চালকের অবহেলায় অনিরাপদ নৌপথ

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২০, ০৮:০৮ | আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২০, ১৫:১০

গাজী শাহনেওয়াজ

আবহমানকাল থেকেই নৌপথ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের একটি নিরাপদ, সহজলভ্য এবং সুবিধাজনক মাধ্যম। নৌপথকে কেন্দ্র্র করেই বিশ্বে গড়ে উঠেছে শহর, বন্দর, ব্যবসাকেন্দ্র। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন বাংলাদেশে সবসময়ই একটি প্রাকৃতিক ও তুলনামূলকভাবে স্বল্প ব্যয়ের পরিবহন মাধ্যম। কোনো কোনো এলাকায় এটি পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রী এবং চালকদের অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে একের পর এক ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা। ফলে সড়কের মতো এ পথটিও দিনে দিনে অনিরাপদ হয়ে উঠছে। কে অপরাধী দুর্ঘটনা ঘটা মাত্রই—এ প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। আলোচনা থামলে কে দোষী আর কোনো খবর থাকে না। ফলে অদৃশ্য চাপে পার পেয়ে যান তারা। আর শাস্তির অভাবে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন। আর যাদের অদক্ষতা ও অপেশাদারিত্বে কত নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারায়; তার পুরো ভোগান্তি বয়ে বেড়ায় নিহতের পরিবারগুলো। আরেকটি দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত তাদের খবর ধামাচাপা পড়ে থাকে।

এভাবে গত ৩০ বছর ধরে চলছে নৌপথে দুর্ঘটনা। এখন পর্যন্ত দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৭০টি। সর্বশেষ গত সপ্তাহে ময়ূর-২ এর ধাক্কায় মর্নিং বার্ড নামে লঞ্চডুবিতে এ পর্যন্ত ৩৩ জন প্রাণহানি ঘটে। সবমিলিয়ে প্রাণহানি ঘটেছে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি মানুষের। সদ্য দুর্ঘটনাটিতে দায়ী ব্যক্তিদের তালিকায় অতীতের মতো অভিযোগের তীর চালকের অদক্ষতা ও গাফিলতি। তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে, সে পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে। সূত্র মতে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) আলাদাভাবে দুটি কমিটি গঠন করে। তদন্ত রিপোর্ট আগামীকাল সোমবার দিতে পারে কমিটি। দুই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ঘটনার সময়ে দুটি লঞ্চেরই ফিটনেস সনদ ছিল।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ জনের বক্তব্য নিয়েছেন। এর মধ্যে মর্নিং বার্ড লঞ্চের বেঁচে যাওয়া ১১ যাত্রীও রয়েছেন। তারা ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। সূত্রগুলো বলছে, দুর্ঘটনাকবলিত দুটি লঞ্চের ফিটনেস সনদ রয়েছে। তবে অতীতের মতো তদন্তের পর অপরাধী পার পাবে না বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক। তিনি বলেন, এবার আগের মতো হবে না। দুর্ঘটনার প্রতিবেদন অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সংস্থার ভাষ্য মতে, লঞ্চ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে একাধিক কারণের মধ্যে অন্যতম, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন। তাছাড়া কম উচ্চতার লঞ্চ নদীতে নামানো। খালে চলাচলের লঞ্চও নদীতে যাতায়াত করে। এসব লঞ্চ অনেক সময় রুট পারমিট পেয়ে থাকে। এই রুট পারমিট প্রদানে জড়িতদের শাস্তি আওতায় আনা হয় কম। ফলে নৌ-দুর্ঘটনার শঙ্কা বাড়ে।

নৌপরিবহন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবেই ৫৭০টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মৃত্যুবরণ করেন প্রায় ৩৬৫৪ জন। কেবল গত বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসেবেই মৃতের সংখ্যা ৩৬২৭। একই সময়ে ২৩৬টি দুর্ঘটনায় ৩৪০টি মামলা হয়েছে। নিহতের চেয়ে আহতের সংখ্যা কম ৪৮১; নিখোঁজ ৪৫৭ জন। একই সময়ে মামলায় সাজা হয়েছে ২০০ জনের এবং বিচারাধীন রয়েছে ৯০টি মামলা আর অব্যাহতি পেয়েছে ৫০ জন।

১৯৯১ সাল থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৩৬টি যাত্রীবাহী লঞ্চ ও ১৪৬টি মালবাহী জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য নৌযান দুর্ঘটনাকবিলত হয় ১৮৮টি। এ পর্যন্ত ৫৭০টি দুর্ঘটনায় ৩৬৫৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫১৬ জন। নিখোঁজ রয়েছেন ৪৮৯ জন। এর মধ্যে ১৯৯১ থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত যথাক্রমে নিহত হয়েছেন ১৯ জন, পাঁচজন, ১৮৩ জন, ৩০৩ জন, ৪০ জন, ১৪৭ জনের প্রাণহানি ঘটে।

এভাবে বছর হিসাবে ধরলে ১৯৯৭ সালে ১০২ জন, ১৯৯৮ সালে ৯১ জন মারা যান। পরের বছর থেকে ৩৫৩, ৩৩, ২৯৭, ৪৬৪, ১২৭, ২৪৮, ৫১, ২, ১২০, ২৬০, ১১৮, ৭৪, ১৬৩, ২২, ১২৩, ১২০, ৩৫, ৪৫, ২ ও ৩ জন। এভাবে ৩৬৫৪ জন ছিল গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মৃতের হার। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৯ জুন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৩৩ জন।

এত প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ মামলায় তথ্য-প্রমাণের অভাব এবং প্রভাবশালীদের চাপের কারণে লঘু সাজায় পার পেয়ে যান দায়ী ব্যক্তিরা। সারা দেশে ১২ হাজার ৯৫৯টি অনুমোদনপ্রাপ্ত তথা সার্ভে সনদধারী নৌযান রয়েছে।

নৌ-দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে নৌপরিবহন অধিদফতর এবং বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চালকের অদক্ষতা অথবা গাফিলতিকে দায়ী করা হয়। প্রকৃত চালকের পরিবর্তে অন্য স্টাফের মাধ্যমে লঞ্চ চালনার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। ময়ূর-২ লঞ্চটির ক্ষেত্রেও মূল চালকের পরিবর্তে কোনো সহকারীর হাতে স্টিয়ারিং ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তে এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া নৌ-দুর্ঘটনার বড় একটি কারণ ফিটনেসবিহীন নৌযান। একে নৌ খাতে বলা হয় সার্ভে রিপোর্ট। ফিটনেস বা সার্ভে রিপোর্ট প্রদানের কাজটি করে নৌপরিবহন অধিদফতর। নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় আকার বড় করা, নির্মাণকালে অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ না রাখার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। প্রভাবিত হয়ে সার্ভেয়ারদের সার্ভে সনদ দেওয়া এবং নকশা জালিয়াতির ঘটনা নৌ খাতে পুরোনো অভিযোগ। দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ দুটির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দুটিরই সার্ভে সনদ বা ফিটনেস রয়েছে। কোন লঞ্চের কী ত্রুটি আছে তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়া পর্যন্ত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত কম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৪৩টি রুটে ঢাকা থেকে এক শতাধিক লঞ্চ চলাচল করে। এছাড়া এক জেলা থেকে অন্য জেলায় চলাচলকারী লঞ্চও রয়েছে। এর মধ্যে মতলব, ভেদরগঞ্জ, ডামুঢ্যা, মুলাদী, গৌরনদী, পাতারহাট, রাঙ্গাবালি, গোসাইর হাট, কালাইয়া, পটুয়াখালী, মোরেলগঞ্জসহ ২৭টি নৌরুটে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল করছে।

জানা গেছে, সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী সারা দেশে ৮৩৯টি যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করে। এছাড়া যাত্রীবাহী বোট ৪১৭টি, মালবাহী ৩২০১টি, তেলবাহী ৩৩৩টি, বালিবাহী ৪৯১০টি, ড্রেজার ১৩৬৯টি, পণ্যবাহী ৮৮৭টি, বার্জ ৪৫৩টি, টাগ ১৪৭টি, স্পিড বোট ৩০৩টি, ফেরি ৪০টি, ওয়ার্ক বোট ৫৫টি, পরিদর্শন বোট ২৬টি ও অন্যান্য ক্যটাগরিতে ৭৯টি নৌযান রয়েছে। সবমিলে সারা দেশে ১২ হাজার ৯৫৯টি ফিটনেসপ্রাপ্ত নৌযান রয়েছে। এর বাইরে কয়েকগুণ রয়েছে ফিটনেসবিহীন নৌযান। সেই সংখ্যাটা ৪০ হাজার হতে পারে বলে ধরাণা করা হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল