বড় ২ দলে প্রস্তুতি চলছে

এবার আলোচনায় ৫ সিটি নির্বাচন

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০৮:১৯ | আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০১৮, ১১:১৭

প্রতীক ইজাজ

রংপুর সিটি করপোরেশনে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) উপনির্বাচন নিয়ে আশা জেগেছিল মানুষের মধ্যে। সেই সঙ্গে এ বছরই অনুষ্ঠেয় অন্য পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও কমতি নেই উৎসাহ-উদ্দীপনার। নির্বাচনগুলোতে অংশ নিতে অনেক আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানিয়ে আসছে প্রধান দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে মেয়র আনিসুল হকের প্রয়াণে হঠাৎ করে সামনে চলে আসা ডিএনসিসি নির্বাচন সরগরম করে তুলেছিল রাজনীতি। বিভিন্ন দল মেয়রপ্রার্থী ঘোষণাও করেছিল। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত তিন মাসের জন্য এ নির্বাচন স্থগিত করেন আদালত।

ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে তফসিল হলে তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলে নেয়নি। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা বিএনপিসহ কোনো রাজনৈতিক দলও জটিলতা নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। কেবল মুখে মুখে আশঙ্কার কথাই প্রকাশ করে আসছিল। এমনকি এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচন কমিশন ও মন্ত্রণালয় চাইলে আইনের মধ্য থেকেই এ সংকটের সমাধান করতে পারত এবং এখনো পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে উপনির্বাচন এবং উত্তর ও দক্ষিণে নতুন যুক্ত হওয়া ৩৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ভোট হওয়ার কথা ছিল।

বিশ্লেষকরা নির্বাচন আটকে যাওয়ার পেছনে অবশ্য রাজনৈতিক ফ্যাক্টরকেও কারণ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় এই নির্বাচন ঘিরে সরকারি দলে কিছুটা অস্বস্তি আছে। রংপুরে দলীয় মেয়র প্রার্থীর ভোটের বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর এখন রাজধানী ঢাকা নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত সময় নয় বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। এই নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। এমনকি এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারের অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের ইচ্ছা-অনিচ্ছাও প্রকাশ পাবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এই নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের জন্য কিছুটা হলেও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জাতীয় নির্বাচনের আগে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়েও নানা সন্দেহ ঘুরপাক খাচ্ছে নানা মহলে। দেখা দিচ্ছে নানা প্রশ্ন। জাতীয় নির্বাচনের আগে আদৌ এই সিটি করপোরেশনগুলোতে নির্বাচন হবে কি না, নাকি নতুন কোনো জটিলতায় আটকে যাবে নির্বাচন—এমন সংশয় দানা বেঁধে উঠছে রাজনীতিতে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিধিমালা অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। ২০১৩ সালের ১৫ জুন রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল এবং ৬ জুলাই গাজীপুর সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে হিসাবে এবছরের মার্চে চার সিটি এবং মে মাসেই এক সিটিতে নির্বাচন হওয়ার কথা।

এর আগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ও সিলেট সিটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জিতলেও আওয়ামী লীগ আমলের ভোটে হেরে যান দল সমর্থিত প্রার্থীরা। এরপর একই বছরের ৬ জুন আওয়ামী লীগের শক্তিশালী অবস্থান থাকা গাজীপুরেও হেরে যান আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী। সবগুলোতেই জয় পান বিএনপি সমর্থক প্রার্থীরা।

ফলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন আটকে যাওয়ায় এই পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের মধ্যেই এ নির্বাচন নিয়ে নতুন ভাবনার উদ্রেক হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা মনে করছে, এই নির্বাচনগুলোতে জয় না পেলে জাতীয় নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে কিছুটা বেগ পেতে হতে পারে তাদের। আবার বিএনপি মনে করছে, বিগত সময়ে তাদের দলীয় মেয়ররা মামলা-মোকদ্দমার কারণে কাজ করতে না পারায় ভোটারদের এক ধরনের অনাস্থা আসতে পারে তাদের ওপর। সে ক্ষেত্রে জয় পেতে বেগ পেতে হতে পারে তাদেরও।

অবশ্য বড় দুই দলই এসব নির্বাচন নিয়ে দলের ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রমতে, পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে বিভাগীয় শহরগুলোতে সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তফসিল ঘোষণার পর যেহেতু আইনিভাবে তার সেখানে যাওয়ার সুযোগ নেই, তাই তফসিল ঘোষণার আগেই এই সফর শেষ করবেন তিনি। পাঁচ বছর আগের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীর হারের পেছনে অন্যান্য অনেক কারণের সঙ্গে দলীয় কোন্দলকেও চিহ্নিত করা হয়েছিল সে সময়। এবার আগেভাবেই প্রধানমন্ত্রী শহরগুলোতে গিয়ে নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে চান। সেই সঙ্গে দলের কর্মী সমর্থকদেরকেও উৎসাহী করতে চান। জনগণের কাছে সরকারের উন্নয়নের বার্তা তুলে ধরতে চান বলে জানান দলের একাধিক নেতা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, কাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে, সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব সিটিতে যথাসময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। প্রতিটিতেই আওয়ামী লীগ অংশ নেবে। অতীতের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হবে। আশা করছি, এবার সব নির্বাচনে আমরা জয়ী হব। দেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড এবং দেশ পরিচালনায় তার সাফল্যে খুশি। আশা করছি নির্বাচনে এর সঠিক মূল্যায়ন করবে।

অন্যদিকে, এই নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরাও। এ সিটিগুলোতে জয়ী হয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি বার্তা দিতে চায় দলটি। এ লক্ষ্যে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। বরিশাল ও গাজীপুর ছাড়া বাকি তিন সিটিতে বর্তমান মেয়ররাই আগামীতে আবারও দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন। পাশাপাশি বারবার বরখাস্তের কারণে নেতাকর্মী এবং স্থানীয় জনগণও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে বিগত আন্দোলনে গাজীপুর মেয়র প্রত্যাশিত ভূমিকা না রাখায় হাইকমান্ড কিছুটা ক্ষুব্ধ। সেখানে এবার প্রার্থী বদল হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের জন্য টেস্ট কেস। সরকারের জন্যও হবে একটি বড় পরীক্ষা। ইসি কি সত্যিকারার্থেই সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সক্ষম কি না কিংবা সরকারের মনোভাব কী, তা এ নির্বাচনে ফুটে উঠবে। আমরাও নির্বাচনে অংশ নিয়ে পুরো বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করব।

এই নির্বাচনের দিকে দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে—উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এমনিতেই রাজনীতি সরগরম। নানা ইস্যুতে নানা আলোচনা চলছে। তার ওপর আইনি জটিলতার কারণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন আটকে গেল। ফলে এই পাঁচ সিটির নির্বাচন দেশবাসীর জন্য বড় আগ্রহের কারণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে কতটা সক্ষম হবে তা এসব নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর বোঝা যাবে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সরকারের সদিচ্ছাও প্রকাশ পাবে। বেশির ভাগ সিটির বর্তমান মেয়র বিএনপি মনোনীত। তারা নির্বাচিত হওয়ার পর কাজ করতে পারেননি বলে বিএনপি অভিযোগ করছে। এ অবস্থায় নতুন প্রার্থী কে হচ্ছেন এ নিয়ে স্থানীয়ভাবেও কৌতূহল বাড়ছে। পাশাপাশি জয় পেতে ক্ষমতাসীনরা কেমন আচরণ করে, সেদিকেও লক্ষ থাকবে সবার।

তবে সরকারকে বিশেষভাবে সতর্ক করে দিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। গত মেয়াদে ছয়টির মধ্যে পাঁচটিতেই জিতেছিল বিএনপি। সে সময় সরকারের ধারণা হয়েছিল, সুষ্ঠু নির্বাচন দিলে ক্ষমতাসীনরা হারবে। তাই আর কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। তবে কেবল সুষ্ঠু নির্বাচনই নয়, নির্বাচিতদের কাজ করতে দিতে হবে। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তা হলে এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ও সরকারের মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয়তা প্রমাণ হবে। সে অনুযায়ী তারাও নির্বাচনী রাজনীতির ছক কষতে পারবে। তাই এই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া অবশ্যক। সে জন্য সরকারকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। ইসিকে শক্তিশালী হতে হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। যদি এই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অংশগ্রহণমূলক না হয়, তা হলে জাতীয় নির্বাচনেও সংকট দেখা দিতে পারে।

পিডিএসও/হেলাল