টু-লেট ঝুলছে, নেই ভাড়াটিয়া

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২০, ০৮:৪৫

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীতে এখন ভাড়াটিয়ার খোঁজে বাড়ির সামনে শুধু ‘টু লেট’ লেখা সাইন বোর্ড। ‘বাড়ি ভাড়া হবে’ এমন ছোট ছোট পোস্টার লাগিয়েছেন পাড়া-মহল্লা, অলিগলি, বড় রাস্তার পাশে। তবু কারো আগ্রহ দেখছেন না অনেক বাড়িমালিক। আগে ‘টু লেট’ টাঙ্গালেই ভাড়া নিতে আসা লোকের অভাব হতো না। কিন্তু করোনাভাইরাস অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধাক্কা দিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাতে রাজধানীর বেশিরভাগ বাড়িতেই এখন ভাড়াটিয়া সংকট দেখা দিয়েছে। সেজন্য সিংহভাগ বাড়িতে ঝুলছে বাড়িভাড়া দেওয়ার বিজ্ঞাপন ‘টু লেট’।

ঢাকাভিত্তিক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এক জরিপ বলছে, করোনার কারণে দেশের অন্তত দেড় কোটি মানুষ স্থায়ী কাজ হারিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার পাশাপাশি নিম্নবিত্ত চাকরিজীবী এবং শ্রমিক শ্রেণিসহ নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন, অনেক মানুষের শ্রেণি কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। নতুন করে অনেক মানুষ হতদরিদ্র হয়েছেন, ফলে আগের ভাড়ার ভার বইতে পারছেন না তারা। সেজন্য ছেড়ে দিচ্ছেন বাড়ি, ছেড়ে দিচ্ছেন ঢাকাও। আর ভাড়াটিয়ারা বাড়ি ছেড়ে দেওয়ায় এবং নতুন ভাড়াটিয়া না পেয়ে বিপদে পড়েছেন বাড়ির মালিকরা। শুধু ঢাকা নয়, এর পার্শ্ববর্তী এলাকা সাভারের অবস্থা আরো খারাপ। বিশেষ করে যেসব বাড়িতে পোশাক শ্রমিকরা ভাড়া থাকতেন, তার অনেকগুলোই এখন ফাঁকা। সাভারের রেডিও কলোনির অধিবাসী সরকারি চাকরিজীবী রিয়াজ রহমান বলেন, ‘আমাদের বাড়ির দুটি ফ্ল্যাট এ মাসে ফাঁকা। কোনো ভাড়াটিয়া পাইনি। ভাড়া কমিয়ে দিয়েছি, তাও পাইনি।’

সাভারের জোড়পুল এলাকার একটি ডেনিম প্রসেসিং প্ল্যান্টের কাছে ২৫টি ঘর ভাড়া দিতেন খলিল শেখ। সেখানে ঘর ভাড়া নেওয়া বেশিরভাগই পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। আবার কেউ কেউ চা, কেউবা সবজি বিক্রি করতেন। করোনার কারণে এখন অর্ধেক ঘরই ফাঁকা। বিশেষ করে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তিনি। যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া, গোবিন্দপুর, শেখদী, দনিয়া, পলাশপুর, রায়েরবাগ, মাতুয়াইল এবং ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার, হাজীনগর, বামৈল, কোনাপাড়া এলাকায় অনেক ফ্ল্যাট খালি রয়েছে। উত্তর রায়েরবাগ এলাকার বেশিরভাগ দেয়ালে দেয়ালে বাড়ি ভাড়া হবে—এমন অসংখ্য লিফলেট সাঁটানো দেখা গেছে। এ এলাকার চারতলা বাড়ির মালিক হাসিবুর রহমান। তার বাড়ির সামনে বাড়িভাড়ার নোটিস লাগানো।

তিনি বলেন, ‘আমার তিনটি ফ্ল্যাট খালি। গত কয়েক মাস ধরে দু-তিনটি ফ্ল্যাট খালি। অযথা গ্যাস বিল টানছি। এই মাস থেকে তা আরো বেড়ে গেল।’ ডেমরার হাজীনগরের পাঁচতলা বাড়ির মালিক শামীমা বেগম। স্বামী চার বছর আগে মারা গেছেন। তিনি এখন সবকিছু দেখাশোনা করেন। বলেন, আমার দুই থেকে তিনটি ফ্ল্যাট খালি। আগে পুরো বাড়ি থেকে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া পেতাম। গত দুই মাস ধরে পাচ্ছি ৪০ হাজার টাকা। তিনি আরো বলেন, বাড়িভাড়ার টাকা দিয়ে সন্তানকে লেখাপড়া করাই, সংসার খরচ চলে। দুজন ভাড়াটিয়া করোনাভাইরাসের কারণে খুব বেকায়দায় পড়ে বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে গত এপ্রিলে। এরপর আর বাড়ি ভাড়া হয়নি।

কী কারণে রাজধানীর এই অবস্থাজানতে চাইলে বনশ্রীর বাড়ির মালিক জামাল আহমেদ বলেন, সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের কারণে ভাড়াটিয়ারা অনেকেই তাদের পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন আগেই। পরিবারের উপার্জনের ব্যক্তিটি পরে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো মেস বা ছোট বাড়িভাড়া নিয়েছেন। যে কারণে অনেক বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেছে। এছাড়া এই পরিস্থিতিতে নতুন কেউ বাড়ি পরিবর্তন করেননি এবং জীবিকার তাগিদে ঢাকায় নতুন মানুষও তেমন একটা আসেননি। এছাড়া ঠিকমতো বেতন না পাওয়া, কাজ না থাকা, এমনকি চাকরি হারানোএসব কারণে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ। তিনি বলেন, অনেকের ইনকাম কমে গেছে, যে কারণে আগে ১৬ হাজার টাকার বাসায় থাকলেও এখন ১০ হাজার টাকার বাসায় চলে যেতে চাচ্ছেন। অনেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আছেন, যাদের ব্যবসা একেবারেই বন্ধ, তারা পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে গেছেন।

ভাড়াটিয়া সংকটে নিজের বিপদের কথা জানান মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাড়ির মালিক নাসির উদ্দিন। বলেন, প্রায় বাড়িতেই ‘টু লেট’ ঝুলছে। কিন্তু ভাড়াটিয়া খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাড়ির মালিকদের আয়ের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। আমিসহ অনেকেই বাসা ভাড়া কমিয়ে দিয়েছি। তবু ভাড়াটিয়া পাচ্ছি না। ভাড়াটিয়া না থাকলেও নিয়মিত ওইসব ফ্ল্যাটের মাসিক গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে এক ধরনের সংকটে পড়ে গেছি।

এসব বিষয়ে ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অনেকেরই আয় কমেছে। এই অবস্থায় বাসাভাড়া পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও বাড়ি মালিকরা কোনো ভাড়াটিয়ার পাশে দাঁড়াননি। ভাড়া মওকুফ করেননি অল্প পরিমাণও। তাই বাধ্য হয়ে অনেক ভাড়াটিয়া ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। তিনি বলেন, আমরা প্রথম থেকেই দাবি জানিয়ে আসছি, নিম্ন-মধ্য আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা হলেও বাড়িভাড়া মওকুফ করা হোক। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনেনি। ভাড়া কিছুটা মওকুফ করলেও অনেকে ঢাকায় থাকতে পারতেন।

এদিকে, পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, রাজধানীর বাসিন্দাদের ৮০ শতাংশই ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। যাদের মধ্যে অনেকেই এখন হারিয়েছেন চাকরি বা উপার্জনের পথ। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক হিসাবে দেখা যায়, গত ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অর্থাৎ এ সময়ে নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ। সংগঠনটির অন্য এক হিসাব বলছে, ঢাকার ২৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া ৫০ শতাংশ, ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ টাকা ব্যয় করেন বাড়ি ভাড়ায়। কিন্তু করোনার কারণে আয়ে যে ধাক্কা লেগেছে, সেটা সামলাতে না পেরে নগরে আসা লোকজনকে ফিরে যেতে হচ্ছে নিজ নিজ গ্রামে, নিজ নিজ শিকড়ে।

পিডিএসও/হেলাল