সংসদে প্রধানমন্ত্রী

প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকতো না

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:২৭

সংসদ প্রতিবেদক

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসন এবং আন্দোলনের নামে অগ্নিসন্ত্রাস ও পুড়িয়ে মানুষ হত্যার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ মানুষ হত্যার রাজনীতি করে না, প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসীও নয়। সেটা বিশ্বাস করলে এদেশে বিএনপির অস্তিত্ব থাকতো না।

সংসদ নেতা বলেছেন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যার অন্যতম কাজ ও দায়িত্ব হচ্ছে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজের সমন্বয় করা। মন্ত্রীদের কাজের তদারকি করা। জনগণ তাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। আরাম-আয়েসের জন্য প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেননি তিনি।

বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এদিন সংসদের বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যের লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের লিখিত জবাবে শেখ হাসিনা আরও বলেন, বিএনপি সরকারের সময় তাদের হাতে আওযামী লীগ যে পরিমাণ হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে তা আর কেউ হয়নি। এদেশে জঙ্গি সৃষ্টি, অগ্নিসন্ত্রাস, বোমা হামলা, মানি লন্ডারিং, এতিমের টাকা আত্মসাতসহ হেন অপকর্ম নেই যে খালেদা জিয়া, তার দুই ছেলে এবং তার দলের নেতারা করেননি।

এর আগে রুমিন ফারাহানার প্রশ্ন ছিল - দেশে বর্তমানে মানুষ হত্যা হতে মশা মারা পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রয়োজন হয়। এমন প্রশ্নের তীব্র সমালোচনা করে লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি (রুমিন) একটি অনাকাঙ্খিত, অসংসদীয় ও অবান্তর প্রশ্ন এনেছেন। তিনি মানুষ হত্যা আর মশা মারাকে একই সমতলে নিয়ে এসেছেন। সংসদ সদস্যের নেত্রী খালেদা জিয়ার মত দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালেই কি প্রশ্নকারী খুশী হতেন?

তিনি বলেন, রাষ্ট্র একটি যন্ত্রের মতন। এই যন্ত্রের বিভিন্ন কল-কব্জা যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তখনই রাষ্ট্র ভালো থাকে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র ভালোভাবে কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানের অকার্যকর হওয়ার কথা উনি (রুমিন) বলছেন। অকার্যকর রাষ্ট্রের উদাহরণ তো বিএনপিই সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতো রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তির কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী ঘুমিয়ে থাকতেন, সিদ্ধান্ত দিতেন তার পুত্র হাওয়া ভবন থেকে। মন্ত্রী-সচিবরা হাওয়া ভবন থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুণতেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা এবং জনগণের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজকে বাংলদেশ বিশ্বে একটা মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে, জিডিপি’র প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বসেরার জায়গায় দখল করেছে। এসব আপনা আপনি হয়নি। সকলের পরিশ্রমে হয়েছে। প্রতিষ্ঠান অকার্যকর থাকলে এসব অর্জন সম্ভব হতো না।

সংসদ নেতা বলেন, প্রশ্নকর্তা বিএনপি এমপির দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের রক্তে রঞ্জিত হয়ে খুনীদের সহায়তায় ক্ষমতায় বসেছিলেন। জিয়াউর রহমানের প্রতিহিংসার বলি হয়ে জেলখানায় নির্মমভাবে নিহত হন জাতীয় চার নেতা। জিয়াউর রহমানই তো এ দেশে হত্যা, ক্যু’র অপরাজনীতি শুরু করে। সশস্ত্র বাহিনীর শত শত অফিসার, সৈনিককে হত্যা করে। ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের সংস্কৃতি চালু করে। একটা পুরো প্রজন্মকে নষ্ট করে দেয় এই মেজর জিয়া। তাই বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যের মুখে মানুষ মারার বিষয়টি অবলিলায় চলে আসে। এটাই তো তাদের দলীয় আদর্শ। আর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া যে তার (জিয়া) চেয়েও এক কাঠি সরেস- সে প্রমাণ তিনি করেছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রশ্নকর্তার নেত্রী খালেদা জিয়াও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার শাসনামলের ৫ বছরে আওয়ামী লীগের ২১ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকেসহ আওয়ামী লীগের পুরো নেতৃত্বকে নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় মদদে খুনের নেশায় মত্ত হয়েছিল তার দল বিএনপি।

তিনি বলেন, দেশবাসী নিশ্চয়ই ভুলে যাননি ২০১৪ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা। বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসের কথা। প্রশ্নকারী বিএনপির এমপির দল বিএনপি নারী ও শিশুসহ ৫০০ নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। নির্মমভাবে হত্যা করেছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর ২৪ সদস্যকে। ৫৮২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৩ হাজার যানবাহন, ২৯টি রেল, ৯টি লঞ্চ এবং ৭০টি সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগ করেছে। অসংখ্য বৃক্ষ নিধনসহ গবাদিপশু আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। তাদের অগ্নিসন্ত্রাসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিশু ও মহিলারাও।

গণফোরামের সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদের সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ যখন আমাকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছে এবং আমি যখন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি, তখন আমি মনে করি মানুষের ভালোমন্দ দেখা আমার দায়িত্ব। খালেদা জিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ’আমি তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। বেলা ১২টা পর্যন্ত তো ঘুমাই না। বলতে গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমাই। বাকি সময় দেশের কোথায় কী হচ্ছে খোঁজ রাখার চেষ্টা করি এবং তার সমাধান করি। তবে সবকিছু আমাকেই দেখতে হবে তা নয়।’

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৩ আগস্ট পর্যন্ত সরকার ১ লাখ ৫৭ হাজার এসএস-ওয়ান কম্ব কিটসহ মোট ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২ শ’ ডেঙ্গু রোগ সনাক্তকরণ কিট আমদানি করেছি। গত ৬ আগস্ট থেকে বিদেশ হতে কাঁচামাল এনে দেশেই ডেঙ্গু রোগের কিট তৈরি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার কিট সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ডেঙ্গু রোগ সনাক্তকরণ কিট ঘাটতির কোনো সম্বাবনা নেই।

দেশবাসীকে ডেঙ্গু রোগ মোকাবেলায় নিজ নিজ এলাকায় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সারাবিশ্বে বিশেষ করে উষ্ণমন্ডলীয় ১২৭টি দেশে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ ও প্রাদূর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চিকিৎসা গাইড লাইন রয়েছে। এই গাইড লাইনের ভিত্তিতে ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছে। তারা স্থানীয় চিকিৎসক এবং নার্সদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রুমানা আলীর প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা জানান, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের চাপে মিয়ানমার দ্বিপাক্ষিক চুক্তিসমূহ স্বাক্ষর করলেও তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট গড়িমসি করে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী পরিচিতি যাচাইয়ের জন্য মিয়ানমারের কাছে আমরা এ যাবত ৩ দফায় ৫৫ হাজার ৫১১ জন রোহিঙ্গার তথ্য প্রদান করেছি।

তিনি জানান, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষাপূর্ব বিভিন্ন দফায় এ সকল রোহিঙ্গার ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে। তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আমরা দুই দফা প্রস্তুতি নেই। প্রথমবার গত বছরের ১৫ নভেম্বর এবং দ্বিতীয়বার চলতি বছরের ২২ আগস্ট আরেক দফা প্রত্যাবাসনের তারিখ ঠিক করা হয়। কিন্তু যাবতীয় প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কোনও রোহিঙ্গা ফিরে যেতে সম্মত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। কারণ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। তবে আশা করা যায়, বাংলাদেশের অব্যাহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ শিগগিরই রাখাইন রাজ্যে সহায়ক তৈরি করবে এবং দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করবে।

পিডিএসও/রি.মা