ইভিএম নিয়ে ইসি দৃঢ় অবস্থানে নেই

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৮:৩৩ | আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:০৫

গাজী শাহনেওয়াজ

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানে নেই নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ব্যাপক ঢাকঢোল পিটিয়ে অনেকের দাবি উপেক্ষা করে সম্প্রতি ইভিএমে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠানের কিছুদিন পরেই, ইভিএম থেকে সরে এসেছে ইসি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির এই পিছু হঠা নিয়ে নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।

ইভিএমে ভোটদান সহজ এবং নিজের ভোট অন্য কেউ দিতে পারবে না এসব প্রচারণা ছিল ইসির। এই যুক্তিতে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা উপেক্ষা করেছিল কমিশন। তবে অল্পদিনের ব্যবধানে কেন ইভিএমে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হঠার পেছনে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টানতে ব্যর্থতা বলে মনে করছেন অনেকে। এ নিয়ে সরকার ও ইসির মধ্যে কিছু উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে ইভিএমে সদ্য সমাপ্ত ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের পর ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে ম্যানুয়াল সিস্টেমের দিকেই ঝুঁকছে ইসি। কারণ ইভিএমে ভোট পড়া দৃশ্য স্ক্রিনে শো-করার কারণে প্রতিপক্ষের অর্থাৎ পরাজিত প্রার্থীর পক্ষে সারা দিনে একটি বুথে কয়টি ভোট পড়েছে তা-ও আগাম জানার সুযোগ রয়েছে। ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে ইভিএমের পাসওয়ার্ড উন্মুক্ত করতে গিয়ে লেজেগোবর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে ইসিকে। এতে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ভোটারদের কাছে সমালোচিত হচ্ছে ইসি।

কমিশন চাইলে পাসওয়ার্ড উন্মুক্ত করে প্রিসাইডিং অথবা সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের সহায়তায় ভোট দিতে পারেন। সেটাও দৃশ্যমান হয় ইভিএমের স্ক্রিনে।

ঢাকার দুই সিটির সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট নেওয়াতে প্রবল বিরোধিতা ছিল বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর। খোদ সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইভিএমে ভোটদান থেকে বিরত থাকতে তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিশন নিজের সিদ্ধান্তেই অনঢ় থাকে।

এদিকে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন আগামী ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এ সিটিতেও ইভিএমে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত বহাল আছে। ইভিএমে ভোটগ্রহণকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে তারা শোডাউনসহ কোনোরূপ আতঙ্ক ছড়াতে পারে, এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকবে বলে জানা গেছে।

কিন্তু সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালটে ভোটগ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ইসির জন্য সহজ হয়েছে। অথচ কমিশনের সিদ্ধান্ত ছিল, ছোট ছোট নির্বাচনে ইভিএমে ভোট নিয়ে ব্যাপক পরিসরে অর্থাৎ ৩০০ সংসদীয় আসনে একযোগে যান্ত্রিকে ভোট নেওয়া। এজন্য কয়েক কোটি টাকার ইভিএম যন্ত্রও কিনে ইসি।

কিন্তু আগামী ২৯ মার্চ বগুড়া-১ এবং যশোর-৬ উপনির্বাচনে ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালটে ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তফসিল ঘোষণা করেছে ইসি। আর চসিক নির্বাচনে ইভিএমে ভোট নিলেও ভোটের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। কমিশন সচিব বলছেন, ভোটারদের ঘুম থেকে উঠতে বিলম্বের কারণে সময়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে হঠাৎ ব্যালটে ফেরার ব্যাপারে ইসির সিনিয়র এই সচিব বলেন, ভোটার উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ব্যালটে ভোটদান সহজ হলেও সবাই এই প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত নয়। তাই পুরোনো ধারায় ব্যালটে ফিরেছে কমিশন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইভিএমে ভোট হওয়ার কারণে কারচুপি কমেছে। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে। ফলে ঢালাও কারচুপি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বিএনপিসহ শরিকরা অংশ না নেওয়ার দিন থেকেই ভোটারদের মধ্যে অনাস্থা দেখা দিয়েছে বলে মত রয়েছে জনমনে। আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা তাদের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিতে না পারায় এক ধরনের অনুশোচনায় ভুগেছেন। তবে ওইসব নির্বাচন ব্যালটে হওয়ায় সিল মেরে ও ভোটারের শতাংশ বাড়িয়ে ভোটের শতাংশ মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল ইসি। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রামের জাসদের মাঈন উদ্দিন খান বাদলের মৃত্যুতে শূন্য আসনে ইভিএমের নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাব কম ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা দুই সিটিতে ভোটগ্রহণের পর রাত ৩টায় অনেক ওয়ার্ডের ফলাফল প্রকাশ করতে হয়েছে ইসিকে। এটাকে ভোটারদের বিশ্বাস ফেরানোর পথে বাধা হিসেবে দেখছেন অনেকে। এ নিয়ে সরকার ও ইসির মধ্যে একটা উদ্বেগ তৈরি হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তিতে সেটা এক ধরনের প্রভাব ফেলছে। তাই ভোটের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে ব্যালটে ভোটগ্রহণে কমিশন বাধ্য হয়েছে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞসহ ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ভোটারের উপস্থিতি নিয়ে ইসির প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে নানামুখী চিন্তাভাবনা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঢাকা উত্তর সিটির বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইভিএমের চিপ ও সিমকার্ড চেয়ে ইসিতে আবেদন করেছেন। কমিশন ওই প্রার্থীর তথ্য এখন দেবে কিনা তা পর্যালোচনার পর্যায়ে রেখেছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

চসিক নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন জানাতে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকে চিঠি দিয়েছে ইসি। দলগুলোর কার্যালয়ে এ চিঠি পাঠানো হয়। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগে দলীয় প্রার্থী কে তা যেন ইসিকে জানানো হয়। সে জন্য ওই চিঠি পাঠায় ইসি।

পিডিএসও/হেলাল