আয়ের ৮০ শতাংশ চলে যাচ্ছে এই খাতে

ভাড়াটিয়া নামলেই বাড়ে ভাড়া

২৬ বছরেও বাড়েনি হোল্ডিং ট্যাক্স | ভাড়া ১০ বছরে বেড়েছে ৩৫০ শতাংশ

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০১৯, ১০:১৫

কাইয়ুম আহমেদ

রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীতে ডাইনিং স্পেস বাদে দুই কক্ষের একটি বাসায় প্রায় ৩ বছর বাস করছেন বেসরকারি চাকুরে জীবন আহমেদ। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও সার্ভিস চার্জ মিলে তার বর্তমান খরচ প্রায় সাড়ে ১১ হাজার। তিনি এই বাসা ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছেন আগামী মাসে। এখন এই বাসায় নতুন ভাড়াটিয়া উঠলে তার গুনতে হবে কমপক্ষে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। আর জীবন এই বাসায় ওঠার আগে ভাড়া ছিল সাড়ে ৯ হাজার টাকা।

অর্থাৎ ভাড়াটিয়া নামলেই ভাড়া বাড়িয়ে দেন বাড়ির মালিক। বাড়িভাড়া বাড়ার এই চিত্র শুধু বনশ্রীর নয় গোটা রাজধানীর। এখানে ৯০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাড়িতে থাকেন। মোট হোল্ডিংয়ের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। ২৬ বছরেও বাড়ানো হয়নি হোল্ডিং ট্যাক্স; কিন্তু ১০ বছরে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩৫০ শতাংশ।

সবুজবাগের বাসাবোয় একটি বাড়িতে ১২ বছর ধরে আছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তার বাড়িমালিক প্রতি বছর ৫০০ টাকা করে ভাড়া বাড়ান। গত ১২ বছরে তার বেড়েছে ৬০০০ টাকা; যা ১২০ শতাংশ। তার ওপর আছে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও সার্ভিস চার্জ। কিন্তু সেবার মান ও আয় বাড়েনি তার। উল্টো ১২ বছরে তার খরচ বেড়েছে শতকরা ১৮ ভাগ। ষাটোর্ধ্ব এই সাংবাদিকের এখন সংসারের ঘানি টানতে হিমশিম অবস্থা। কিন্তু বাড়ির মালিকের কথা এভাবে না থাকতে পারলে চলে যান।

মিরপুরের পাইকপাড়ায় থাকেন আরেক সাংবাদিক। তার বাড়িভাড়া বাড়ার হার এত বেশি যে, তিনি কয়েক মাস পরপরই বাড়ি বদলান। ৭৫০০ টাকার বাড়িভাড়া এখন হয়ে গেছে ১৫ হাজারেরও বেশি। তিনি বাড়িভাড়া টানতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। তার খরচ বাড়ার পাশাপাশি ঘরের আসবাবও নষ্ট হয়ে যায় টানাহ্যাঁচড়ায়। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বললেন, এভাবে কী বেঁচে থাকা যায়?

সূত্র বলছে, ভাড়া বাড়লেও বাড়ি ছেড়ে দিতে পারেন না অনেক ভাড়াটিয়া। তাদের সন্তানরা এলাকার স্কুলে পড়ে। অনেক সময় তাদের পরীক্ষা থাকে। শিশুর বাবা এলাকায় চাকরি করেন। এসব কারণে চাইলেই হঠাৎ করে বাড়ি বদলানো যায় না। বাড়ি খোঁজা এবং বদল করতে পরিবারের সবাইকে হাড়ভাঙা খাটুনির শিকার হতে হয়। এসব কারণে অনেকে বাড়ি বদল করতে চান না । আর এ সুযোগ নেন অনেক বাড়ির মালিক।

একদিকে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, অপরদিকে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন গতি। এর সঙ্গে যাতায়াত, লেখাপড়া ও চিকিৎসা খরচ সব মিলিয়ে নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা সাধারণ মানুষের। যে হারে বাড়িভাড়া বেড়েছে তাতে আয়ের ৮০ শতাংশ চলে যাচ্ছে এই খাতে। তাছাড়া বাসায় মেহমান এলে অনেক বাড়িমালিক সহজভাবে নিতে চান না। কখনো কখনো মেহমান বেশি দিন থাকলে আকারে ইঙ্গিতে অপমানজনক কথা বলেন।

এদিকে, দেশে বাড়িভাড়ার আইন থাকা সত্ত্বেও মালিকরা তা মানছেন না। তারা তোয়াক্কা করছেন না ঢাকা সিটি করপোরেশনের বেঁধে দেওয়া ভাড়া। আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে দিন দিন বাড়ছে বাড়ি মালিকের এই স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ।

তবে এ নৈরাজ্য দূর করতে ঢাকা সিটি করপোরেশন ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ঢাকা শহরকে ১০টি রাজস্ব অঞ্চলে ভাগ করে ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন আবাসিক এলাকাকে কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। মেইন রোডের পাশে হলে এক রকম ভাড়া, গলির ৩০০ ফুটের মধ্যে হলে এক রকম ভাড়া আর গলির ৩০০ ফুটের বাইরে হলে আরেক রকম ভাড়া।

আবার আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পÑ এ তিন ক্যাটাগরিতেও ভাগ করা হয়েছে। এ ছাড়া হোল্ডিং নম্বর, নির্মাণের সময়কাল, কাঠামো, নির্মাণশৈলী, অবস্থান ও পজেশন হস্তান্তরের শর্তের ওপর ভিত্তি করে ভাড়ার তারতম্য হতে পারে। তবে বিধান থাকলেও নির্ধারিত ভাড়া মানা হচ্ছে না।

বাড়ির বাজার মূল্য নির্ধারণ করার পদ্ধতিও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ১৯৬৪ তে স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে। এ ভাড়া বাড়ির মালিক ও ভাড়াটের মধ্যে আপসে নির্ধারিত হতে পারে। আবার ভাড়ানিয়ন্ত্রকও নির্ধারণ করতে পারেন। এটাকে সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য করতে ঢাকা সিটি করপোরেশান ঢাকা মহানগরীকে দশটি রাজস্ব অঞ্চলে ভাগ করে ক্যাটাগরি ভিত্তিক সম্ভাব্য বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু কোথাও এই ভাড়া নেওয়ার নজির নেই।

তাছাড়া আইনে বাড়ির মালিককে ভাড়ার রসিদ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এ রসিদ সম্পন্ন করার দায়দায়িত্ব বাড়ির মালিকের। রসিদ প্রদানে ব্যর্থ হলে ভাড়াটের অভিযোগের ভিত্তিতে বাড়ির মালিকের আদায় করা টাকার দ্বিগুণ অর্থদণ্ডে দ-িত হবেন। আইনে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর, ভাড়া আদায়ের রসিদ দেওয়া, এক মাসের বেশি অগ্রিম না নেওয়া, হঠাৎ করে বাসা ভাড়া না বাড়ানো এবং বাড়ি ছাড়ার আগে নোটিশ দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বিধান থাকলেও মানছেন না কেউ। এতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত বাড়ি ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে ভাড়াটিয়াদের। আর এভাবেই গত ২৬ বছরে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ৩৮৮ ভাগ।

সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বস্তির ভাড়া। প্রায় ১৭ শতাংশ। ২০১৩ সালে দুই কক্ষের বস্তি বাসার ভাড়া ছিল যেখানে ৬,০০০ টাকা, গত বছর ভাড়া দিতে হয়েছে ৭,০০০ টাকা।

এমন পরিস্থিতিতে হিসাব মতো রাজস্ব আদায়ে এনবিআর বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে রাজস্ব বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এটি ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ঘাটতি এড়াতে এনবিআর অর্থবছরের শুরু থেকেই বিভিন্ন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব এমন সব খাতের তালিকা করে কাজ করছে।

বাড়িভাড়ার তথ্যে গরমিল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকৃত তথ্য জানতে চাওয়া হয়। আর মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে সন্দেহ হলে এনবিআরের গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। এভাবে তথ্য সংগ্রহ করে সঠিক হিসাবে রাজস্ব আদায়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, অনেক বড় বড় বাড়ি দেখা যায়। ওই সব বাড়ির ভাড়া হিসেবে বড় অঙ্কের অর্থ আয় হয়। অথচ অনেক বাড়ির মালিক রাজস্ব ফাঁকি দিতে কত টাকার বাড়ি ভাড়া পাচ্ছেন তা তার রিটার্নে উল্লেখ করেন না। এখন এই বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হবে।

ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার বলেন, প্রচলিত আইন থাকলেও বাড়ির মালিকরা তা মানেন না। তারা তাদের খেয়াল খুশিমতো প্রতি বছর ভাড়া বাড়ান। এ বিষয়টি ভাড়াটিয়াদের নাভিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। বাড়ি মালিকদের আচরণেও ভাড়াটিয়ারা নাজেহাল হন। এতে ভাড়াটিয়ারা মানবেতর জীবনযাপন অতিবাহিত করতে বাধ্য হচ্ছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সঙ্গে বাড়িভাড়া বাড়ানো হয়। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া বাড়ানোর কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই।

পিডিএসও/তাজ