প্রতারণা করে বয়স কমানোর চেষ্টা!

প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৪১ | আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:৪৪

গাজী শাহনেওয়াজ

নাম মো. আ. কাদির, বাবার নাম মো. আ. গনি এবং জন্ম তারিখ ০১.১০.১৯৬৫। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নং-১৪৫৬৬৫৯০৭৫। তিনি নিজ নাম, বাবার নাম এবং জন্ম তারিখ তিনটিই সংশোধন চান। চাকরির ধরন সরকারি। সেখানে জন্মসনদ, ৮ম শ্রেণির পাস ও নাগরিক সনদ দাললিক প্রমাণ হিসেবে আবেদনে উল্লেখ করেন। সুপারিশ রয়েছে, ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের নেজারত ডেপুটি কালেক্টরের। এই ব্যক্তি বর্তমানে মো. আ. কাদির থেকে মো. আবদুল কাদির, বাবার নাম মো. আ. গনি থেকে মো. আব্দুল গনি এবং জন্ম তারিখ ১.১০.১৯৬৫ স্থলে ৩০.১১.১৯৯৩ করতে চাচ্ছেন। দেখা গেছে, নিজ এবং বাবার নামে আমূল পরিবর্তন না হলেও জন্ম তারিখ সংশোধন চান চাকরি জীবনের পুরো সময়। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কাদিরের এনআইডি সংশোধন করতে সহায়তা করলে এই ব্যক্তির বর্তমান পরিচয়পত্র থেকে সংশোধিত পরিচয়পত্রের বয়সের ব্যবধান দাঁড়াবে ২৮ বছর।

আর মো. আবুল কাশেম চান নিজ নাম মায়ের নাম এবং জন্ম তারিখ সংশোধন করতে। এক অর্থে বলা যায়, পরিচয়পত্রে থাকা পুরো তথ্যেই সংশোধন চান তিনি। তার জাতীয় পরিচয়পত্র নং ৩২৬০৩৬৮২৩২। বিদ্যমান পরিচয়পত্রে মো. আবুল কাশেমের স্থলে তিনি চান মো আবুইল কাশেম, মায়ের নাম মোছা. মখল জান এর স্থলে মো. মোগলজান। আর জন্ম তারিখ ১৬.০৩.১৯৬৪ স্থলে ৩১.১২.১৯৮৬। আবুল কাশেমের চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রটি সংশোধিত হলে বিদ্যমান থেকে সংশোধিত পরিচয়পত্রের বয়সের ব্যবধান হবে ২২বছর। একই অবস্থা আকরাম হোসেনের ক্ষেত্রেও। তার জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা জন্মতারিখটি সংশোধিত হলে বয়সের ব্যবধান দাঁড়াবে ২০ বছর। আকরাম হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্র নং ৭৭৭৯৮৩৭১২৪। মো শহীদুল ইসলাম বয়স ৮ বছর বাড়িয়ে পুরো পরিচয়পত্রে থাকা তথ্যটি সংশোধন চেয়ে ইসির কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি নিজ নাম, পিতার নাম ও মাতার নামও সংশোধন চান।

শুধু কাদির, কাশেম, আকরাম ও শহীদুল নন—এমন হাজার হাজার নাগরিক প্রতারণা করে বয়স কমাতে ও বাড়াতে প্রতিনিয়ত জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন (এনআইডি) অনু বিভাগে আবেদন জানাচ্ছেন। এসব অসম ও অযৌক্তিক পরিচয়পত্র সংশোধন ও নথি চালাচালিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে খোদ অনু বিভাগের সংশ্লিষ্টদের। কারণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উচ্চমহল থেকে অন্যায্য এসব পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য তদবির আসে।

ভিআইপি ও প্রভাবশালী মহলের তদবির না শুনলে যেমন চাকরি থেকে অব্যাহতির হুমকি দেওয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে জামায়াত-বিএনপি আখ্যা দিয়ে হেনস্থা করার অভিযোগ রয়েছে তাদের পক্ষ থেকে। চাকরি করার সুবাধে উভয় সংকটে পড়ে যান এনআইডির কর্মকর্তারা। প্রতিকার চেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পত্রও পাঠায় ইসি। কিন্তু প্রতিউত্তর ফলশূন্য। তদবির ও চাপ প্রয়োগ অব্যাহত থাকে সংশ্লিষ্টদের ওপরে।

সব ধরনের ঝামেলা ও চাপমুক্ত থাকতে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য গোপন করে চাকরিপ্রাপ্তির পর জাতীয় পরিচয়পত্রের বিভিন্ন তথ্য সংশোধন করা যাবে কি না সে বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত পেতে সভার চিন্তা করছে এনআইডি কর্তৃপক্ষ। সেখানে বলা হয়েছে, ১৭ জন আবেদনকারী পরিচয়পত্রে তাদের তথ্যাদি সংশোধনের আবেদন করেন, যারা ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বর্তমানে কর্মরত। এ তালিকায় কাদির, কাশেম, আকরাম ও শহীদুলসহ অন্যরা আছেন। দীর্ঘদিন ওই ১৭ জন উমেদার হিসেবে চাকরিরত ছিলেন। পরে জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং ভিন্ন কৌশলে বয়স কম দেখিয়ে স্থায়ী পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এসব চাকরিদের বিদ্যমান এনআইডি ও ডাটাবেসে এসএসসি ও এইচএসসি থাকলেও তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম দেখিয়ে এবং ৫ থেকে ২৮ বছর কম উল্লেখ করে ইসিতে আবেদন করেছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ৫ম, ৮ম ও স্বশিক্ষিত বললেও প্রত্যেকের ইসির ডাটাবেসে শিক্ষা জীবনের সনদ উল্লেখ রয়েছে। কমিশন বলছে, এসব অযৌক্তিক, অসম বয়স কমিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করলেও রাষ্ট্রীয় পরিচয় বহন করা এনআইডির বিষয়ে মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।

শুধু ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে আবেদন করা ১৭ জন নন, জামালাপুর থেকে ১৯ জনসহ অন্যান্য জেলা থেকে এ ধরনের আইডি সংশোধনের আবেদন আসছে। কমিশন বলছে, বয়স কমিয়ে চাকরি নেওয়া এবং পরে এনআইডিতে বয়স কমানো এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা কম দেখিয়ে বিশেষ করে সর্বোচ্চ ৮ম শ্রেণি দেখিয়ে যে আবেদন আসছে তা উদ্বেগজনক। এতে দুর্নীতির সুযোগ যেমন বাড়ছে তেমনি এনআইডি কার্ডের তথা নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য কমিশনের সহায়তা পেতে চাচ্ছে এনআইডি উইং। কমিশন এসব বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত জানায় ওই অপেক্ষায় কমিশন।

এমনকি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া চাকরিতে প্রবেশ না করাতে যে সুপারিশ জানিয়ে ইসি পত্র দিয়েছিল তাও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কারণ সরকারের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে অনিয়ম বেশি হচ্ছে বলে মনে করছে কমিশন।

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অবেদন করা অন্যদের মধ্যে মো. ওবায়দুর ইসলাম, মো. আবদুস সাত্তার, মো মানিক মিয়া, মো. ওমর ফারুক প্রমুখ। একইভাবে জামালপুরের মো. হুমায়ুন আহমেদ, মোছা. নুর নাহার, মো. আজিজুল হক প্রমুখ।

পিডিএসও/হেলাল