মুক্তির সংগ্রামে উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলার মাটি

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৪৫ | আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৪৮

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর মুক্তির সংগ্রামে উত্তাল ছিল বাংলার মাটি; বিজয় দ্বারপ্রান্তে। পাকবাহিনী পিছু হটছে। এদিন মুক্তিবাহিনী ঘোড়াশালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবস্থানের ওপর চারদিক থেকে আক্রমণ করে ২৭ পাক হানাদারকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। এখান থেকে বেশ কয়েকটি গোলাবারুদ উদ্ধার করে মুক্তিবাহিনী। আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এলেও পাকবাহিনী তাদের বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠে মুক্তিবাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ করে। এই আক্রমণে মুক্তিবাহিনী পুনরায় তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে তিন দিক থেকে শত্রুকে আক্রমণ করলে পাকিস্তানি বাহিনী আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে পালিয়ে যায়।

চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা উত্তরে ফটিকছড়ি ও রাউজান থানা এবং দক্ষিণে আনোয়ারার অধিকাংশ স্থান তাদের দখলে আনতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানি কমান্ডার মোছলেহ উদ্দিন ভালুকা থেকে একদল রাজাকারকে সঙ্গে নিয়ে কাঁঠালি গ্রামে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করতে এলে মুক্তিবাহিনীর সেকশন কামান্ডার গিয়াসউদ্দিন এবং ৩ নম্বর সেকশন কমান্ডার আবদুল ওয়াহেদের নেতৃত্বে আক্রমণে ৩ পাকিস্তানি হানাদার এবং ৭ জন রাজাকার নিহত হয় এবং ৭ জন পাক সৈন্য আহত হয়। পরে পাকিস্তানি হানাদাররা মৃতদেহগুলো নিয়ে পালিয়ে যায়।

শত্রুপক্ষ বুঝতে পারে, মুক্তিযোদ্ধাদের আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। পরাজয় নিশ্চিত জেনে মরণকামড় দিতে শুরু করে দখলদার বাহিনী। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের দিকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল নিয়াজী তার রাজাকার, আলবদর ও সেনাবাহিনীকে দেশের চারদিকে ছড়িয়ে দেয় নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালাতে। কিন্তু এদিনে গেরিলা আক্রমণ থেকে সম্মুখযুদ্ধের গতি বাড়ে। অপ্রতিরোধ্য বাঙালির বিজয়রথে পাকবাহিনীর নিষ্ঠুর সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে থাকে।

প্রবাসী সরকার অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়, বাংলাদেশের বিজয় আসন্ন। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের খবর প্রচারিত হতে থাকে। রেডিওতে বাজে জয়ের গান। ঢাকায় গেরিলাযোদ্ধারা একের পর এক গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন দখলদারদের আস্তানা। পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে ২ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে বিবিসিতে সবিস্তারে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন সংবাদদাতা নিজামউদ্দিন আহমদ। বিগত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার পাঁচটি স্থানে বোমা বিস্ফোরণের খবর তিনি জানিয়েছিলেন।

ঢাকার রামপুরা ও মালিবাগে বিস্ফোরণে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সংবাদ তিনি জানান। খবরে আরো প্রকাশ, জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আযম অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানে জাতীয় সরকার গঠনের ইঙ্গিত দিয়ে দাবি করেছেন সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী, অর্থ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে মনোনীত করা হয়। তার মতে, তবেই নাকি প্রদেশের মানুষের আস্থা ফিরে পাওয়া যাবে। এদিন সীমান্ত-সংঘাত আরো তীব্র হয়ে ওঠে। পাকিস্তান অভিযোগ করেছিল যে, সাতটি স্থানে ভারত যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলেছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহে আঘাত হেনেছে। ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই ত্রিমুখী যুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। এসব দেখেশুনে ভারত সরকার বুঝেছিল, পাকিস্তান যুদ্ধ করবেই। ভারত তখন যে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা বা আশা একেবারে ছেড়ে দিয়েছে তা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে ভারত সামরিক প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিল। পশ্চিমের প্রস্তুতি দেখে এবং নাশকতামূলক কাজের লোক ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত মোটামুটি পরিষ্কার বুঝে ফেলে পাকিস্তান রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে না বরং লড়াই-ই করবে। তাই তখন থেকে ভারতের প্রস্তুতিও জোরদার হয়েছিল।

পিডিএসও/হেলাল