দোকান কর্মচারীরা বেঁচেও ‘আধমরা’

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ১৫:১০ | আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ১৫:৩৪

কাইয়ুম আহমেদ
কোনো আয় না থাকায় হাহাকার চলছে দোকানে কাজ করাদের পরিবারে। প্রতীকী ছবি

মফিদুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। বাবা মারা গেছেন অনেক বছর আগে, মাও অসুস্থ। নেই নিজেদের বাড়িঘর। সবুজবাগ এলাকায় ভাড়াবাড়িতে থাকেন মাকে নিয়ে। আয় বলতে ছিল সুভাস্তু নজর ভ্যালি শপিংমলের দোকানের কাজ। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে সে পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন না আছে আয়, না করা যাচ্ছে অন্য কিছু। এই অবস্থায় চোখে সরষে ফুল দেখছেন তিনি। মাকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কোনো রকম দিন কাটছে।

মফিদুল বলছেন, ‘এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াও অনেক ভালো। বলতে গেলে বেঁচেও এখন আমরা আধমরা।’ শুধু এই মফিদুলই নয়, বর্তমানে তার মতো কর্মহীন হয়ে প্রায় অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এদিকে, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি জানিয়েছে, সাধারণ ছুটিতে কেনাবেচা বন্ধ থাকায় তাদের দোকানগুলোর দিনে ক্ষতি হচ্ছে ১ হাজার ৭৪ কোটি টাকা। তারা এ হিসাব করেছে একেকটি দোকানে গড়ে ২০ হাজার টাকা বিক্রি ধরে। আর লভ্যাংশ ধরা হয়েছে ১০ শতাংশ। এই হিসাব দিয়ে সমিতি কর্মচারীদের বেতন দিতে আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছে। তারা বলছে, রফতানি খাতে মজুরি ও বেতন দিতে যে তহবিল গঠন করা হয়েছে তারাও আংশিক সহায়তা হিসেবে একই ধরনের তহবিল চায়।  

দোকান মালিক সমিতি বলছে, ক্ষুদ্র ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন নগদ টাকায় লেনদেন করেন। দোকান বন্ধ থাকায় তারা নগদ টাকা পাচ্ছেন না। তাই বেতনও দিতে পারছেন না। এ অবস্থায় জরুরি তহবিল ছাড়া এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় নেই। 

দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, সরকার কখনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এ ধরনের সহায়তা দেয়নি। তারাও আবেদন জানাননি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্রণোদিত হয়ে ২০১৩ সালে মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সময় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বায়তুল মোকাররমের ৩৩৩ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দিয়েছিলেন।


# দিনে দোকানে ক্ষতি ১,০৭৪ কোটি টাকা 
# আড়াই হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের দাবি মালিক সমিতির 
# মানবিক বিবেচনায় প্রণোদনা দাবি ফেডারেশনের


হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, এবারের করোনা দুর্যোগে শুধু বেতন দিতে ব্যবসায়ীরা ঋণ সহায়তা চাচ্ছেন। এটা শুধু তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে, যাদের কর্মচারী ১৫ জনের কম। 
দোকান মালিক সমিতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য তুলে ধরে তাদের দেওয়া হিসাবে বলেছে, ১৫ জনের কম কর্মচারী থাকা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৩ লাখ ৭২ হাজার ৭১৬, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৩৯ ভাগ। এসব প্রতিষ্ঠানে ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৯২৯ জন কর্মী কাজ করেন। তাদের মাসিক বেতন ১৪ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা।

দোকান মালিক সমিতি বলছে, একজন কর্মচারীর গড় বেতন ১৫ হাজার টাকা ধরে তারা আংশিক বেতন ৭ হাজার টাকা হিসাবে আড়াই হাজার কোটি টাকার তহবিল চায়। এ তহবিল থেকে তারা বিনা সুদে ঋণ চেয়েছে। এক বছরের জন্য তারা এই ঋণ দেওয়ার  প্রস্তাব দিয়েছে, যা ছয় মাস পর থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পরিশোধ শুরু করবেন।

সমিতির পক্ষ থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ছয় মাস সময় দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পাশাপাশি চক্র বৃদ্ধি সুদ আদায় বন্ধ রেখে সরল সুদের দাবি করেছে।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার আগে ২৫ মার্চ থেকে দোকানপাট বন্ধের ঘোষণা দেয় দোকান মালিক সমিতি। পরে তা বাড়িয়ে সরকারের ঘোষিত সাধারণ ছুটির সঙ্গে মেলানো হয়। এদিকে সরকারও সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। এই সময়ে কোনো আয় না থাকায় হাহাকার চলছে দোকানে কাজ করাদের পরিবারে।  

এদিকে, দোকান কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অবিলম্বে পরিশোধের দাবি জানিয়েছে জাতীয় দোকান কর্মচারী ফেডারেশন নামক একটি সংগঠন। 

সংগঠেনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বাবলু, সাধারণ সম্পাদক আমিরুল হক আমিন এবং ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি আলী মোল্লা বলেছেন, সরকার ঘোষিত ছুটিতে সব দোকান, মার্কেট বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু দেশের ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীর বেতনের কথা কেউ বলছে না। অনেক জায়গাতেই দোকান কর্মচারীর মার্চ মাসের বেতন এখনো অনেকে পায়নি। যে কারণে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও তাদের বেতন পরিশোধ করে পরিবার নিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।  

পিডিএসও/হেলাল