যন্ত্রাংশ সংরক্ষণের খরচ ৪ গুণেরও বেশি

কেইস প্রকল্পে ক্ষুব্ধ সংসদীয় কমিটি

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৮:০৩

গাজী শাহনেওয়াজ

নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের অবস্থা এক্কেবারে নাজুক। এই প্রকল্পের কমপ্রেসড এয়ার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিএএমএস) কেনার মূল্য যেখানে ১০ কোটি টাকা; এর যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে খরচ দেখানো হয়েছে ৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ চারগুণের চেয়েও বেশি খরচ দেখানো হয়েছে এই প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে।

সংসদীয় কমিটির সভায় ওই চিত্র উঠে আসায় কমিটির সদস্যরা হতবাক হয়ে যান। তারা বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের নামে ওই টাকার বেশির ভাগই লুটপাট করা হয়েছে। এ নিয়ে কমিটির বৈঠকে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা প্রকল্পের মূল কাজ শুরুর আগেই ‘টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল)’ প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

জানতে চাইলে সাবেক মহা হিসাব নিরীক্ষক এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, বহু ধরনের কাজের গ্রাউন্ড আছে যার দ্বারা কেনাকাটার সময় দুর্নীতি হয়ে থাকে। এটা নতুন নয়। বরং বহু দিন ধরে চলে আসছে এবং সময়ের সঙ্গে এটি বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, আর এ কারণেই এ খাতে দুর্নীতি বন্ধে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং ই-টেন্ডারিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। কারণ কেইস প্রকল্পের দুর্নীতি বালিশ ও পর্দা কেলেঙ্কারিকে হার মানিয়েছে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রকল্পের টাকায় প্রশিক্ষণের নামে কর্মকর্তারা বিদেশে ভ্রমণ করেন। যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই দেখা যায়, তারা অবসরে চলে গেছেন। ফলে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও প্রকল্পের উন্নয়নে কোনো কাজ হয়নি। এটা কেইস প্রকল্পে হয়েছে। আবার সুফল প্রকল্পে এসেও তেমনটি দেখা যাচ্ছে। কমিটির পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পরিবেশ বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে একের পর এক তথ্য বেরিয়ে আসছে। এর আগে কেইস প্রকল্প নিয়ে পরিবেশ বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনাকালে দেখা যায়, প্রকল্পের কাজের নামে বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি বিলাস, পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত নয়—এমন কাজকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্পের টাকা বেশির ভাগই লুট করা হয়েছে। সর্বশেষ ১৮২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের খাতওয়ারি ব্যয়ের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্পের মূল কাজের থেকে আনুষঙ্গিক ব্যয় বেশি। যা কমিটিকে দেওয়া প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং প্রকল্প এলাকায় বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প আয়বর্ধক কাজের সুযোগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ‘টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল)’ প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালের ১ জুলাই শুরু হয়। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শেষ হবে ২০২৩ সালের ৩০ জুন। দেশের ৮টি বিভাগের ১৭টি বন বিভাগের ২৮ জেলায় ৬০০টি গ্রামে বাস্তবায়িত হবে। এখনো সেই গ্রামগুলো চিহ্নিত করা হয়নি। অথচ প্রকল্পের কর্মকর্তারা এরই মধ্যে বিদেশে প্রশিক্ষণ শুরু করেছেন। যার মাধ্যমে ১১৩ কোটি টাকা লুটপাটের আয়োজন চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।

সংসদীয় কমিটি সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট দফতরের দেওয়া প্রতিবেদন নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রশ্ন তোলা হলে তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে এ নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা। সংসদীয় কমিটি সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই বৈঠক থেকে তদন্তসাপেক্ষে ওই দুটি প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সংসদীয় কমিটির সদস্য বলেন, প্রকল্পের কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রতিবেদনেই অনিয়মের চিত্র ফুলে উঠেছে। ফলে এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সরকারের উদ্দেশ্যেই ব্যর্থ হবে। এ কারণে প্রকল্পের কাজে মনিটারিং জোরদার করতে বলা হয়েছে।

সংসদীয় কমিটিতে উত্থাপিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কেইস প্রকল্পে একই ব্যক্তি ঘুরে ফিরে প্রশিক্ষণের নামে গেছেন বিদেশ ভ্রমণে। এক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ (পিডি) প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ২৯৯ জন ব্যক্তি অবৈধভাবে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে সিটি মেয়র, কাউন্সিলর, সিটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওসি থেকে কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা তালিকায় রয়েছেন। ওই প্রকল্প শেষ না হতেই সুফল প্রকল্পে বিদেশ সফর শুরু হয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল