল ক্ষমতার সঙ্গ!

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:১৭

বদরুল আলম মজুমদার

এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রভাব মূলত দেশের একটি কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। সেখান থেকে পাওয়া আসন নিয়ে দরকষাকষি করে ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছেন তিনি। সরকারে থেকেও কখনো সরকারের মৃদু সমালোচনা করেন, কখনো এককভাবে নির্বাচনের হুমকি দিয়েও থাকেন। এজন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। আসন্ন নির্বাচনে নিজের হিস্যা পেতে ফের নড়েচড়ে বসেছেন এই সাবেক সামরিক শাসক। তার শেষ লক্ষ্য ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে থাকা, তা যে দলই হোক। তবে এরশাদের এমন চালে মোটেও বিচলিত নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

এরশাদের কথাবার্তায় কিংবা দরকষাকষিতে তিনি ঠিকই জানিয়ে দিচ্ছেন আগামী নির্বাচনের আগে যেকোনো কিছুই করা তার পক্ষে অসম্ভব নয়। সূত্র জানায়, মহাজোটের সঙ্গে লম্বা তালিকা নিয়ে কথা চালাচালি হলেও এমনই একটি তালিকা নিয়ে বিএনপির সঙ্গেও চলছে তলেতলে যোগাযোগ। এমন রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে গত দুই বছর থেকেই এরশাদ একেক সময় একেক কথা বলছেন। দেশের সাধারণ মানুষও তার এসব কথা শুনে অভ্যস্থ। সর্বশেষ, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে তিনি কত কথাই বলেন। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এরশাদের এসব অতিকথন আসলে শুনবে কে?

জাতীয় পার্টি বর্তমানে ক্ষমতার অংশীদার। একইসঙ্গে দলটি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকাতেও আছে। আবার সুযোগ বুঝে ক্ষমতাসীন দলকে এক হাত নিতেও ছাড়েন না। কখনো কখনো আবার প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসায় থাকেন পঞ্চমুখ। সম্প্রতি রংপুরের বেশ কয়েকটি জনসভায় এরশাদ বর্তমান সরকারের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বারবার এককভাবে নির্বাচনের কথা বলে যাচ্ছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। আবার রংপুরের নিজ বাসায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের কাছে ৭০টি আসন ও ১২টি মন্ত্রণালয়ও দাবি করে বসেন তিনি। এসব দাবি পূরণ না হলে জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে বলেও জানিয়েছেন। মাঝে মাঝে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সুরে কথা বলতেও দেখা গেছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে। দ্বিমুখী কথা বললেও নিজের কৌশলী অবস্থান ঠিকই বজায় রাখছেন তিনি। কোন দিকে যাবেন, কার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, নাকি এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন কিছুুই পরিষ্কার করে বলছেন না সাবেক এই স্বৈরশাসক।

গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করে এরশাদ বলেছেন, বাংলাদেশের অবস্থা এখন এমন যে, হাসিনার কথা ছাড়া একটা গাছের পাতাও নড়ে না। কিছুই হয় না। প্রশাসন চলে না। এখন দলীয়করণ সর্বত্র। সব ব্যাংক খালি। ব্যাংকে টাকা নেই। লুটপাট করা হয়েছে। পানামা পেপারসে সব নেতার নাম আছে। দেশের টাকা পাচার করা হয়েছে। কোনো বিচার নেই।

এর আগে গত শনিবার রংপুরে ৪ দিনের সফরে গিয়ে সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, আপনি আমাদের অংশীদার করে নেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ৭০টি আসন এবং ১০ থেকে ১২টি মন্ত্রণালয় দিন। আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকতে চাই। আমাদের কথামতো আসন আর মন্ত্রণালয় না দিলে আমরা এককভাবে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেব।

এর দুই দিন পর নীলফামারীর এক জনসভায় তিনি বলেছেন, জাতীয় পার্টিকে দেশের সব রাজনৈতিক দল সমীহ করে। বিগত দিনে আমাদের ছাড়া কেউই এককভাবে ক্ষমতায় যেতে পারেনি; আগামীতেও পারবে না। আমাদের অবহেলা করবেন না। তিনি বলেন, ‘রংপুর জাতীয় পার্টির ঘাঁটি ছিল। সেটা অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের আসনগুলো ছিনতাই করা হয়েছে। এ ঘাঁটি মেরামত করতে হবে। আগামী নির্বাচনে রংপুর অঞ্চলের ২২টি আসনে জয়ী হলে আমরাই ক্ষমতায় যাব। সুতরাং, ২২ আসন আমাদের দিন। আমি ক্ষমতায় নিয়ে দেব। একই সমাবেশে তিনি সরকারকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ক্ষমতা হারালে পিঠের চামড়া থাকবে না।

অপরদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে নেওয়ার পর তিনি বলেছেন, বিএনপির কিছু সিনিয়র নেতা তার দলে যোগ দিতে পারেন। এরশাদের এমন কথার জবাবে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা উল্টো প্রশ্ন করে বলেন, এরশাদের দলে নয়, বরং এরশাদই বিএনপি জোটে যোগ দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষ মনে করে, ক্ষমতার রজনীতির বাইরে থাকতে চান না এরশাদ। তাই আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সব ধরনের কৌশলী পথই খুলে রেখেছেন এরশাদ।

এরশাদ যতই সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলুক ঠিক তার উল্টোটা করছেন তারই সহধর্মিণী, সংসদের বিরোধী নেতা রওশন এরশাদ। তিনি সম্প্রতি ময়মনসিংহে এক অনুষ্ঠানে সরকারের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করি। শেখ হাসিনা ২০৪১ সাল পর্যন্ত তো বটেই, এরপরেও তিনি যেন ক্ষমতায় থাকতে পারেন, সেই কামনা করি।

এর ঠিক কয়েকদিন আগে সংসদের অধিবেশনে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের সরকার থেকে সরিয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দয়া করে আপনার মন্ত্রিসভা থেকে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের বাদ দিন। আপনি চাইলেই এটা হয়। কেন চান না, বুঝি না। আপনি আমার দলের মন্ত্রীদের বাদ দিলে জাতীয় পার্টি বেঁচে যেত। তা না হলে আপনি আমাদের দলের সবাইকে মন্ত্রী বানান।’ রওশন এরশাদ বলেন, ‘কোথাও গেলে কথা বলতে পারি না। লজ্জা লাগে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টি আসলে কী করতে চাইছে, তা অনেকটা পরিষ্কার। এরশাদের একমুখে নানা সুরের উদ্দেশ্য হচ্ছে সব কুল ঠিক রাখা। এরশাদ মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত বর্তমান সরকার ক্ষমতায় না আসতে পারলে তার পরিণতিও আওয়ামী লীগের মতো হতে পারে। তাই সময় বুঝেই কথা বলাকে সুযোগের সদ্ব্যবহার বলেই এরশাদ থাকেন বেশ সর্তক।

এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান যা বলছেন তা এখনই শেষ কথা নয়। এখন পর্যন্ত আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। দেশের সব নির্বাচনী এলাকায় আমাদের সমর্থক আছে, সংগঠন আছে এবং প্রার্থী দেওয়ার সক্ষমতাও আছে।

এদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোও তার এ বক্তব্যকে ঠিক তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। রংপুরে এরশাদের বলা কথার জবাব দিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল- অলম হানিফ বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ জানেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ সাহেবের বয়স এখন নব্বইর কোঠায়। একজন বয়স্ক মানুষ কখন কোথায় কি বলে তা বক্তব্যের মধ্যে আসে না।

তবে জাতীয় পার্টির একাধিক সূত্র বলেছে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান যাই বলুক না কেন, দলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়া, না নেওয়ার ওপর। বিএনপি নির্বাচনে এলে ক্ষমতাসীন জোটের কাছে যেমন বেশি আসন বাগানো যাবে না। আবার নির্বাচনী মাঠেও থাকতে হবে কোণঠাসা হয়ে। তবে, যদি কোনো কারণে এরশাদ মহাজোটের সঙ্গে না যায় সেটি হলো ভিন্ন কথা। তবে এখন পর্যন্ত যা বোঝা যাচ্ছে তাতে ধরে নেওয়া যায়, জাতীয় পার্টি মহাজোটরে অংশ হয়েই নির্বাচনে লড়বে।

পিডিএসও/হেলাল