মিয়ানমারকে আস্থায় আনতে পারছে না বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:২৩

প্রতীক ইজাজ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত ২ অক্টোবর ঢাকায় মিয়ানমার মন্ত্রীর সঙ্গে দিপক্ষীয় বৈঠক করে বাংলাদেশ। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর জন্য দুই দেশের মধ্যে ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। নতুন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রস্তাবও মিয়ানমারের মন্ত্রী টিন্ট সুয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এমনকি এ মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নভেম্বরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফরেও আমন্ত্রণ জানান মিয়ানমার মন্ত্রী। ওই বৈঠকে মিয়ানমার মন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হন।

ওই আলোচনার পর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনে সাড়া দেয়নি মিয়ানমার, নতুন চুক্তির প্রস্তাবের ব্যাপারে কোনো কথা বলছে না। এমনকি দুই মন্ত্রীর মিয়ানমার সফরের ব্যাপারে কিছু জানাচ্ছেন না। উল্টো আলোচনার পরও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেখানে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে এখনো বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা। বিশেষ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতায় রোহিঙ্গাদের মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ইতোমধ্যেই এই সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তবে জাতিসংঘ এ সংখ্যা গত সোমবার পর্যন্ত পাঁচ হাজার বলে উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া নাফ নদী ও নদীর মোহনায় সাগর দিয়ে রোহিঙ্গার লাশ ভেসে আসার সংখ্যা ১২০ জনে উন্নীত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের হত্যার পর তাদের নৌকাবোঝাই করে এ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি সাগরে উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে ছোট ছোট নৌকাযোগে আসার পথে কত রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছেন তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

মিয়ানমার মন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সদিচ্ছা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমার আদৌ কি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়; নাকি সংকট সমাধানে আলোচনার প্রস্তাব নিছক লোক দেখানো-তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন একপক্ষ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নানা চাপ ও নিন্দা উপেক্ষা করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া বা তাদের নির্যাতন বন্ধ করার পরিবর্তে নির্যাতন অব্যাহত রাখায় দেশটি উদ্ধত আচরণ প্রকাশ করছে বলেও মত দিয়েছিলেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছিলেন, মিয়ানমারের এমন আচরণের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের সম্মতি লোখ দেখানো বলে মনে হচ্ছে। তবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নতুন চুক্তি ও যৌথ

ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে দুই দেশের ঐকমত্যে পৌঁছানোকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হিসেবেই দেখেছিল অন্যপক্ষ। তাদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সদিচ্ছা আশা করছিল বিশ্ব। সে আহ্বানে দেশটি সাড়া দিয়েছে। এটি ইতিবাচক অগ্রগতি।

কিন্তু সেই আলোচনার এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে আস্থায় নিতে পারছে না বাংলাদেশ। কথায় ও কাজে মিল না থাকায় দেশটি আদৌ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় কি না-তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে ঢাকা। গত সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের ডেকে বলেছেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে রাখাইনে নির্যাতন এখনো বন্ধ হয়নি। রাখাইনে নারী, শিশু ও বয়স্কদের ওপর এখনও নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, সেখানে এখনো ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসা অব্যাহত রয়েছে। গত ১০ দিনে ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। আর ২৫ আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ২০ হাজারে।

সর্বশেষ গতকালও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া ও সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের সদিচ্ছা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার সরকার ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাকে ‘আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করার কৌশল’ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় কী-জানতে চাইলে মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর (অব.) ইমদাদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার-দুই পক্ষকেই আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরো বাড়াতে হবে। এখন আর নীরব কূটনীতির আশ্রয় নিলে হবে না, সরব কূটনীতি চালাতে হবে। মনে রাখতে হবে মিয়ানমার এর আগেও চুক্তি ভঙ্গ করেছে।

এই বিশ্লেষক সন্দেহ পোষণ করে বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হওয়ার পরও নির্যাতনের অর্থ হলো মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় না। তাদের নির্যাতনের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী রাখতে চায় না। কারণ যেভাবে চাপ আসছে, তাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অবশ্যই মিয়ানমারে ঢুকতে দিতে হবে। মূলত সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সদিচ্ছা নেই। তারা আলোচনা প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে চায় ও আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমন করতে চায়। তবে ভারত, রাশিয়া ও চীনকে দিয়ে বাধ্য করানো গেলে মিয়ানমার সংকট সমাধানে এগিয়ে আসবে। একইভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের কাছে বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত না থাকলে মিয়ানমার মূল সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী নাও হতে পারে। তিনি রাখাইনে সহিংসতা বন্ধে এবং রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা কামনা করেছেন।

মিয়ানমারের কৌশল বুঝতে পেরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে ১৯৯২ সালের নীতিগত সিদ্ধান্ত বর্তমানে গ্রহণযোগ্য নয় এবং বাংলাদেশ তা মানবে না বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশি কূটনীতিকদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ১৯৯২ সাল ও ২০১৭ সালের পরিস্থিতি এক নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ অবস্থায় লাখ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ঘোষিত ২৫ বছর আগের সমঝোতা ও নীতিমালা বর্তমান পরিস্থিতিতে কার্যকর হতে পারে না। ২ অক্টোবরের বৈঠকে মিয়ানমারের মন্ত্রী প্রস্তাব দিয়েছিলেন ২০১৬ সালের অক্টোবরের পর যারা বাংলাদেশে এসেছেন, যাচাই সাপেক্ষে তাদের প্রত্যাবাসনে তারা রাজি। যাচাইয়ের জন্য তারা ১৯৯২ সালে গৃহীত যৌথ নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বিবৃতিকে ভিত্তি হিসেবে ধরার প্রস্তাব করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের এই সিদ্ধান্ত মানা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন তাদের বেশির ভাগেরই বাড়িঘর পুড়ে গেছে এবং প্রায় কারো কাছেই কোনো কাগজপত্র নেই। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষই বলেছে অর্ধেক রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়ে গেছে। যেহেতু রোহিঙ্গাদের কাছে কোনো কাগজ নেই, তাই কোনো রোহিঙ্গা যদি তাদের বাড়ির ঠিকানা বলতে পারে, নাগরিকত্ব যাচাই করার জন্য সেটাই মানদ- হওয়া উচিত। এ ছাড়া এ ক্ষেত্রে যৌথ যাচাইকরণ এবং সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নতুন একটি সমঝোতার প্রয়োজন এবং তার একটি খসড়া মিয়ানমারের মন্ত্রীকে দিয়েছে বাংলাদেশ। খসড়া সমঝোতায় আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নেওয়া এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশ পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও রোহিঙ্গা গবেষক অধ্যাপক জাকির হোসেন ‘নাগরিকত্ব’ বিষয়টি পরিহার করে রোহিঙ্গাদের নিঃশর্তে ফেরত নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, নাগরিকত্ব বিষয়টি যদি বাদ দেয় এবং চলমান নির্যাতন বন্ধ করে, তবেই সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সদিচ্ছা প্রকাশ পাবে। একদিকে ফেরত নিতে নতুন নতুন পরিকল্পনার কথা বলবে, অন্যদিকে নির্যাতন চালিয়ে যাবে-তা হয় না। এটা বিপরীতমুখী আচরণ। মিয়ানমার যদি সত্যিই সংকটের সমাধান চায়, তাহলে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে হবে। ফেরত নেওয়ার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ১৯৭৮, ১৯৯১-৯২ ও ২০১৬ সালেও ফেরত নিয়েছিল। নেওয়ার পর আবার নির্যাতন চালিয়েছে। রোহিঙ্গারা পালাতে বাধ্য হয়েছেন। এমন অবস্থা চলতে থাকলে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। তা ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আগে মিয়ানমারে বিভিন্ন সংস্থাকে ঢুকতে দিতে হবে। এমনকি এই গবেষক দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বিপক্ষেও তার মত দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। সুতরাং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরিবর্তে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করতে হবে। জাতিসংঘ বা কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্রকে রাখতে হবে। যাতে চুক্তি ভঙ্গ করতে না পারে। এই চুক্তি আশা দেখাবে তখনই যখন দেখব মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করেছে।

এই গবেষক জানান, ১৯৯২ সালের এপ্রিলের ২৩ তারিখ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয় এবং আলোচনা শেষে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ একটি যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ থেকে ২৮ জুলাই ২০০৫ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়। কিন্তু বর্তমান সংকট ভিন্ন। এরই মধ্যে সুকৌশলে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের আরো প্রান্তিক করে ফেলা হয়েছে। রোহিঙ্গারা যে নিজেদের মিয়ানমারের স্থায়ী বা অস্থায়ী বাসিন্দা বলে প্রমাণ করবে তার কাগজপত্র রীতিমতো গায়েব করে ফেলা হয়েছে। ফলে, মিয়ানমার ১৯৯২ সালের ফর্মুলার কথা বললে ধরে নিতে হবে যে, তারা প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় না।

পিডিএসও/হেলাল