প্রবাসেই ভোটার হবেন প্রবাসীরা

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১২:১৫

গাজী শাহনেওয়াজ

প্রবাসী বাঙালিদের ভোটার হওয়ার জন্য এখন থেকে আর দেশে আসার দরকার হবে না। প্রবাসে বসেই বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তাদের সহায়তায় তারা ভোট দিতে পারবেন। জাতীয় পরিচয়পত্রটিও সংগ্রহ করতে পারবেন কর্মস্থলে বসেই।

কমিশনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে করা টিম প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে বাঙালি-অধ্যুষিত দেশগুলোতে গিয়ে তাদের ভোটার তথ্য সংগ্রহ ও নিবন্ধন সম্পন্ন করবেন। দেশে ফিরে সংগৃহীত তথ্য সংশ্লিষ্ট ভোটারের নিজ উপজেলায় পাঠিয়ে কমিশনের থানা-উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর এ কার্যক্রমটি সম্পন্ন করা হবে। তথ্য সব ঠিক থাকলে প্রবাসী সব নাগরিককে দেওয়া হবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মাটকার্ড।

প্রাথমিক অবস্থায় পরীক্ষামূলক প্রকল্পের (পাইলট) মাধ্যমে এই কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা হবে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রবাসী বাঙালি-অধ্যুষিত তিনটি দেশকে বেছে নেওয়া হয়েছে; দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে-সৌদি আরব, কাতার ও মালয়েশিয়া।

পাশাপাশি, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা এসব বাঙালির স্বদেশে ফিরে আগের মতোই ভোটার হতে পারবেন। সে ক্ষেত্রেও তাদের ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়ার কাজটির শর্ত শিথিল করা হচ্ছে।

প্রবাসীদের প্রবাসে ভোটার করা ও পরিচয়পত্র পৌঁছে দেওয়াসহ এখানে এসে ভোটার হওয়ার কাজটি সহজ করতে কাজ করছে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ (এনআইডি উইং) কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবনার খসড়া তৈরি করে বর্তমানে তার ওপর পর্যালোচনা চলছে। সব ধরনের প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করে এনআইডি উইং নির্বাচন কমিশনে উপস্থাপন করবে। তাদের দেওয়া প্রস্তাব আরেক দফা যাচাই-বাছাইয়ের পর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটির ওপরে অবস্থান করা বাংলাদেশিদের ভোটার করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। খবর এনআইডির নির্ভরযোগ্য সূত্রের।

জানতে চাইলে প্রবাসীদের ভোটার করা-সংক্রান্ত কমিটির আহ্বায়ক ও নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, প্রবাসীদের প্রবাসে থাকাবস্থায় ভোটার হওয়া নাগরিক অধিকার। কিন্তু এখনো এ-সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে, কমিশনের নানা ফোরামে প্রবাসীদের প্রবাসে থেকে ভোটার করা এবং ভোটদানের বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে চলমান সংলাপে প্রবাসীদের ভোটার করার বিষয়ে প্রস্তাব না পেলেও ভোটদানের বিষয়ে প্রস্তাব এসেছে। তবে, প্রবাসীদের ভোটার করার বিষয়টি যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, প্রবাসীদের ভোটার করার জন্য আমরা চিন্তাভাবনা করছি, কীভাবে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে তৈরি একটি প্রস্তাবনা পর্যালোচনা চলছে, যাতে তারা প্রবাসী বাংলাদেশে আসবে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রক্রিয়া সহজ করে যতদ্রুত সম্ভব ভোটার করে পরিচয়পত্র সরবরাহ করা যায়। পাশাপাশি তাদের ভোটার করার ক্ষেত্রে যৌক্তিকভাবে এভিডেন্সগুলোর শর্ত শিথিল করে পরিচয়পত্র দেওয়া যায় সেটিও ওই প্রস্তাবের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

স্মাটকার্ড প্রকল্পের পরিচালন ও এনআইডি উইংয়ের ডিজি বলেন, দেশে এসে যারা ভোটার হবেন, তাদের বিদেশে থাকাবস্থায় দূতাবাসের মাধ্যমে কীভাবে ভোটার করা যায়, সেটিও পর্যালোচনা চলছে। তিনি বলেন, এটা চূড়ান্ত না, প্রাথমিক আলোচনা। কেউ যাতে তাদের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন। কারণ প্রবাসীদের ভোটার হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া গর্বের বিষয়। দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান রয়েছে। কিন্তু দেশে আসার পর জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার কারণে জমির নিবন্ধন করতে পারেন না, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন না। এমনকি বাংলাদেশের বাইরে কারাগারে গেলে তারা বলতে পারেন না তারা বাংলাদেশি। আমরা চাই, তারা বাংলাদেশি হিসেবে ভালোভাবে কাজ করতে পারেন, নাগরিক সুবিধা শতভাগ ভোগ করতে পারেন এবং তারা যেন দেশকে উন্নতির জন্য সহায়ক হন। ভোটার করার পাশাপাশি ভোটদানের বিষয়ে আপনাদের প্রস্তাবে কোনো সুপারিশ থাকবে কি না জানতে চাইলে ডিজি বলেন, ভোটদানের বিষয়টি এনআইডির বিষয় নয়; এটা কমিশনের অংশ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সব নাগরিকের ভোটার জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার এখতিয়ার ইসির। দেশে-বিদেশে সব নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রদ্ধতিগত প্রক্রিয়ায় কোনো ভিন্নতা নেই। কিন্তু কমিশনের ডেটাবেজ ব্যবহার করে প্রবাসীদের ভোটার করার ইচ্ছা পোষণ করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব কমিশনে আসে।

পরবর্তীতে প্রবাসীদের প্রবাসে থাকাবস্থায় কোন পদ্ধতির আলোকে ভোটার করা যায়, সেই উদ্যোগ শুরু হয়। এনআইডি উইং একটি খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি করে। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবনায়, প্রবাসীদের প্রবাসেই ভোটার করা, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও কলস্যুলার অফিসের সহায়তায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ভোটার করা, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের বিশেষ ট্রেনআপ করে দূতবাসগুলোতে পাঠানো, এর জন্য বছরের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা, টিমের সদস্য সর্বোচ্চ ১০ সদস্য করা, প্রবাসীদের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ সংগ্রহ করা, বিদেশে সংগৃহীত তথ্য দেশে এনে যার যার উপজেলায় পাঠানো, সেগুলোর তথ্য যাচাই-বাছাই করা এবং তথ্য সঠিক থাকলে এনআইডির সার্ভারে আপলোড করা ইত্যাদি। তবে, কার্ডটি মুদ্রণের আগে পারসোলাইজেশন করিয়ে স্মার্টকার্ড হিসেবে মুদ্রণ করা হবে। এ হিসেবে সব প্রবাসী ভোটারকে দেওয়া হবে স্মাটকার্ড। প্রবাসীদের মুদ্রিত কার্ডগুলো সংশ্লিষ্টদের দূতাবাসে কমিশন পাঠানো এবং সেখান থেকেই প্রবাসী ভোটাররা তাদের নিজ নিজ পরিচয়পত্রটি সংগ্রহ করে নেবেন।

পরিচয় গোপন রেখে প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একজন এনআইডির কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক অবস্থায় সব প্রবাসীদের ভোটার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। তাদের প্রবাসেই ভোটার করার শুরুতে একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে প্রবাসী বাংলাদেশি-অধ্যুষিত সব দেশকে প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রবাসীদের ভোটার করার উদ্যোগটি বিদায়ী কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন কমিশনের সময়ে শুরু হয়। গত বছরের ৫ অক্টোবর সাবেক এনআইডির মহাপরিচালককে প্রয়োজনীয় কার্যপত্র উপস্থাপনের জন্য বলা হয়। সাবেক সিইসির নির্দেশে ইসির সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব (বর্তমান উপসচিব) মাহফুজা আক্তার স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত চিঠিতে অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেসুর রহমান লেখেন, বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে এনআইডি কার্ড দেওয়ার জন্য অনুরোধ পাওয়া যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি দূতাবাসের কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে অনুরোধ করেছেন। এ জন্য তিনি তার নোটে বিদ্যমান ভোটার নিবন্ধন আইন সংশোধনসহ বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাতে বলা হয়েছে, এনআইডির মাধ্যমে প্রবাসীদের জন্য অনলাইনে বায়োমেট্রিক সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিভিন্ন দেশে ছোট ছোট দল পাঠিয়ে হালনাগাদের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। পরে এই নোটে সম্মতি দিয়ে এনআইডি শাখাকে দ্রুত কার্যপত্র দেওয়ার নির্দেশ দেন সাবেক ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম। পরবর্তী সচিব ও এনআইডির ডিজি পরিবর্তন হওয়ার পর এ উদ্যোগটি থেকে যায়। আগের প্রস্তাবের আলোকে বর্তমান এনআইডি উদ্যোগ নিয়ে প্রবাসীদের প্রবাসে থাকাবস্থায় ভোটার করার প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে, যা পর্যালোচনার পর শিগগিরই কমিশনে উপস্থাপন করা হবে।

এর আগে ১৯৯৮ সালে দেশের উচ্চ আদালত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার সংবিধান স্বীকৃত বলে ঘোষণা দিলেও দীর্ঘ ১৮ বছরে তাদের সে অধিকার বাস্তবায়ন করা হয়নি। অথচ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় প্রবৃদ্ধির ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ এক হাজার ৫৩১ কোটি মার্কিন ডলার। এটি আমাদের জাতীয় বাজেটের প্রায় অর্ধেকের সমান। নাগরিক হিসেবে প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখলেও জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় তাদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অধিকার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না। পাশাপাশি দেশের নাগরিক সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিশ্বের ১৫৭টি দেশে কোটির ওপর প্রবাসী অবস্থান করছে। বর্তমান কমিশনের উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের অবসান এবং দাবি পূরণ হবে বলে আশা করছেন এ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন এনআইডির এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রবাসীদের ভোটার করার উদ্যোগটি প্রাথমিকভাবে তাদের কমিশনের আমল থেকে শুরু হয়। তিনি এবং অপর নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন প্রবাসীদের ভোটার করার জন্য সে সময় যুক্তরাজ্য সফর করে একটি প্রস্তাবও রেখেছিলেন বলে জানান এই নির্বাচন কমিশনার।

পিডিএসও/হেলাল