ঢাকায় দুর্ভোগের আরেক নাম যত্রতত্র পার্কিং

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৫২ | আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:১১

নিজস্ব প্রতিবেদক

যানজটের ঢাকায় দুর্ভোগের আরেক নাম যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং। সড়কেই ইচ্ছামতো বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এমনকি ট্রাকও পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। এতে নগরীতে যানজট যেমন হয়, তেমনি চলাচলে সৃষ্টি হয় প্রতিবন্ধকতা। নগরীর সৌন্দর্যও নষ্ট হয়। অথচ কোনো পরিবহন কোম্পানির অনুমোদনের অন্যতম শর্ত হলো নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বিআরটিএ বলছে, কাগজপত্রে ঢাকাসহ দেশের সব বাস কোম্পানির নিজস্ব পার্কিং জোনের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান নিজস্ব পার্কিং প্লেস ব্যবহার না করায় জনদুর্ভোগ হয়। আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও তা বৈধ নয়। আবার যাত্রী নিয়ে চলার সময় চালকরা যেমন বিশৃঙ্খল ও বেপরোয়া, তেমনি কাজ শেষেও রাস্তার ওপর গাড়ি রেখে যাওয়ায় মানুষের ভোগান্তি পোহাতে হয়। আবার কয়েকটি পরিবহন কোম্পানি ইচ্ছা করেই রাত দিন জনভোগান্তি তৈরি করে রাখে। এই পরিস্থিতিতে রাজধানী থেকে সব বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

তিনি বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে ঢাকা মহানগরী থেকে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে স্থান নির্ধারণসহ অন্য কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। পরিবহনসহ অন্য সমস্যা সমাধানে দ্রুত স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদের পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে একটি অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ঢাকা উত্তর, দক্ষিণসহ পাশের সিটি করর্পোরেশন ও পৌরসভার মেয়ররা বসবেন। মন্ত্রণালয় ডিটিসিএ, ডিএমপি, হাইওয়ে পুলিশ বসে সমন্বিত পদক্ষেপ নেবেন।

তিনি বলেন, ঢাকায় ৬৪টি পার্কিং স্পটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ডিটিসিএ-এর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কারিগরি টিম গঠন করা হবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়াতে কম্প্রেহেন্সিভ ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। ভিজিবিলিটি স্ট্যাডির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতির কারণে রাজধানীর সড়ক থেকে অবৈধ রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং অবৈধ যানবাহন উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। এই কাজ রাতারাতি সম্ভব নয়। এজন্য আবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজ সিটি করপোরেশন ও ডিসিএর সহযোগিতায় পুলিশ পালন করবে। অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ততম সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে রাখার দৃশ্য নিয়মিত। এর বিপরীত সড়কেও আরেকটি বেসরকারি কোম্পানির বাস সব সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ক্যান্টনমেন্টগামী একটি পরিবহন কোম্পানি বনানী এলাকায় সারিবদ্ধভাবে বাস রাখে। যাত্রী হওয়া সাপেক্ষে সেসব বাস ছেড়ে যায়। কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশ থেকে পীরজঙ্গি মাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ বাসের সারি। এর মধ্যে ৬ নম্বর পরিবহনের বাসই বেশি। আরো কিছু স্টাফ বাস রয়েছে। যেগুলো সকালে মতিঝিলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাত্রী নামিয়ে এই সড়কে পার্কিং করে। এছাড়া রয়েল ও তিশাসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লাগামী বেশ কয়েকটি পরিবহন কোম্পানি রাস্তার ওপর বাস রাখে এই এলাকায়। রয়েছে বেশ কয়েকটি পরিবহন কাউন্টার। যারা রাস্তার ওপর বাস রেখে টিকিট বিক্রি শুরু করে। এর একটু সামনে গেলে কমলাপুর স্টেডিয়ামের পাশে স্টার লাইন পরিবহনের গাড়ি রাস্তায় রাখতে দেখা গেছে। সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশের সবকয়টি রাস্তায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাস পার্কিং করে রাখা হয় দিনভর।

সন্ধ্যার পর যারা মালিবাগ রেলগেট হয়ে বিশ্বরোড দিয়ে সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী যাতায়াত করেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন এই সড়কে বিভিন্ন বাস কোম্পানির অবৈধ পার্কিং করার দৃশ্য। সমস্যার শুরু মালিবাগ রেলগেট থেকে। রেলগেট সংলগ্ন সোহাগ পরিবহনের কাউন্টারের সামনে আন্তঃজেলা রুটের বাস দাঁড় করিয়ে নিয়মিত যাত্রী তোলা হয়। সরিয়ে দেয়া হয় অন্যান্য পরিবহন। এর একটু সামনে সোহাগের পার্কিং জোন। জায়গা না হওয়ায় এই পরিবহন কোম্পানির অন্তত ২০টি বাস দিয়ে অর্ধেক রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয় প্রায় সব সময়ই। এ ব্যাপারে টার্মিনালের তত্ত্বাবধায়ক পরিচয় দেয়া আমিনুল নামের এক ব্যক্তি জানান, বাস বেশি। জায়গা কম। তাই অল্প সময়ের জন্য মাঝে মাঝে দু’একটি বাস রাস্তায় থাকে।

মালিবাগ রেলগেট এলাকায় দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষমতাধর কোম্পানির পরিবহন। তাই জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলেও আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি না। কিছু বলতেও পারি না। বলতে গেলে উল্টো আমাদের ধমক খেতে হয়। তিনি বলেন, একটু সামনে গেলেই দেখবেন প্রতিটি ক্রসিংয়ে ট্রাফিক পুলিশ তৎপর। সড়কে পরিবহন নৈরাজ্য হলে রেকার লাগানো হচ্ছে। আদায় করা হচ্ছে জরিমানা।

খিলগাঁও কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীত সড়কে দেখা গেছে নূর এ মক্কা পরিবহনের অন্তত ৫০টি বাস দুই লেন জুড়ে রাখা হয়েছে। সৌদিয়াসহ আন্তঃজেলা রুটের আরো কিছু বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। টিটিপাড়া মোড় থেকে সায়েদাবাদ হয়ে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশ জুড়েই বাস পার্কিং করে রাখাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম, সিলেট, পূর্বাঞ্চল, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন গন্তব্যে এসব বাস ছেড়ে যায়।

কাকরাইল, নয়াপল্টন, ফকিরাপুল যেন বাস রাখার অঘোষিত টার্মিনাল। তবে সন্ধ্যার পর এ দৃশ্য একেবারেই জমে ওঠে। বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির বাস একের পর এক আসতে দেখা যায়। আরামবাগেও সিটি সার্ভিসগুলোর বাস রাখার অভিযোগ রয়েছে। গোটা গুলিস্তানের সড়ক তো অনেক আগে থেকেই টার্মিনাল। ফুলবাড়িয়ায় একটি বাস টার্মিনাল থাকলেও তা ব্যবহার করে বিআরটিসি বাস। বেসরকারি বাসের বাড়ি তো সিটি করপোরেশনের রাস্তা। গুলিস্তান এলাকার ব্যবসায়ীদের বক্তব্য হলো, এই এলাকায় যানজটের ভোগান্তির মূল কারণ বাস দিয়ে রাস্তা দখল করে রাখা। বেশ কয়েকবার ভাসমান টার্মিনাল বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বেশি দিন তা স্থায়ী হয় না।

এছাড়া মিরপুর, ফার্মগেট, বনানী, গাবতলী, টেকনিক্যাল, ১০ নম্বর, ১ নম্বর, ধানমন্ডি, গুলশান, বাড্ডা, নতুনবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার ওপর বাস রাখার কারণে নগরবাসীর অশান্তির কোনো শেষ নেই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যা বলেন, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি এসব অবৈধ বাস পার্কিং বন্ধ করার জন্য। গোটা পরিবহন সেক্টর এখন সংস্কারের মধ্যে আছে। ধারাবাহিকভাবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সঙ্কট অনেক। তাই রাতারাতি সব সমাধান হবে না। আস্তে আস্তে নগরবাসী সুফল পাবেন।

পিডিএসও/হেলাল