স্থানান্তর শুরু নভেম্বরে

ভাসানচরে ঠাঁই পাচ্ছে ৩ শ্রেণির রোহিঙ্গা

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:০৩ | আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:২০

গাজী শাহনেওয়াজ

নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের আবাসনের ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। এই আবাসনে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন করা হবে। অবকাঠামোসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কাদের সেখানে পাঠানো হবে, তার মানদণ্ডও মোটামুটি নিরূপণ করা হয়েছে। লক্ষ্য আগামী নভেম্বরে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করা।

ভাসানচরে ১ হাজার ৭০০ একর জায়গাজুড়ে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে বিশাল কর্মযজ্ঞ ও আবাসন সুবিধা গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও এ চরে মোট জমির পরিমাণ ১৭ হাজার একর। এ বিবেচনায় আরো কমপক্ষে ২ লাখ পুনর্বাসনের সুযোগ রয়েছে।

নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এর মধ্যে নিবন্ধিত ১১ লাখ। এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিদিনই মিয়ানমার থেকে দুই-একজন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে। তাদের তথ্যমতে, গত এক বছরে এই প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। এছাড়া প্রতিনিয়ত জন্মগ্রহণ করছে নতুন শিশু। গত একবছরে অনুপ্রবেশ এবং নবজাতক রোহিঙ্গার সংখ্যা—সব মিলিয়ে বেড়েছে ৫৫ হাজার।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, কারা নবনির্মিত এই আবাসনে আশ্রয় পাবে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে কয়েকটি ক্রাইটেরিয়া (মানদন্ড) নির্ধারণ করেছে সরকার। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, নবাগত শরণার্থী, নতুন জন্মগ্রহণ করা শিশু ও তাদের পরিবার এবং প্রত্যাবসনে (মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি নন) অসম্মতি জ্ঞাপনকারীর। প্রাথমিকভাবে এই তিন শ্রেণির শরণার্থীকে ভাসাণচরে স্থানান্তর করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রত্যাবসান চুক্তির অংশ হিসেবে দৈনিক সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে মিয়ানমারে হস্তান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগতে পারে বেশ কয়েক বছর। কারণ বৈরী আবহাওয়ার কারণে বছরের ছয় মাস (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর) হস্তান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ থাকে। অক্টোবর মাস শুরু হয়েছে। ফলে নতুন করে প্রত্যাবসন কার্যক্রম আরম্ভ হতে পারে। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার কার্যবিবরণি এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, চলতি মাস থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু যোগাযোগসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে এ মাসে নয় আগামী নভেম্বর থেকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। এর আগে নিশ্চিত করা দরকার কীভাবে তাদের পুনর্বাসন করা হবে, কারা সেখানে বসবাস করবে। রোহিঙ্গা তদারকি কর্তৃপক্ষ এসব পদ্ধতি ঠিক করে ফেলেছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তাদের ভাষ্যমতে, ভাসানচরে নতুন আসা রোহিঙ্গারা বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। আরো পাচ্ছে নতুন জন্মগ্রহণ করা শিশু এবং যারা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি নয় তারা। তবে এই চরে ১৭ হাজার একর জমি থাকলেও সবমিলিয়ে ৩ লাখ মানুষকে পুনর্বাসনের সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আশ্রয়ণ প্রকল্প-৩ এর সংশ্লিষ্টরা। বছরের দুর্যোগ মৌসুমে বাকি অঞ্চলে জোয়ারের পানিসহ নানা প্রতিকূলতায় বসবাস উপযোগী পরিবেশ থাকে না। তবে এই ১ লাখ রোহিঙ্গাদের পর বাকিদের মধ্যে যারা মিয়ানমারে যাবেন না কিংবা পাঠানো সম্ভব হবে না, তাদের কেউ আগামীতে এখানে স্থানান্তরের চিন্তা রয়েছে সরকারের।

এদিকে নভেম্বরে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পুর্নবাসনে কতটুকু উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে, তার একটি চিত্র ওঠে এসেছে প্রকল্প পরিচালক কমডোর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর দেওয়া এক তথ্যে। তিনি বলেছেন, গুচ্ছগ্রাম ঘরের সব (১ হাজার ৪৪০টি) হাউস নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি অক্টোবরের মধ্যে সম্পন্ন হবে সাইক্লোন সেন্টারের কাজও। তিনি বলেন, বাঁধের ১২ কিলোমিটার, শোর প্রটেকশনের ২ দশমিক ১ কিলোমিটার কাজসহ অভ্যন্তরীণ যোগাযোগর জন্য ৪০ কিলোমিটার রাস্তার কাজ ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সম্পন্ন হয়েছে চারটি ওয়্যারহাউস, একটি মেগাওয়াট সোলার হাইব্রিড প্ল্যান্ট, এক মেগাওয়াট ও দুটি ৫০০ কিলোওয়াট ডিজেল জেনারেটর স্থাপনের কাজও। এছাড়া চারটি এলসিইউ নির্মাণের কাজ ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে উঠানামার জন্য পাঁচটি পল্টুন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে যত ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তা থাকবে। ভবনগুলো করা হচ্ছে সাইক্লোন সেন্টারের আদলে। প্রতিটি রুমের আয়তন ১২ বাই ১২ ফুট। কমন ব্লক হবে। পুরুষ-মহিলাদের জন্য আলাদা আলাদা স্যানিটেশন ব্যবস্থা থাকবে। কয়েকটি পরিবার এগুলো মিলেমিশে ব্যবহার করবে। রান্নাঘরের আয়োজনে থাকবে কমন ওই পদ্ধতি। তবে একটি রুমে একটিই পরিবার থাকবে। তাদের সংখ্যাও নির্ধারণ রয়েছে। এই এলাকায় নিরাপত্তাসহ সার্বিক তদারকির জন্য ২০টি অফিস থাকবে। অতিরক্তি সচিব থেকে সহকারী পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই পুনর্বাসন এলাকার তদারকির কাজে নিয়োজিত থাকবেন।

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, আমরা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন যারা মিয়ারমার থেকে এখানে আসছে তাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এছাড়া নবজাতক শিশু পরিবার এবং যারা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি নয় তাদের এই ক্যাম্পে পুনর্বাসন করা হবে। এক কথায় বললে, দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ ১ লাখ রোহিঙ্গার ঠাঁই হবে ভাসানচরে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিক সমস্যা নিশ্চিতে কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের মতামত তুলে ধরেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম সচিব হারুন আর রশীদ বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায় ভাসানচরে একটি থানা স্থাপন করা হবে। অপর যুগ্ম সচিব মুনিম হাসান বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট স্থাপন করা হবে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, অক্টোবরের মধ্যে ভাসানচরে চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং দুটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ব্যবহার উপযোগী করে স্থাপন করা হবে।

বিআরডিবির মহাপরিচালক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গাদের জীবিকায়নের জন্য জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্পের অধীন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, ভাসানচরে প্রচুর সংখ্যক পুকুর ও জলাশয় রয়েছে এবং পর্যাপ্ত চাষাবাদযোগ্য খালি জায়গা রয়েছে। মৎস্য চাষ, গবাদিপশু, শাক-সবজি চাষাবাদের সুযোগ রয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব খাদিজা নাজনীন বলেন, এতিম রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, বর্তমানে ভাসানচর মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় আছে। বহাল থাকবে ৪জি নেটওয়ার্ক-ও। প্রয়োজনে ল্যান্ডফোনের সুবিধা সম্প্রসারণসহ নেটওয়ার্ক সুবিধা বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অনল চন্দ্র দাস বলেন, ভাসানচরের সঙ্গে বর্তমানে যাত্রী পরিবহনের জন্য স্বাভাবিক, নিয়মিত জাহাজ, লঞ্চ ও স্টিমার যোগাযোগ নেই। তবে নিকটবর্তী নোয়াখালী, হাতিয়া, সন্দ্বীপের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। জনগণ স্থানীয় বড় বোট ও ট্রলারযোগে যাতায়াত করে। রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে।

পিডিএসও/হেলাল