সাবরিনা জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে বেতন নিতেন, স্লিপ পুলিশের হাতে

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২০, ১৫:৫৬

অনলাইন ডেস্ক

করোনাভাইরাস রিপোর্ট জালিয়াতিতে আলোচিত জেকেজি হেলথকেয়ারের সঙ্গে ডা. সাবরিনার কোনও সম্পর্ক না থাকার দাবি করলেও তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে মাসে মাসে বেতন নিতেন বলে ‘প্রমাণ’ পেয়েছে পুলিশ।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, এরকম তিনটি বেতনের স্লিপ তাদের হাতে রয়েছে।

সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজির চেয়্যারম্যান হয়ে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ভঙ্গ করায় ইতোমধ্যে সাবরিনাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

সাবরিনা এবং তার স্বামী জেকেজি হেলথ কেয়ারের সিইও আরিফুল হক চৌধুরী বর্তমানে মামলাটি তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজেতে রয়েছেন।

বুধবার রাতে ডিবি কার্যালয়ে তাদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার গোলাম মোস্তফা রাসেল জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, গতরাতে তাদের একবার মুখোমুখি করা হয়েছে, যাতে তদন্তে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে।

জিজ্ঞাসাবাদে নতুন কী পাওয়া গেছে জানতে চাইলে এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, চিরাচরিত যা হয়, একে অপরকে দোষ দেওয়া. এখানেও তাই হয়েছে। তবে সেখান থেকে ক্লু নিয়ে কাজ করতে হবে এবং আমরা তাই করছি।

নতুন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করে পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহের দায়িত্ব নিয়েছিল ওভাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার- সংক্ষেপে জেকেজি।

কিন্তু জুনের শেষ দিকে অভিযোগ আসে, সরকারের কাছ থেকে বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে বুকিং বিডি ও হেলথকেয়ার নামে দুটি সাইটের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছিল জেকেজি। নমুনা পরীক্ষা না করে রোগীদের ভুয়া সনদও তারা দিচ্ছিল।

এ বিষয়ে রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি বাড়ির কেয়ারটেকারের অভিযোগের সত্যতা পেয়ে গত ২২ জুন জেকেজি হেলথ কেয়ারের সাবেক গ্রাফিক ডিজাইনার হুমায়ুন কবীর হিরু ও তার স্ত্রী তানজীন পাটোয়ারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে প্রতিষ্ঠানটির সিইও আরিফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়, যিনি জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের চিকিৎসক সাবরিনার স্বামী। সে কারণে ‘সাবরিনা আরিফ চৌধুরী’ নামেই পরিচিত ছিলেন সরকারি এই চিকিৎসক।

জেকেজি নমুনা সংগ্রহের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে ডা. সাবরিনার কথাই বলা হত। তবে দুর্নীতির খবর প্রকাশ পাওয়ার পর তিনি দাবি করেন, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত দুই মাস ধরে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে গত ১২ জুলাই ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জালিয়াতির ওই মামলায় সাবরিনাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন তাকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত।

আর সাবরিনার স্বামী আরিফুলকে বুধবার দ্বিতীয় দফায় চার দিনের রিমান্ডে নেওযার আবেদন আদালত মঞ্জুর করে।

তাদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, তারা পরস্পরকে তুই-তুকারি করছিলেন, একজন অপরজনের জীবন ধ্বংসের জন্য দায়ী করছিলেন।

“সাবরিনা তার স্বামীকে বলছিলেন, ‘সবকিছু করে এখন আমাকে ফাঁসিয়েছিস।’ আরিফুল কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেন, ‘তুমিতো চেয়ারম্যান, তোমার কি দায় নেই?’ আরিফুল এ সময় মোটামুটি শান্ত থাকলেও সাবরিনাকে অস্থির দেখাচ্ছিল।”

গোয়েন্দা পুলিশের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, জেকেজির অফিস থেকে জব্দ করা ডেস্কটপে দুই হাজারের বেশি কোভিড পরীক্ষার জাল রিপোর্ট পাওয়া গেছে।

“জিজ্ঞাসাবাদে তারা দুজন নিজেদের জেকেজির আহ্বায়ক দাবি করছেন। আহ্বায়ক বলে কোনো পদ তাদের নেই, কিন্তু বারবার জিজ্ঞাসা করলেও তারা ভিন্ন কিছু বলেননি।”

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, সাবরিনা অস্বীকার করলেও তিনটি বেতনের স্লিপ পুলিশ পেয়েছে, সেখানে দেখা গেছে, জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে সাবরিনা প্রতি মাসে ত্রিশ হাজার টাকা করে নিতেন।

চেয়ারম্যানের বেতন এত অল্প টাকা কেন- এ প্রশ্নে ওই কর্মকর্তা হাসতে হাসতে বলেন, “এটাতো সম্মানি হিসেবে দেখানো হত। আসলে সবকিছুইতো তাদের। হয়ত অন্য স্টাফদের এটা বোঝানোর জন্য যে চেয়ারম্যান হয়েও তিনি কত কম টাকা নেন।

আরিফুলকে জুনের ২৩ তারিখ গ্রেপ্তার করার পর তার স্ত্রী সাবরিনাকে গ্রেপ্তার করা হয় ১২ জুলাই। এই সময়ে সাবরিনা নিজেদের ‘কৃতকর্মের অনেক তথ্য প্রমাণ’ সরিয়ে ফেলে থাকতে পারেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা।

সে কারণে এ মামলাটি সময় নিয়ে তদন্ত করতে চান জানিয়ে ডিবির উপ-কমিশনার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, আজ সাবরিনার রিমান্ড শেষ হচ্ছে। শুক্রবার তাকে আবার আদালতে তুলে রিমান্ড চাওয়া হবে। তবে আবার কতদিন রিমান্ড চাওয়া হবে তা এখনও ঠিক করা হয়নি।