রাইড শেয়ারিংয়েও সংক্রমণ-ঝুঁকি!

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২০, ০৮:৩৮

জুবায়ের চৌধুরী

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে দেশে সব ধরনের পরিবহনব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ফের গণপরিবহন চলাচল শুরু হয় গত ১ জুন থেকে। গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। তারা বলছেন, বাসে ওঠানামার সময় কন্ডাক্টর-হেলপাররা যাত্রীদের হাতে-পিঠে হাত দিচ্ছেন। অধিকাংশ হেলপারই বাসের গেটে দাঁড়িয়ে থাকেন। ফলে, যাত্রী ওঠানামার সময় স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে করোনা-সংক্রমণের ঝুঁঁকিও বাড়ছে। এ অবস্থায় গণপরিবহন এড়িয়ে চলছেন বেশির ভাগ রাজধানীবাসী। বিকল্প পরিবহন হিসেবে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা অফলাইনের রাইড শেয়ারিংয়ের ওপর নির্ভর করছেন অনেকে। গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে উদ্দেশে গণপরিবহন এড়িয়ে অনেকে রাইড (মোটরসাইকেল) শেয়ার করছেন, তা সফল হচ্ছে না। বরং রাইড শেয়ারিংয়েও করোনা ঝুঁঁকি রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অফিশিয়ালি দেশে সব ধরনের রাইড শেয়ারিং বন্ধ রয়েছে। কিন্তু জীবিকার তাগিদে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চালকরা। সেখান থেকে ডেকে যাত্রী তুলে বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছেন। ভাড়া নির্ধারণও হচ্ছে আলোচনায়। যাত্রী রাজি হলে গাড়িতে উঠে অন্যদের ব্যবহৃত হেলমেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় দেখা গেছে চালক ও যাত্রী হেলমেট ব্যবহার করছেন না। এ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় পড়ছে মারাত্মক শারীরিক আহত হওয়া মৃত্যুর আশঙ্কাও রয়েছে। এ ছাড়া রাইড শেয়ারিংয়ে মানা হচ্ছে না কোনো শারীরিক দূরত্বও।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার সার্ক ফোয়ারা মোড়ে কথা হয় বি এম শাওনের সঙ্গে। তিনি গুলশান যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেল খুঁজছেন। তিনি জানালেন, ‘গণপরিবহনের পরিবেশ ভালো না। কম যাত্রী নেওয়ায় অনেক সময় দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ি পাওয়া যায় না। আবার একই সিটে দিনে অনেকেই বসে। এগুলো পরিষ্কার করে না। এ কারণে মোটরসাইকেলেই যাচ্ছি।’ একই হেলমেট অনেকে ব্যবহার করছেন, তারপর আপনিও করবেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সেখান থেকেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। এজন্য স্যানিটাইজার স্প্রে করে দেব। তাতে একটু হলেও সুরক্ষা পাব। আর মাস্ক তো আছেই।’

বাংলামোটর মোড়ে কথা হয় রাইডচালক আলী জাবেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সব দোষ আমাদের? দুই মাস সবকিছু বন্ধ ছিল। আমাদের খোঁজ কেউ নিয়েছে? মার্কেট তো খোলা। সেখানে মানুষের ভিড়ের কারণে চলা যায় না। মানুষ ঠেলাঠেলি করে হাঁটছে। আমরা চালকরা নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি। কেউ গাড়িতে উঠলে তাকে স্যানিটাইজার দিই। চেষ্টা করি যেন ঝুঁকি তৈরি না হয়।’ আরেক চালক মির্জা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘যা হওয়ার হবে। কিন্তু আমাদের খেয়ে বাঁচতে হবে। ঘরে খাবার নেই।’

সামাজিক দূরত্ব না মানলে করোনা-সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. সুলতানা শাহানা বানু। তিনি বলেন, ‘সামাজিক দূরত্ব না মানায় করোনা-ঝুঁকি বেড়েছে। এ বিষয়টিকে অবহেলা করা যাবে না।’ একই প্রশ্নের জবাবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘একটি বস্তুতে যদি করোনা থাকে এবং কেউ স্পর্শ করে, তাহলে ভাইরাস ছড়াবে। রাইড শেয়ারিংয়ে প্রথমত শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত হয় না, দ্বিতীয়ত, একই হেলমেট একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করেন। এতে সংক্রমণ-ঝুঁকি বাড়ে।’

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’য়ের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা সৈয়দা নাবিলা মাহবুব বলেন, ‘অ্যাপসভিত্তিক মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকলেও অফলাইনে চলছে। এর ফলে যাত্রী ও চালক নিরাপত্তা-ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।’ ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘করোনার কারণে মানুষের অসহায়ত্ব দেখে ও মানবিক বিবেচনায় আমরা কিছুদিন ছাড় দিয়েছি।’ তবে, যারা আইন অমান্য করে যানবাহন চালাচ্ছেন, শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

এদিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ফের গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়েছে গত ১ জুন থেকে। তবে, এসব বাসে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। তারা বলছেন, বাসে ওঠানামার সময় কন্ডাক্টর-হেলপাররা যাত্রীদের হাতে-পিঠে হাত দিয়ে ধরছেন। অধিকাংশ হেলপারই বাসের গেটে দাঁড়িয়ে থাকেন। ফলে, যাত্রী ওঠানামার সময় স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।

গায়ে হাত রাখা ও জড়িয়ে ধরা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিলগামী ‘সিটি পরিবহন’-এর যাত্রী মোহাম্মদ আল আমিন। তিনি জানান, ‘যাত্রী ওঠানোর সময় বাসের হেলপার গেটে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় তারা যাত্রীদের গায়ে-পিঠে হাত রাখেন। জড়িয়ে ধরেন, যা যাত্রীদের জন্য খুবই অস্বস্তির ও ঝুঁকিপূর্ণ। এভাবে চললে গণপরিবহন থেকেই করোনার ব্যাপক বিস্তার ঘটবে।’ গায়ে হাত দিয়ে যাত্রী তোলার কারণ জানতে চাইলে অনাবিল পরিবহনের হেলপার মনিরুল ইসলাম মিলার বলেন, ‘যাত্রীরা বাসে ওঠার সময় সবাই তাড়াহুড়ো করেন। সবাইকে লাইনে দাঁড়িয়ে ওঠার জন্য বললেও সেই কথা কেউ শুনছেন না। যাত্রীরাই যদি নিয়ম না মানেন, তাহলে আমরা যতই চেষ্টা করি স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানা সম্ভব হবে না।

পিডিএসও/হেলাল