ঢাকা উত্তরে নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় ইসিতে

আইনি জটিলতায় সংশয় কাটছে না

প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:৪৭

প্রতীক ইজাজ

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন ওয়ার্ডগুলোতে নির্বাচন নিয়ে একধরনের জটিলতা রয়েছে। দুই সিটিতে নতুন যুক্ত হওয়া ১৮টি করে মোট ৩৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের মেয়াদকালের বিষয়ে আইনে স্পষ্ট বিধান নেই এবং নতুন ভোটারদের ভোটাধিকার নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। নির্বাচনে এসব ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত করে নাকি বাইরে রেখে নির্বাচন করতে হবে-তা নিয়েও বিদ্যমান সিটি করপোরেশন আইনে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। ফলে এসব ওয়ার্ডে নির্বাচিতদের মেয়াদ কত দিনের হবে এবং নতুন ভোটাররা ভোট দিতে ও প্রার্থী হতে পারবেন কি না-তা নিয়ে একধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে।

অবশ্য এ নিয়ে দুই ধরনের মত রয়েছে। একদিকে কোনো জটিলতা দেখছে না নির্বাচন কমিশন। কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, আইনগত দিক খতিয়ে দেখেছি, কোনো জটিলতা নেই। কাউন্সিলরদের মেয়াদের বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করার দরকার আছে বলে কমিশন মনে করে না। বর্তমান পরিষদের মেয়াদ যত দিন, কাউন্সিলরদের মেয়াদ তত দিন। আগামী ৩১ জানুয়ারি প্রকাশিতব্য চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ভোটাররা এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারলেও প্রার্থী হতে পারবেন না।

তবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, জটিলতা নিরসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, অর্থাৎ সরকারের। নতুন ওয়ার্ডের কাউন্সিলররাও মেয়রের মতো নির্ধারিত মেয়াদের বাকি সময়টুকুর জন্যই নির্বাচিত হবেন-সে সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে সরকারকে। একইভাবে নতুন ওয়ার্ডের ভোটারদের ভোটাধিকার ও প্রার্থিতার বিষয়েও পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। ২ জানুয়ারি প্রকাশিতব্য খসড়া ভোটার তালিকায় নতুন ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এসব জটিলতা রেখেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে আইনি দুর্বলতা উল্লেখ করে আদালতে মামলা দায়ের হতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্থগিত হয়ে যেতে পারে নির্বাচন। তেমনি এসব জটিলতা দ্রুত সমাধান না হলে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচনের আয়োজন করা দুরূহ হবে বলেও ধারণা নির্বাচন বিশ্লেষকদের।

এমন অবস্থার মধ্যেই আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছে ইসি। একই দিনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে নতুন যুক্ত ৩৬টি ওয়ার্ডে ভোট গ্রহণ করা হবে। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটিতে ভোট হবে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি। এ বিষয়ে পৃথক তিনটি তফসিল আগামী ৯ জানুয়ারি ঘোষণা করা হবে। বর্তমান সিটি করপোরেশনের মেয়াদ যত দিন বাকি আছে, নির্বাচিত নতুন কাউন্সিলরদের মেয়াদ হবে তত দিন। আগামী ৩১ জানুয়ারি প্রকাশিতব্য চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ভোটাররা এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারলেও প্রার্থী হতে পারবেন না।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এখানে আইনি জটিলতা রয়েছে। আশা করি সরকার ও কমিশন মিলে দ্রুত তা নিরসন করবে। নয়তো জটিলতা আরো বাড়বে। ইসির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুই সিটিতেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে মেয়র পদে মনোনয়ন পেতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি দলের প্রার্থীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এই দুই দলের মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামও শোনা যাচ্ছে। কয়েকটি দল প্রার্থীও ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে বিএনপির প্রধান শরিক দল জামায়াত পৃথক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। দুই সিটিতে একধরনের নির্বাচনী উত্তাপও লক্ষ করা যাচ্ছে। আলোচনা শুরু হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।

তবে ইসির তোড়জোড় অনুুযায়ী মাঠে নামতে দেখা যাচ্ছে না আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে। মেয়র পদে প্রার্থী নিয়েও চলছে একধরনের লুকোচুরি। ক্ষমতাসীনদের প্রার্থী হিসেবে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলামের নাম শোনা গেলেও দলের পক্ষ থেকে কিছু বলা হচ্ছে না। আবার প্রার্থী নিয়ে কিছু বলছে না বিএনপিও। তবে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে ও দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়ালের নাম শোনা যাচ্ছে। এর ফলে এসব জটিলতা নিরসন করে আদৌ সঠিক সময়ে নির্বাচন হবে কি না, নাকি বাকি সময়টুকু প্যানেল মেয়র দিয়ে পার করার চিন্তা রয়েছে সরকারেরÑসে আলোচনাও হচ্ছে নানা মহলে।

অবশ্য এই নির্বাচন নিয়ে সরকার ইতিবাচক বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো। দলের শীর্ষ নেতারা জানান, এ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে ভাবছে না আওয়ামী লীগ, বরং এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জটিলতা নিরসনের দিকেই মনোযোগ তাদের। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতাদের এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া খুঁজতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ডিএনসিসি উপনির্বাচনের বিষয়ে ইতিবাচক। দলীয় সভাপতি দলের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নেতাদের প্রার্থী নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে নির্বাচন কীভাবে করা যায়, সে প্রক্রিয়া দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রার্থী নিয়ে আমি ভেবে রেখেছি।

তবে নির্বাচন নিয়ে এখনো সংশয় কাটছে না বিএনপিতে। তারিখ ঘোষিত হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে দলটি এখনো দোটানায়। দলের নেতারা মনে করছেন, ডিএনসিসি নির্বাচন সরকারের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ গতবারের মতো এবার কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচন করতে গেলে দেশে-বিদেশে সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আবার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করতে পারবে কি নাÑতা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তাই হয়তো কোনো অজুহাত দেখিয়ে শেষ মুহূর্তে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটতে পারে। তবে এ ব্যাপারে যেন সরকারের ভূমিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে সে জন্য কৌশল হিসেবে নির্বাচনী মাঠে প্রার্থী নিয়ে নানা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দলটি।

ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ আইনে নতুন যুক্ত হওয়া এলাকার নির্বাচনের বিষয়ে স্পষ্ট বিধান থাকলেও সিটি করপোরেশন আইনে তা উল্লেখ নেই। আর এ কারণেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোর কমিশনারদের মেয়াদ কত দিন হবে-তা এখনো স্পষ্ট নয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার যদি এ নির্বাচনে আগ্রহী হয়, তাহলে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে কাউন্সিলরদের মেয়াদ নির্ধারণ করে দিতে পারে অথবা সিটি করপোরেশন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারে। আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলে নির্বাচনপ্রক্রিয়া ঝুলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে। ফলে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমেই সঠিক সময়ে নির্বাচন করা যেতে পারে।

তবে ইসির কর্মকর্তারা এ কথাও বলছেন, বিদ্যমান আইনেই সিটি করপোরেশন নির্বাচন করা সম্ভব। সিটি করপোরেশন আইনের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী করপোরেশনের মেয়াদে এটি গঠিত হওয়ার পর প্রথম সভা অনুষ্ঠানের দিন থেকে পাঁচ বছর হবে। সুতরাং কাউন্সিলরদের মেয়াদ পাঁচ বছর হতে হবে এমনটি নয়। তাদের মতে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোর কাউন্সিলরদের মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। এ ছাড়া আইনের ৪(২) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো এলাকা সিটি করপোরেশনভুক্ত হলে, এ আইনের সব আদেশ-নির্দেশ ও ক্ষমতা উক্ত এলাকার জন্য প্রযোজ্য হবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কাউন্সিলরদের মেয়াদ নির্ধারণ না করা এবং হালনাগাদ ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া নতুন ভোটারদের এ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেয়া না হলে, আইনি জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।

তবে নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই বলে জানালেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, নির্বাচন করতে হলে রাজধানীর এ অংশ নিয়ে যে মামলাগুলো রয়েছে, সেগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে, আইনি জটিলতাগুলো নিরসন করতে হবে। তার মানে এ নয় যে, আওয়ামী লীগ নির্বাচন পেছানোর কোনো অজুহাত খুঁজছে। আইনি বাস্তবতা মোকাবিলা করেই নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য অনুরোধ করেছে। ইসিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। আমরাও উপনির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, মনোনয়ন পেতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা ছোটাছুটি করছেন, দলও নির্বাচনের জন্য গ্রাউন্ডওয়ার্ক করছে।

এ ব্যাপারে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, উপনির্বাচন নির্দিষ্ট মেয়াদেই করতে হবে। নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোতে কাউন্সিলর পদেও ভোট গ্রহণ করতে হবে। যদি এ দুটি পদের (মেয়র ও কাউন্সিলর) একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিতে ভোট গ্রহণ করা হয় অথবা নতুন ভোটারদের ভোটের সুযোগ দেওয়া না হয়, সে ক্ষেত্রে জটিলতার নিরসন হবে না। তা ছাড়া নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মেয়াদকাল কত হবে, সেটা একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্ধারণ করে দিতে পারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। আর হালনাগাদে যুক্ত হওয়া বা নতুন ভোটারদের ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে নির্বাচন কমিশন।

পিডিএসও/তাজ