সর্বনিম্ন ৫ টাকা ভাড়া রাখে না কোনো পরিবহন

সিটিং-গেটলকে জিম্মি যাত্রী

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৪১ | আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৪৯

কাইয়ুম আহমেদ

ঢাকায় গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য থামছেই না। সিটিং, গেটলক, স্পেশাল ও বিরতিহীন নাম অনেক হলেও উদ্দেশ্য এক; অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। যাত্রীদের এক রকম জিম্মি করেই কোনো কোনো রুটে নেওয়া হচ্ছে তিন থেকে চার গুণ ভাড়া। যদিও দায় নিতে নারাজ বাস মালিক সমিতি। সমস্যা নিরসনে বাস পরিচালনার যে সমাধান বাতলে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, সেটিও ২০২০ সালের ডিসেম্বরের আগে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দেখছে না খোদ বিআরটিএ। এ অবস্থায় এই সিটিং আর গেটলকে জিম্মি হয়ে পড়েছেন নগরবাসী।

রামপুরা ব্রিজ থেকে বনশ্রী আইডিয়াল দুই কিলোমিটার। কিলোমিটার প্রতি বিআরটিএ নির্ধারিত বাস ভাড়া ১ টাকা ৭০ পয়সা হিসেবে এতটুকু রাস্তার ভাড়া কোনোভাবেই পাঁচ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ রুটে চলাচলকারী যেকোনো বাসে এ দূরত্বের জন্যই গুনতে হচ্ছে কমপক্ষে ১০ টাকা। আইনের তোয়াক্কা না করে সিটিং, গেটলকের নামে দেদারসে চলছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। ‘ওয়েবিল’ পদ্ধতিতে ভাড়া ঠিক করায় সবচেয়ে ভোগান্তিতে কম দূরত্বের যাত্রীরা। কারণ দূরত্ব যাই হোক চেকার যাত্রী সংখ্যা উল্লেখ করার পর সব যাত্রীকে গুনতে হয় একই ভাড়া।

বিগত ২০১৭ সালের এপ্রিলে সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত হলেও পরে আর তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সিটিং সার্ভিসের নামে যাত্রী হয়রানির দায় নিতে রাজি নয় মালিক সমিতি। নিউ ভিশনের একটি বাসে পল্টন থেকে কারওয়ানবাজারে যাচ্ছিলেন জিয়াউদ্দিন। সুপারভাইজার ভাড়া চাইলেন ১৫ টাকা। ১০ টাকায় নিত্যদিন চলাচল করেন জানালে সিটিং সার্ভিসের লোগো দেখিয়ে দেন ভাড়া তোলা শ্রমিক। অথচ ওই সময়েও বাসে পাঁচ থেকে ছয়জন যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভাড়া বেশি চাওয়ায় বাগ্বিত-ার এক পর্যায়ে শাহবাগের যানজটে বাস থামিয়ে ওই যাত্রীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করেন বাসের সুপারভাইজার ও চালকের সহকারী।

নিউ ভিশনের এই চিত্র প্রায় প্রতিটি রুটে প্রতিনিয়ত ঘটছে। সিটিং সার্ভিসের নামে নৈরাজ্য চলছে নগরজুড়ে। নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতেই এভাবে সিটিং নামে গাড়ি চালায়, তবে ঠেসে উঠানো হয় যাত্রী। সিটিং সার্ভিস বলে আলাদা কোনো সার্ভিস নেই আইনে। কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কৌশল হিসেবে রাজধানীতে বাস মালিকরা এই সেবা চালু করে নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ, কখনো তিন গুণ বা তার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করছেন।

২০১৭ সালের মে মাসে বিআরটিএ এভাবে অবৈধভাবে সিটিং হিসেবে বাস চলা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু মালিকরা পাল্টা কৌশল নিয়ে বাসের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া, যাত্রীদের ‘শায়েস্তা করতে’ বাসে মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, মোড়ে মোড়ে অযথা বিলম্বসহ নানা কৌশল নেন। এক সপ্তাহ এভাবে চলার পর অভিযান বন্ধ করে বিআরটিএ।

তখন তিন মাসের মধ্যে নীতিমালা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের শেষ দিকে হুলুস্থুলের পর ওই বছরের ২৫ অক্টোবর এক মাসের মধ্যে সিটিং সার্ভিসের নীতিমালা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে প্রায় ৬৫ সপ্তাহ পেরিয়ে গেল, আসেনি সেই নীতিমালা। আর এই সুযোগে যাত্রী হয়রানি আর পকেট কাটা চলছেই।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সিটিং সার্ভিসের এই নীতিমালা নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। এই যে নীতিমালাই বলেন, নিয়মকানুন বলেন আর আইন-কানুন যাই বলেন দিন শেষে সব সুবিধা মালিকদের দিকেই যাচ্ছে। কমিটিতে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। তখনই বুঝলাম এটা নিয়ে একটা তামাশা করা হচ্ছে। সিটিং সার্ভিসের নামে মালিকদের সুবিধা করা হচ্ছে। এতে করে জনসাধারণের শান্তি আসবে না এবং সরকারও ভবিষ্যতে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়বে।

পরিবহন মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘সিটিং সার্ভিস নীতিমালার সুপারিশ আরটিসিতে পাঠানো হয়েছে। এটা এখন তাদের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে, আমাদের হাতে আর নেই। তারা অনুমোদন দিলে বাস্তবায়ন শুরু হবে। শুধু নেগেটিভ বললে হবে না, সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আমরাও চাই রাজধানীর বাসগুলো আরামদায়ক হোক, সে ক্ষেত্রে ভাড়াও সমন্বয় করা হোক। তাতে আমাদের আপত্তি নেই।

সব রুটে নিত্যদিন ঠকছেন যাত্রীরা : রাজধানীর বিভিন্ন রুটে লোকাল এবং গেটলক সিটিং নামে দুই ধরনের বাসসেবা চালু আছে। লোকাল বাস সব জায়গায় দাঁড়াবে এবং আসনের বেশি যাত্রী উঠবে আর গেটলকে এটা হবে না এটাই হওয়ার কথা ছিল চিত্র। তবে হাতে গোনা দু-একটি বাস আছে, যারা সব জায়গায় দাঁড়ায় না আর আসনের বেশি যাত্রী তোলে না।

গাজীপুর থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত চলাচলকারী বলাকা পরিবহনে আসনের বেশি যাত্রী তোলার কথা নয়। ভাড়াটাও সেভাবে নির্ধারণ করা। সিটিং সার্ভিস করার পর ভাড়া বাড়িয়ে কয়েক দিন যাত্রীসেবার মান ছিল ভালো। কিন্তু এখন প্রতিটি আসনে যাত্রী থাকার পরও প্রায় প্রতিটি স্টপেজেই যাত্রীর জন্য ডাকাডাকি করেন চালকের সহকারীরা। আর যাত্রীরা নিত্যদিন করেন ঝগড়া। কিন্তু ভ্রƒক্ষেপ নেই চালকদের।

যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বাস রুট ফ্র্যাঞ্জাইজি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারলে শুধু ভাড়ার নৈরাজ্য কমবে না, সবদিকে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

পিডিএসও/তাজ