নির্বাচনকালীন সরকার

৩ প্রস্তাব নিয়েই এগোবে বিএনপি

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০১৮, ০৮:১৮

বদরুল আলম মজুমদার

সরকারের চার বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন ইঙ্গিতের পর বিএনপিও তাদের সহায়ক সরকার ফর্মুলা দিতে কাজ শুরু করছে। এ নিয়ে দলটি তিনটি কাছাকাছি প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। পূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, সংবিধানের মধ্য থেকে সহায়ক সরকার অথবা সংবিধান পরিবর্তন করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিতে পারে বিএনপি।

বিএনপি নেতারা মনে করেন, নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সেই বিষয়টি স্পষ্ট করেনি, তাই বিএনপিও বিকল্প কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপন করে আলোচনার আহ্বান জানাতে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে কোনো ‘সহায়ক’ নয়, শেখ হাসিনার অধীনেই হবে নির্বাচনকালীন সরকার।

সরকারি দলের এমন অবস্থান মাথায় রেখে বিএনপিও শুধু একক প্রস্তাবে সীমাবদ্ধ থেকে আলোচনার পথ রুদ্ধ করতে চায় না। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ চায় বিএনপি। সেই পরিবেশ যেই প্রক্রিয়াতে আসুক না কেন, বিএনপির তাতে আপত্তি থাকবে না।

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনে থাকা রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সহায়ক সরকারের বেশ কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে ভাবছে। সেটা তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়ক সরকার— যে ফরমেটে হোক না কেন বিএনপির তাতে আপত্তি থাকবে না। কারণ দলটি মনে করে, আগামী নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু হলেই ফল তাদের পক্ষেই যাবে। তাছাড়া একক কোনো প্রস্তাব দিলে সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে দিতে পারে। দলটি মনে করে, রাজনীতির বাইরে দেশের সুশীল সমাজ ও কূটনৈতিক মহলও আগামী নির্বাচনে সকল দলের অংশ গ্রহণে অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের চাপ অব্যাহত রেখেছে। নির্বাচনকালীন সরকার শেখ হাসিনার অধীনে হলে মানা হবে না, দলটির অধিকাংশ নেতা এমন কথা জোর দিয়ে বলে আসলেও বিএনপির প্রস্তাবে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখেও সরহায়ক সরকারের প্রস্তাব থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ছুটি বা ক্ষমতা কমানোর বিষয়টিতে জোর দিবে বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ ব্যাপারে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বিএনপি আগামীতে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়। এজন্য নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা জাতির সামনে সময়মতো উপস্থাপন করবে। তবে আমরা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে কখনোই প্রস্তুত নই।’

দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, পূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, সংবিধানের মধ্য থেকে সহায়ক সরকার অথবা সংবিধান পরিবর্তন করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিতে পারে বিএনপি। প্রস্তাবগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে আগামী নির্বাচনে সকল দলের অংশ গ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চিত করা। এ নিয়ে একাধিকবার আলোচনার প্রস্তাব দিলেও কর্ণপাত করেনি আওয়ামী লীগ। কিন্তু বিএনপি মনে করে, সময় আসলে ঠিকই সরকার আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। এজন্য আন্দোলনে নামার কোনো বিকল্প দেখছে না বিএনপি।

গতকাল পার্টির নয়াপল্টন অফিসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, সময়মতো সহায়ক সরকারের ফর্মুলা জাতির সামনে উপস্থাপন করবে বিএনপি। এজন্য দলটি একটি সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, খালেদার মামলার রায়ের পর কাছাকাছি সময়ের মধ্যেই সেই প্রস্তাব দিতে পারে বিএনপি। কারণ হিসেবে দলটির নেতারা বলছেন, সরকারের ইশারায় আদালত খালেদার মামলা যে গতিতে এগিয়ে নিচ্ছেন তাতে আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই সাজা হতে পারে বিএনপি প্রধানের। খালেদার সাজা হলে দল হিসেবে বিএনপি তাদের সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলের অধিকাংশ নেতার মত, যেহেতু আন্দোলনে নামতে হবে, তাই এক আন্দোলনেই বিএনপির সব দাবি আদায় করে নিতে হবে। সেই চিন্তা থেকে খুব শিগগরিই বিএনপি প্রধান সহায়ক সরকারের রূপরেখো ঘোষণা দিতে পারেন।

তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি : আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সহায়ক সরকারের প্রস্তাবে তিনটি সুস্পষ্ট প্রস্তাব থাকতে পারে। বিএনপির প্রথম দাবি থাকবে, সংবিধান থেকে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বহাল। দলটি মনে করে, বহুল আলোচিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী রায়ে একাধিকবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে দুবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ছুটিতে যাওয়ার আগে রায়ের এক পর্যবেক্ষণেও সে কথাই উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতেই থাকা যুক্তিযুক্ত। তাছাড়া নতুন করে ‘সহায়ক সরকার’ হবে তত্ত্বাবধায়কের আদলেই। বর্তমান সরকারের টানা দুই মেয়াদের প্রথম মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক দাবি নিয়েই রাজপথে নেমে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে দলটি। অবশ্য আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে তত্ত্বাবধায়কের দাবি থেকে সরে এসে নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক’ সরকারের দাবির বিষয়টি গণমাধ্যমে জানায় বিএনপি।

সংবিধান সংশোধন করে ‘সহায়ক সরকার’ : বিএনপি মনে করে, রাষ্ট্রপতি কিংবা স্পিকারের নেতৃত্বে সহায়ক সরকার গঠন করতে চাইলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। যদিও তারা সরকারেরই অংশ এবং প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তার পরও দলটি কৌশলগত কারণে এ দুজনকে প্রধান করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিতে চায়। উদ্দেশ্য হলো অন্তত ওই সময়ের জন্য জনগণের সামনে স্পষ্ট করা যে সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা এখন আর নেই। দলটি এও মনে করে যে, প্রশাসনে শেখ হাসিনার প্রভাব আর ওই দুজনের প্রভাব কখনোই এক হবে না। তাছাড়া ওই দুজনকে প্রধান করে দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ‘অন্য কারো ওপরই সরকারের আস্থা নেই’; এটিও জনগণের সামনে স্পষ্ট হবে বলে মনে করে দলটি।

সংবিধানের মধ্যে প্রস্তাব : নির্বাহী ক্ষমতা খর্ব করে এবং দলীয় সভাপতির পদ ছাড়ার শর্তে প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে রেখেও নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে বিএনপির বড় একটি অংশ। তাদের মতে, শেখ হাসিনা দলীয় সভাপতির পদ ছাড়লে প্রশাসনে তার প্রভাব কমে যাবে। পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে জনগণের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। আর সেই পরিস্থিতিতে বিএনপির পক্ষে গণজোয়ার উঠবে বলে ধারণা দলটির নেতাদের। তাছাড়া সমঝোতা হলে সংবিধান বহাল রেখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগও করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সংসদ উপনেতাই তখন সংসদ নেতা তথা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন, এমন একটি প্রস্তাব দিতে চায় দলটি। পাশাপাশি সংসদ ভেঙে দেওয়া হলে এমপিদের তখন আর নির্বাচনী এলাকাগুলোতে প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকবে না। তবে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি সংসদে না থাকায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সাংবিধানিক জটিলতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির প্রস্তাব হলো নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের মন্ত্রিসভা কমপক্ষে ৪০ থেকে ৫০ সদস্যের করা। যাতে বিএনপির চার-পাঁচজনকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা যায়। সূত্রমতে, দলটির প্রস্তাব হলো প্রতিরক্ষা, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো বিরোধীদের দিতে হবে। পাশাপাশি সাংবিধানিক কারণে ৫০ জনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হলেও দুই দলের ১৯ জন ছাড়া বাকি সদস্যদের নিষ্ক্রিয় রাখার প্রস্তাবনা থাকবে।

এর বাইরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার প্রস্তাব থাকবে; যাতে দলটি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে এবং পুলিশ যাতে তাদের হয়রানি করার সুযোগ না পায়। পাশাপাশি সব জেলার বর্তমান জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) বদলির প্রস্তাবনা থাকবে। থাকবে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবিও।

সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য ওই প্রস্তাব তৈরির ব্যাপারে বিএনপি ঢাকাস্থ কূটনীতিক ও দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করা হচ্ছে। পরামর্শে তারা বলছেন, সরকারের মেনে নিতে সুবিধা হয় এমন বাস্তবসম্মত প্রস্তাবই যাতে তারা দেন। সবার পক্ষে মানা যায় এমন প্রস্তাব বিএনপি দিলে তা হবে এ বছরের রাজনীতির সেরা চমক।

পিডিএসও/হেলাল