নির্বাচন ঘিরে বিএনপির কর্মকৌশল চূড়ান্ত

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ০৮:৪৩ | আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:০৫

বদরুল আলম মজুমদার

দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হলে বা সাজা পরবর্তী নির্বাচনী রাজনীতিকে সামাল দিতে দলীয় কর্মকৌশল ঠিক করেছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার সাজা বা জেল হলে নেতৃত্ব শূন্যতা এড়াতে এবং সচল রাখতে দলের প্রতি নিবেদিত সিনিয়র নেতাদের ওপর ভর করেই চূড়ান্ত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চায় বিএনপি। তবে, কৌশলগত কারণে এসব পরিকল্পনা দলের অন্যদের জানানো হচ্ছে না। এছাড়া দায়িত্ব বদল বা পরিকল্পনা পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়লে লন্ডন থেকেই নেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার কথাও রয়েছে। দলের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে এমন পরিকল্পনার কথা জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সরকার কোনোভাবেই বিএনপিকে ছাড় দিবে না, এমন চিন্তা থেকেই দলটি তাদের পরিকল্পনা গোছিয়ে এনেছে। গৃহীত পরিকল্পনার আগে পরে সরকারি কোনো উসকানিতে পা দিবে না দলটি। এ সময় নেতারা দেশের মানুষের মনোযোগ নিজেদের দিকে নিতে শুধুই সমঝোতার কথা বলে যাবেন। এ ক্ষেত্রে সরকার সমঝোতার পথে না এলে জনমতে অবশ্যই প্রভাব পড়বে, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সর্বাত্মক আন্দোলনে যাবে বিএনপি। তাছাড়া দেশে নির্বাচনী পরিবশে বজায় রেখে আন্দোলনে নামলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও থাকতে পারে। তাই নির্বাচনের তিন থেকে পাঁচ মাস আগের সময়কে আন্দোলনের ‘র্টাম’ ধরে নিয়ে এগিয়ে যাবে।

তাছাড়া দলের চেয়ারপারসনের মামলার রায় সামনে চলে আসায় দলটিকে নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে। সরকার কৌশল করেই এমন অনাকাক্সিক্ষত সূচিতে বিএনপিকে নিয়ে যাচ্ছে মনে করে বিএনপি। আর বিএনপিও খালেদা সাজায় নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে থাকবে। এ ক্ষেত্রে খালেদার সাজা বা জেল হলে সারা দেশে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে প্রতিটি বিভাগে দলের একজন সিনিয়র নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আয়োজনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া দেখাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন। এরই মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বিভিন্ন জেলায় এবং বিভাগে সফরও শুরু করেছেন। তবে, খালেদা জিয়ার সাজার মামলায় কোন রকম হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে না জড়াতে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট বিভাগের নেতাদের ডেকে দায়িত্ব বণ্টন করা হয় এবং এখন থেকেই ‘গ্রাউন্ড ওয়ার্ক’ শুরু করতে বলেছেন খালেদা জিয়া।

বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার সাজায় দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ করা না হলে সারাদেশে ভুল বার্তা যাবে। এতে প্রতীয়মান হতে পারে খালেদার সাজায়ও বিএনপি কিছু করতে পারেনি। তাই ভোটের আগে দেশের মানুষের কাছে দলের সম্পর্কে কোন ‘নেগেটিভ’ ধারণা জন্মাতে দেওয়া যাবে না। তবে খালেদার মামলার নিয়ে সরকার এখনো সিদ্ধান্তহীন জানিয়ে বিএনপির আরেক নেতা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, খালেদার মামলার বিষয়ে সরকার দারুণভাবে হস্তক্ষেপ করছে। অস্বাভাবিক দ্রুততায় বিচার এগিয়ে নেওয়ার পেছনে সরকারের হাত থাকার বিষয়টি প্রায় প্রতিষ্ঠিত। মামলা শেষ পর্যায়ে থাকলেও এখনই রায় দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে সরকারই সিদ্ধান্তহীন। তিনি বলেন, সরকারের একটি পক্ষ চাচ্ছে তড়িতড়ি রায় দিয়ে বিএনপিকে মাঠে নামাতে, আবার অন্য পক্ষ চাচ্ছে নতুন প্রধান বিচারপ্রতি নিয়োগের আগ পর্যন্ত মামলার রায় ঝুলিয়ে রাখতে। তবে যাই করা হোক না কেন বিএনপি মনে করে সরকার এখানেও ভুল করবে।

বিএনপি মনে করে সরকার আবারও একটি প্রহসনের নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই নির্বাচনে বিএনপিকে আনার জন্য কিছু তৎপরতাও সরকার চালাতে পারে। কিন্তু দলটি এ সরকারের অধীনে কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নিবে না এমন সিদ্ধান্তে অটল খালেদা জিয়া। নেতারা মনে করেন, দাবি আদায় করেই বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হবে। সামনে বেশ কয়েকটি সিটি নির্বাচনে বিএনপিও অংশ নিলেও সহায়ক সরকার বা নির্বাচনী পরিবেশ না নিয়ে আসতে পারলে আগামী নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকারকে বৈধতা দেওয়া যাবে না। সিটি নির্বাচনের প্রভাব দিয়ে সরকার নিজেরা প্রশংসা নিতে উঠে পড়ে লাগলেও মূল জায়গায় দলটি ভুল করবে না। কারণ সারাদেশ প্রশাসনসহ বিএনপিকে যেভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে তা সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়বে। এরই ধারাবাহিকতায় সামনের দুই-তিন মাসে বড় চারটি সাংবিধানিক পদেও সরকার নিজেদের লোক বসাতে তৎপর থাকবে। বিএনপি মনে করে, রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, সেনা প্রধান, পুলিশ প্রধান নিয়োগ সরকার আগামী নির্বাচনের কথা চিন্তা করেই করবে। সেইসব পদের নিয়োগ নিয়ে বিএনপির বেশ কিছু নেতাকে নজর রাখতে বলেছেন দলীয় প্রধান। এ সমস্ত পদের লোকদের দলীয় প্রীতির কিছু দেখা সেখানেও সরব থাকবে বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেনও মনে করেন, সিটি নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক ব্যাপার নয়। সিটিতে ক্ষমতা পরিবর্তনের কোনো বিষয় নেই। রংপুরে সরকার সেটা দেখিয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি গত চার বছর থেকে বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলে আসছে। সেই জায়গা থেকে দাবি আদায়ের কোনো ব্যাপার না থাকলে সরাসরি নির্বাচনে গিয়ে সরকারকে ষড়যন্ত্রের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বিএনপি শেষ পর্যন্ত একটা সমঝোতার চেষ্টা করে যাবে। সরকার যদি আবারও পুরনো পথে হাটে তাহলে দল হিসেবে আমরা আমাদের করণীয় ঠিক করব এবং সময় হলেই সেটা দেখা যাবে।

পিডিএসও/হেলাল