বিব্রত গোয়েন্দা সংস্থা

রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার হচ্ছে

প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:১৯ | আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:১০

অনলাইন ডেস্ক

রাষ্ট্রের স্বার্থসুরক্ষিত ও সমুন্নত রাখতে কাজ করে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। কিন্তু তাদের দেওয়া তথ্য গোপন থাকছে না। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে সংস্থাগুলো। আর তথ্য পাচার হওয়ায় তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার হওয়ার ঘটনায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সংস্থার মধ্যে বিরাজ করছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।

সংস্থাগুলোর ভাষ্য হচ্ছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী, নাশকতায় জড়িত ব্যক্তি-গোষ্ঠী এবং ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড নজরদারির পর প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এর আগে তারা ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান চালায়। তাদের দফতর থেকে প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট সংস্থায় স্থানান্তরের পরক্ষণেই দেখা যায় সেটি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। অসাধু কিছু ব্যক্তির সহায়তায় ওই তথ্যগুলো যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তার কাছে পৌঁছে যায়। তখন প্রতিবেদনের সূত্র ধরে অপরাধী ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান অভিযোগগুলোর বিষয়ে একদিকে যেমন সতর্ক হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সংস্থাগুলোর প্রতি অনাস্থা এনে প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন ও কল্পনাপ্রসূত আখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সস্তা সহানুভূতি আদায় করে নিচ্ছে।

রাষ্ট্রের গোপন তথ্য পাচার হওয়া নিয়ে শীর্ষ দুটি গোয়েন্দা সংস্থা ২০১৭ সালে সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়ে চিঠি পাঠায়। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ সফিউল আলম ওই চিঠির বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ২০১৭ সালের ১৫ মে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, দফতর এবং মাঠ প্রশাসনের সব কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। চিঠিতে উল্লেখ করেন, ডিজিএফআই ও এনএসআইসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাকাজে নিয়োজিত থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে থাকে। তাদের সরবরাহ করা তথ্য সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এসব গোপনীয় তথ্য বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো হয়, যাতে তথ্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রকাশিত না হয়। দুটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পাঠানো আধাসরকারিপত্রে জানা যায়, গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের গোপনীয়তা অনেক সময় রক্ষিত হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ছায়ালিপি কার্যার্থে সরবরাহ করা হয়, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। এ ধরনের কাজের ফলে বিভিন্ন অফিসের সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্পর্কের অবনতি এবং মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। আগামীতে এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে সব মন্ত্রণালয়ের সচিবকে পত্র দেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পাঠানো চিঠিটি ওই নির্দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

সম্প্রতি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে আবার অভিযোগ এসেছে তাদের গোপন পত্রগুলো গোপন থাকছে না। তাদের পাঠানো এ স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নতুন করে নড়েচড়ে বসেছে। কারণ, গত ৮ আগস্টের আরেকটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এই তোড়জোড় বলে জানা গেছে। এই চিঠিতেও বলা হয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থা গোপনীয় প্রতিবেদনগুলো গোপন থাকছে না। সেখানে জাতীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি স্পর্শকাতর প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় ক্ষোভ জানানো হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনের ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলা হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি রিপন রায় লিপু। আগের ট্রাস্টির মারা যাওয়ার পর থেকে লিপু দায়িত্ব পালন করছেন। পরে ধর্ম মন্ত্রণালয় তাকে পুনর্নিয়োগ দেয়। তিনি বর্তমানে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও নরসিংদী জেলার ট্রাস্টি প্রধান। চলতি বছরে তার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু পুনর্নিয়োগ পেতে তৎপরতা শুরু করেন। কিন্তু জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাটি রিপন রায়ের বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করে জানতে পারেন এই পরিবারটি আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তার ছোট ভাই সুমন রায় বিএনপি নেতা ও লন্ডনে থাকা তারেক জিয়ার ঘনিষ্ঠ সহচর। লন্ডনে সুমন রায় তারেকের এপিএস হিসেবে পরিচিত। লন্ডনে তারেক জিয়ার একটি সভায় যুক্তরাজ্য বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে সুমন রায় অংশগ্রহণ করে। ওই গোয়েন্দা সংস্থার এই স্পর্শকাতর প্রতিবেদনটি ধর্ম মন্ত্রণালয়কে পাঠানোর পরপরই তা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে পরিচিত অসাধু সরকারি কর্মকর্তার হাত হয়ে রিপন রায়ের কাছে পৌঁছে যায়। এতে ব্রিবতকর অবস্থায় পড়তে হয় ওই গোয়েন্দা সংস্থাকে।

তথ্যটি মন্ত্রণালয় থেকে পাচার হওয়ার পর রিপন রায়, গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ওই প্রতিবেদনটি কিশোরগঞ্জ জেলা কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়েছে কি না সেখানে দায়িত্বরত উপপরিচালককে জিজ্ঞাসা করা হয়। সংস্থার মতে, একটি গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করায় সংস্থার ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তাহীন পরিবেশ সৃষ্টিসহ কর্মপরিবেশ বিনষ্টের শামিল।

এই চিঠির পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংরক্ষণের বিষয়ে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় থেকে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। যাতে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সমুন্নত রেখে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়, সে বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল