সেমিনারে মেয়র সাঈদ খোকন

‘দুই বছরের মধ্যে গণপরিবহনে ইতিবাচক পরিবর্তন’

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:০৩ | আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, প্রতিদিন শহরে বিভিন্ন দুর্ঘটনা হচ্ছে, এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। এসব দুর্ঘটনায় অনেকে প্রাণ হারাচ্ছে। কেউবা হতাহত হচ্ছে। বর্তমান সরকার গণপরিবহন খাতের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আমাকে প্রধান করে কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটি নগরবাসীর কাছে দুই বছর সময় চেয়েছে। এ সময়ের মধ্যে রাজধানীর গণপরিবহন খাতের ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হবে।

শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের কাউন্সিল হলে ‘গণপরিবহনের শৃঙ্খলা রক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

ডিএসসিসি মেয়র বলেন, ইতোমধ্যে গণপরিবহনের শৃঙ্খলা রক্ষায় ধানমন্ডি-নিউমার্কেট, এয়ারপোর্ট-গুলিস্তান এবং উত্তরা চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এরমধ্যে কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়ায় উত্তরা চক্রাকার বন্ধ করা হয়েছে। নতুন করে পুরান ঢাকায় চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু করা হবে। এভাবে ধারাবাহিক একটু একটু পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে দুই বছরে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

তিনি আরও বলেন, বৈঠকে কয়েকটা প্রস্তাব এসেছে যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এরমধ্যে পরিবহন ব্যবস্থাকে ‘বিজনেস মডেলে’ রুপান্তর করতে হবে। একটা ব্যবসা বান্ধব পরিবহন তৈরি করা গেলে নগরীতে টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এছাড়া বর্তমানে গণপরিবহনের মধ্যে বাসগুলোর পর্দা, গ্লাস, পাখাসহ আনুষাঙ্গিক কিছু কাজ করা গেলে মানুষ গণপরিবহনমুখি হবেন। আপনাদের ছোট ছোট কিছু উদ্যোগ বা পরামর্শ যা বাস্তবায়ন করা গেলে গণপরিবহন আরো সুন্দর হবে।

ডিএসসিসি মেয়র বলেন, গত একদশকে নগরী যেভাবে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, সে অনুযায়ি নগরের সেবাদাতা সংস্থাগুলো প্রবৃদ্ধি ঘটাতে সক্ষম হয়নি। যার ফলে যখন পরিবহনে সমস্যা দেখা দেয়, তখন তা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। আবার যখন মশাবাহিত রোগ দেখা দেয় তখন তা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয়। তবে এখন সময় এসেছে সক্ষমতা বাড়ানোর এবং সমন্বয়হীনতা দূর করানোর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেবাদাতা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে এবং সমন্বয়হীনতা দূর করতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া তিনি প্রকৌশলীদের ইলেকট্রিক গণপরিবহনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আহবান জানান।

ঢাকা মহানগর উত্তর ট্রাফিকের ডিসি প্রবীর কুমার রায় বলেন, পথচারীদের অসচেতনতার কারণে ৯০ ভাগ দূর্ঘটনা ঘটছে। ফুটওভার ব্রিজ থাকার পরও নগরবাসী সেসব ব্যবহার করছে না। এজন্য বনানীতে আমরা জনসেচতনতার জন্য একটি মডেল চালু করেছি।

তিনি বলেন, কেউ যদি ওই সড়কে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে সড়ক পারাপারের চেষ্টা করে; তবে তাকে এক ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এসময় তাকে ৫ মিনিটের চেয়ে যে জীবনের মূল্য বেশি সে বিষয়ে বোঝানো হয় এবং ট্রাফিক আইনের গুরুত্ব বুঝিয়ে সচেতন করা হয়।

ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) পুরকৌশল বিভাগ এবং নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। আইইবির পুরকৌশল বিভাগের সভাপতি প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমানের সভাপত্বিতে গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, আইইবির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামান, সম্মানী সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মনজুর মোর্শেদ, পুরকৌশল বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী শেখ তাজুল ইসলাম তুহিন, নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম-বাংলাদেশের সভাপতি অমিতোষ পাল, সাধারণ সম্পাদক মতিন আব্দুল্লাহ প্রমুখ।

গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালনা করেন, আইইবির পুরকৌশল বিভাগে ভাইস-চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, নগর গণপরিবহনের সমস্যা সমাধানে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা বা এসটিপি করা হলেও বিগত তার তেমন কোনও বাস্তবায়ন নেই। ছাত্র আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রী ৫-৬টি নির্দেশনা দিলেও তার কোনও বাস্তবায়ন নেই।

তিনি বলেন, শহরে সিটি টার্মিনাল নেই। কেন্দ্রীয় ট্রাফিক সিস্টেম এখনো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। দেশে ভালো ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার বা ট্রাফিক ইকোনোমিস্ট নেই। গণপরিবহনের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হলে দূর্বলতাগুলোর সমাধান করে পরিকল্পিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং আইইবির পুরকৌশল বিভাগের ভাইস- চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিচালনা, সরবরাহ ও আইনগত অনেক ক্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে। এ ক্রুটিগুলোর সমাধান করা ছাড়া পরিববহন ব্যবস্থার উন্নতি করা সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, আমাদের শহরের সড়ক যোগাযোগের নানান সমস্যা রয়েছে। বেশির ভাগ সড়ক উত্তর ও দক্ষিণমুখি। একারণে পূর্ব-পশ্চিম মুখো চলাচলকারীরাও উত্তর-দক্ষিণমুখো সড়কে প্রবেশ করায় বিপত্তি ঘটছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার ১৬ ভাগ প্রতিবন্ধী রয়েছে। তাদের কথা মাথায় রেখে আমরা তেমন কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারিনি। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে আমাদেরকে নানাবিধ কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, কয়েক বছর ধরে আমরা শুনতে পাচ্ছি, শহরে কয়েক হাজার বাস নামানো হবে। কিন্তু, দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি দেখছি না। কয়েকটি বাস সার্ভিস চালু করা হলেও উত্তরা বাস রুট বন্ধ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করার আগে খুব চিন্তা-ভাবনা করে করতে হবে। কোন কারণে ব্যর্থ হলে সেটা নিয়েও গবেষণা করতে হবে। বছরের বেশির ভাগ সময় গ্রীষ্মকাল থাকায় এয়ার কন্ডিশন সিস্টেমের বাস বাড়ানো এবং ওয়ার্ড ভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।

রাজধানীর গণপরিবহন গবেষক প্রকৌশলী ড. আব্দুল আল মামুন বলেন, সিস্টেম ডেভেলপ করা গেলে ঢাকা শহরের গণপরিবহন পুরোপুরি শৃঙ্খলায় আনা সম্ভব হবে। এজন্য ‘বিজনেস মডেল’ গ্রহণ করে, তারই আলোকে ঢাকার গণপরিবহনগুলো কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে হবে।

পিডিএসও/রি.মা