স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নতুন উদ্যোগ

গৃহস্থালির বর্জ্য পুড়িয়ে উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৪১

গাজী শাহনেওয়াজ

গৃহস্থালির বর্জ্য নিয়ে দুঃচিন্তা ও অস্বস্তির অবসান ঘটাতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইনসিনারেশন (ক্ষতিকর বর্জ্য ধবংস করা) পদ্ধতিতে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওই উদ্যোগ নিয়েছে। ইনসিনারেশন পদ্ধতিতে উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে কিনবে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর ফলে সমৃদ্ধ হবে জ্বালানি খাত। এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ওই বিভাগকে দেওয়া হয়েছে।

কার্যক্রম শুরু হবে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি দিয়ে। পরে সিটির কাছাকাছি পৌরসভাকে এ কাজে যুক্ত করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে সারা দেশকে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা হবে।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের এই পদক্ষেপে বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজ খরচে সরকারকে এ কাজে সহযোগিতা করতে সম্মত রয়েছে। উৎপাদিত জ্বালানি বিক্রির মুনাফা উদ্যোক্তারা পাবেন। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) তাদের এই জ্বালানি কিনবে। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ও উদ্যোক্তা কর্তৃপক্ষের মধ্যে চলছে দেনদরবার। সবুজ সংকেত (গ্রিন সিগন্যাল) পেলে কাজে নেমে পড়বে বিনিয়োগকারীরা। এর আগে স্থাপন করা হবে ইনসিনারেশন প্লান্ট। ভবিষ্যতে সরকারের নিজ উদ্যোগে এই প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, গৃহস্থালির ক্ষতিকর সব বর্জ্য ইনসিনারেশন পদ্ধতিতে ধ্বংস করা হবে। বিশ্বে এই পদ্ধতিই উত্তম। মন্ত্রী বলেন, প্রথম পর্যায়ে ঢাকার দুই সিটি (উত্তর-দক্ষিণ) ও চট্টগ্রাম সিটি দিয়ে শুরু করা হবে। নিকটবর্তী পৌরসভাকে এ কাজে যুক্ত রাখা হবে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা বর্জ্য ধ্বংসে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও সিটি এবং পৌর কর্তৃপক্ষ বর্জ্য পৌঁছে দিয়ে তাদের এ কাজে সহায়তা করবে।

তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে সারা দেশের ক্ষতিকর বর্জ্য সংগ্রহ করে ওই পদ্ধতিতে ধ্বংস করা হবে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের আয় বেড়েছে। ক্রয় ও ভোগের ব্যাপক বৃদ্ধির কারণে গ্রাম থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত ব্যাপক বর্জ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। গোটা দেশে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে নদ-নদী, খালবিল ভরাটের কারণে পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এগুলো দুর্গন্ধ ও রোগ জীবাণু ছড়াচ্ছে। মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তাই এখন সারা দেশে দৈনিক উৎপাদিত বর্জ্য নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, নগরায়ণ দ্রুত হচ্ছে। বর্জ্যরে ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। গতানুগতিভাবে বর্জ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ডাম্পিংয়ের জন্য প্রচুর জায়গা লাগে যা নেই আমাদের। কেননা দৈনিক ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটিতে ৬ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য হয়, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ সংরক্ষণ করা যায়। বাকি বর্জ্যরে কারণে পরিবেশ নষ্ট হয়।

তিনি বলেন, ক্ষতিকর এসব বর্জ্য ধ্বংস করতে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। এজন্য মন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা কয়েকটি দেশ (সিঙ্গাপুর, চায়না, থাইল্যান্ড, কোরিয়া ও জাপান) সফর করেছি। সফরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইনসিনারেশন পদ্ধতিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। পরিবেশসম্মতভাবে এসব ক্ষতিকর বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা হবে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, সিটি করপোরেশন ইনসিনারেশন প্লান্ট স্থাপনের জায়গা দেবে।

তিনি বলেন, বর্জ্য পুড়িয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে সেগুলো উদ্যোক্তাকারীদের কাছ থেকে কিনবে বিদ্যুৎ বিভাগ। এরই মধ্যে একটি প্রস্তাব ওই বিভাগকে দেওয়া হয়েছে যা তাদের পর্যালোচনায় রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এ ব্যাপারে কতটুকু অগ্রগতি জানতে চাইলে গতকাল শনিবার অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, নথিপত্র না দেখে অগ্রগতির বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না।

জানা যায়, রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষের গৃহস্থালির বর্জ্য নিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়। সিটির পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বাসাবাড়ির যে বর্জ্য সংগ্রহ করে তার পদ্ধতিও সুরক্ষিত না। এসব বর্জ্য সড়কের অলিগলিতে যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিড়িয়ে থাকে। এতে পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে থাকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে ২০০০ সালে বর্জ্য ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ নেন। পটপরিবর্তনের ফলে ক্ষমতার বাইরে আওয়ামী লীগ সরকার চলে গেলে উদ্যোগটি টানা ৯ বছর লালফিতায় বন্দি থাকে। তবে পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ এলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদের সরকার আমলে এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি ছিল না। গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে টানা তৃতীয় এবং ৪র্থ দফায় ক্ষমতায় এসে চমক হিসেবে অনেক নতুন মুখ ও ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক মো. তাজুল ইসলাম। তিনি দায়িত্বে এসে বাসাবাড়ির বর্জ্যর সুষ্ঠু ও সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেন। পরে উন্নত দেশগুলো বর্জ্য অপসারণে কী পদ্ধতি অনুসরণ করছে তার মডেল সংগ্রহ করে কয়েকটি দেশ সফর করেন। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা এবং মন্ত্রীর একক প্রচেষ্টায় এই উদ্যোগটি আজ স্বপ্ন নয়, বাস্তবায়নের পথে।

এদিকে, বর্জ্য ধ্বংসের প্লান্ট এবং সিটি ও পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা। বিনিয়োগকারীদের তারা কীভাবে বর্জ্য দিয়ে সহায়তা দেবে তা নিয়েও তাদের দিক থেকে স্থানীয় সরকারকে দিচ্ছে প্রস্তাব। এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি থেকে এ বিভাগকে একটা প্রস্তাবনা দিয়েছে। এখনো প্রস্তাবনার বাইরে রয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

এর আগে গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় সিটি ও পৌর কর্তৃপক্ষ বর্জ্যসমূহ প্লান্টে পৌঁছে দেবে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করলেও এ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি পথনকশাও তৈরি করা হচ্ছে। এখানে মূল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কারণ বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও কত টাকা মূল্যে বিদ্যুৎ কিনবে কর্তৃপক্ষ এ ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ।

এ নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে একটি সভা অনুুষ্ঠিত হয়। সভায় মন্ত্রী বলেন, বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার বিভাগই নেতৃত্ব দেবে। এ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই ও কার্যকর করার জন্য সিটি করপোরেশনের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া স্ব স্ব ভূমিকা রাখবে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (বাবিউবো) অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা। তিনি বলেন, কাজ হবে সম্মিলিত ও সমন্বিতভাবে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশের ঘনবসতি এবং জমির স্বল্পতা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বর্জ্য ভস্মীকরণের মাধ্যমে বর্জ্যরে চূড়ান্ত পরিত্যাজন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভস্মীকরণের বিষয়টিই মুখ্য এখন। এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপশক্তি দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বাই প্রোডাক্ট।

সব প্রক্রিয়া শেষ হলে ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে বলে আশা করছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

পিডিএসও/তাজ