ইসির অনলাইনসেবায় ব্যাপক সাড়া, কমেছে দালালের দৌরাত্ম্য

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২০, ০৮:০৫ | আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২০, ০৮:১৬

গাজী শাহনেওয়াজ

সাংবিধানিক ও সেবামূলক সংস্থা হিসেবে করোনাকালীন এ দুর্যোগেও নাগরিকদের সেবা দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেজায় খুশি। কারণ অনলাইনে আবেদন করে ভোটার জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তি সাধারণ মানুষের জন্য সহজ হয়েছে। এর ফলে তাদের সময় অপচয়ের পাশাপাশি অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে। এ ছাড়া দালালদের দৌরাত্ম্য কমেছে। হয়রানির হাত থেকে বাঁচছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।

এখন পর্যন্ত ১২ লাখের কাছাকাছি সেবাপ্রত্যাশী ইসির প্রধান কার্যালয়সহ সারা দেশের উপজেলা-জেলা ও আঞ্চলিক অফিসগুলোতে আবেদন করেছেন। তথ্য যাচাই করে দ্রুত সমাধান করছে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

একই সঙ্গে এখন থেকে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের হারানো আইডি কার্ড মুদ্রণ ও ছোটখাটো ভুল সংশোধনের এখতিয়ার দিয়েছে ইসির প্রধান কার্যালয়। ফলে গ্রাহকের আরো বড় ধরনের ভোগান্তির অবসান ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সেবাদানকারী সংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে এনআইডি সেবাকে সহজতর করতে চারটি ক্যাটাগরিও নির্ধারণ করে দিয়েছে কমিশন। এ কাজটি নিরবচ্ছিন্নভাবে করতে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে সিএমএস পোর্টাল, যার সহায়তায় এনআইডির সেবা কার্যক্রম তড়িৎ গতি ফিরবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগে (এনআইডি উইং) মহাপরিচালক ব্রি. জে. মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, এনআইডির সেবাকে মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে কাজের ক্ষেত্র বিকেন্দ্রীকরণ করি। সেটাতে একটা লক্ষ্যে এসে ঠেকেছি। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে করোনাকালীন ভয়াবহ এ পরিস্থিতিতে মানুষ যাতে সেবা বঞ্চিত না হয়, সেজন্য অনলাইন কার্যক্রম চালু করি।

এর আগে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের এনআইডির সেবাদানে উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কারণ এই সেবাটির সঙ্গে মানুষের কর্মসংস্থান সম্পৃক্ত। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনলাইন সেবা চালু করি। এর সুফল পাচ্ছে সাধারণ নাগরিক।

তিনি বলেন, এতে এক বছরে সরকারের সাশ্রয় হচ্ছে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এই সেনা কর্মকর্তা আরো বলেন, অলনাইনে সেবা চালু করায় দালাল ও অসৎ নাগরিকদের যে দৌরাত্ম্য ছিল, তা অনেকাংশে কমে এসেছে। এটা ইতিবাচক। এর মাধ্যমে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কমিশনের ভাবমূর্তি বেড়েছে, যোগ করেন এনআইডির ডিজি।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন) মো. আবদুল বাতেন বলেন, সেবামূলক সংস্থার কাজ হলো কীভাবে সেবাটাকে নাগরিকের ঘরে পৌঁছে দেওয়া যায়। সে লক্ষ্যে কমিশনারদের পাশাপাশি এনআইডির ডিজি নিরলসভাবে কাজ করছেন। এত দিন পরে এসে একটা লক্ষ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মধ্যে করোনাকালীন এ সংকটে অনলাইনে আবেদন করে সেবা প্রদানের পদ্ধতি চালু করায় ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। নাগরিকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। ঘরে বসেই আবেদন করে নতুন কার্ড পাচ্ছেন। তিনি বলেন, সারা দেশে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জেলা পর্যন্ত সিএমএস পোটারের মাধ্যমে সেবা চালু আছে। অফিসে বসেই কার্ড প্রিন্ট করতে পারছেন তারা। এটাও একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ।

এনআইডির কর্মকর্তারা জানান, ভয়াবহ করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সরাসরি সেবা প্রদানের পরিবর্তে অনলাইনে এনআইডি সেবা অব্যাহত রেখেছে নির্বাচন কমিশন। এতে যারা এনআইডি পাননি, তারা নিজেরাই ইসির ওয়েবসাইটে গিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ডাউনলোড করে নিতে পারছেন। এ ছাড়াও নতুন ভোটার হওয়ার আবেদন, ঠিকানা পরিবর্তন ও এনআইডি উত্তোলন সংক্রান্ত সেবার আবেদনও জমা দেওয়া যাচ্ছে অনলাইনে।

অনলাইনে এনআইডি সংক্রান্ত সেবা কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিএমএস) সফটওয়্যার করা হয়েছে। সিএমএস এর ওপর তিন সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রতি শেষে করেছে ইসি। অনলাইনে আবেদনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির তথ্য সংযোজন-বিয়োজন, যাচাই-বাছাই, ভোটার হিসেবে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্রের আবেদন, সংশোধন, হারিয়ে যাওয়া কার্ড উত্তোলন ও ব্যক্তির ঠিকানা পরিবর্তন যে নতুন সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়, সেটাই কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিএমএস) সফটওয়্যার। ঘরে বসেই এনআইডি-সংক্রান্ত সেবা মিলবে স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে। এখন থেকে নাগরিকদের নির্বাচন অফিসে আসাও লাগছে না। দেশব্যাপী সেবার পরিধি বিস্তৃতি করতে জুমঅ্যাপের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের অনলাইন প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

সেবামূলক এই কার্যক্রমের বিষয়ে কথা হয় সাতক্ষীরার সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার মো. নাজমূল কবীরের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার জেলাধীন থানা নির্বাচন অফিসের পাশাপাশি খোদ জেলা অফিসেও নতুন যারা ভোটার হতে চাইছেন তাদের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তার অফিসেই ৪৪টি আবেদন পেয়েছেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অনলাইনে আবেদন করলেও ভোটার সংশ্লিষ্টরা চাহিদা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক কাগজ সরবরাহ করছেন। বলা যায় এটা ইতিবাচক। এতে তাদের যেমন কর্মঘণ্টা বাঁচছে। তেমনিভাবে হয়রানি বন্ধ হচ্ছে।

আর রাজধানীর তেজগাঁও থানার নির্বাচন কর্মকর্তা সৈয়দ আফজাল আহম্মেদ বলেন, অফিস বন্ধের মধ্যে অনলাইন কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এ পদ্ধতি চালু হওয়ায় শুধু এ থানায় আবেদন জমা পড়েছে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৬৭টি। এতে নতুন কার্ড উত্তোলনে, হারানো কার্ড প্রাপ্তিসহ অনেক আবেদন আসছে। এ ছাড়া বর্তমান ডিজি যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে এখন থেকে সিএমএস সিস্টেম ফলো করে ছোটখাটো ভুল যেমন নামে মো. নেই কিংবা আছে কিংবা এক বছরের নিচে বয়স সংশোধনের এখতিয়ার পেয়েছে মাঠ অফিস।

এরজন্য চার ক্যাটাগরির সার্ভিসের নির্দেশনা রয়েছে। এরমধ্যে ক ক্যাটাগরিতে ছোটখাটো ভুল সংশোধন, খ ক্যাটাগরিতে বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রে জেলা নির্বাচন অফিসের সম্মতি এবং গ ক্যাটাগরিও এ পর্যায়ে থাকলেও অতি-জটিলতাগুলো অর্থাৎ ঘ ক্যাটাগরি প্রধান কার্যালয়ের সম্মতি ছাড়া সংশোধন হবে না। এর আগে মাঠ অফিস প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তথ্য যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করবে। এ ছাড়া ২০১৭ সালে যারা ভোটার হয়েছিলেন তাদেরও কার্ড দিচ্ছি। এ ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রজেকশনের মাধ্যমে পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হতে সাহায্য করছি, যাতে অনলাইনে কার্যক্রম করতে সহজ হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, সিএমএস যে সিস্টেম চালু করা হয়েছে, সেখানে কাজ করা দুরূহ হয়ে যাচ্ছে। কারণ নেটওয়ার্ক সমস্যা লেগে থাকে। এ সমস্যা নিরসন হলে সাধারণ মানুষ অতি সহজে এনআইডি সেবা পাবেন।

বর্তমানে ইসির সার্ভারে ১১ কোটি ভোটারের তথ্য আছে। এদের প্রথমে এনআইডি সরবরাহ করে পরবর্তী স্মার্টকার্ড দিচ্ছে ইসি। যারা এখন লেমিনেটিং করা কার্ড নিচ্ছেন বা নিজে এনআইডি নিজেই ডাউনলোড করে নিচ্ছেন, তারাও পরে স্মার্টকার্ড পাবেন। বর্তমানে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি ইসিকে স্মার্টকার্ড তৈরিতে সহায়তা করছে।

উল্লেখ্য, গত ২ মার্চ হালনাগাদ ভোটার তালিকায় যুক্ত হন ৬৭ লাখ ৫৮ হাজার নতুন ভোটার। মূলত তাদের কথা মাথায় রেখেই সেবাটি চালু করে নির্বাচন কমিশন। এতে সরকারের সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় ৭ কোটি টাকা।

করোনায় সব অফিস বন্ধ হওয়ার মধ্যে অনলাইনে সেবা চালুর মাধ্যমে মানুষকে নাগরিক সেবা পেতে সহায়তা করায় ইসির প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। কারণ দালালের খপ্পর থেকে তারা রক্ষা পাচ্ছেন। অর্থের অপচয় থেকে বাঁচছেন বলে একজন নাগরিক মন্তব্য করেছেন।

এদিকে, গত ২৬ এপ্রিল অনলাইনে এনআইডি সেবার উদ্বোধন করা হয়। এ ক্ষেত্রে ১০৫ নম্বরে এসএমএস পাঠানোর মাধ্যমে নিজ এনআইডি নম্বর জানা যাচ্ছে। আবার ইন্টারনেট লিংকে (https://services.nidw.gov.bd) লগইনের মাধ্যমে নিজ এনআইডি নম্বর জানা ও অনলাইন কপি পাচ্ছেন। এই এনআইডি দেখতে হুবহু লেমিনেটিং করা এনআইডির মতো। এটি ডাউনলোডের পর প্রিন্ট করে কেবল লেমিনেটিং করে নিলেই হবে।

পিডিএসও/হেলাল