রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আজ থেকে

*আজ যাবে সাড়ে ৩ হাজার *নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন চায় বেসরকারি সংস্থা

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৯, ০৮:০৬

কূটনৈতিক প্রতিবেদক ও উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

আজ থেকে শুরু হচ্ছে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরা। নিজ দেশ মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা এবার বাড়ির পথ ধরছে। গতকাল বুধবার বিকেলে পরররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আজ ২২ হাজার তালিকা থেকে ৩ হাজার ৫৪০ জনকে ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার। এ কার্যক্রম ঘিরে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে পুলিশ প্রশাসন। তবে যাদের ঘিরে এত আয়োজন সেই সব রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে যেতে মানসিকভাবে কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেক রোহিঙ্গা নেতা সাফ বলেই দিয়েছেন, তারা তখনই যাবেন যখন নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। অন্যদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলছেন, রোহিঙ্গাদের শেষ পর্যন্ত বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ-স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও। গতকাল মিয়ানমার এবং বাংলাদেশে কর্মরত ৬১টি স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, চলতি সপ্তাহের মধ্যে আনুমানিক ৩ হাজার ৪৫০ রোহিঙ্গা শরণার্থী তাৎক্ষণিক প্রত্যাবাসনের সংবাদ প্রকাশ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছাকৃত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিতের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় এই এনজিওগুলো। এনজিওগুলো মনে করে, রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যের সব সম্প্রদায় যাতে নিরাপদে থাকতে পারে এবং প্রাথমিক পরিষেবা ও জীবিকার সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারে তা মিয়ানমার সরকারের নিশ্চিত করা উচিত। বর্তমান সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে কর্মরত এই ৬১টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর।

অন্যদিকে যেসব রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠাতে প্রশাসনের এত প্রস্তুতি, তাদের নেতাদের মুখে ছিল ভিন্ন সুর। শালবন ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, তাদের আওতাধীন তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গারা দেশে ফিরতে রাজি নন।

নয়াপাড়া শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরের ডি-২ ব্লকের হেড মাঝি সৈয়দুল আমিন বলেন, আমাদের নির্যাতনের বিচার ও নাগরিক অধিকার না দেওয়া পর্যন্ত জোর করে মিয়ানমারে নিয়ে যেতে পারবে না। প্রয়োজনে এ দেশে গুলি করে হত্যা করা হোক, তাতে আমরা খুশি। এ দেশে অন্তত আমাদের মৃতদেহ জানাজা ও কবরের একটা জায়গা পাবে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশ মিয়ানমার, সে দেশে আমরা জন্ম নিয়েছি। সেখানে আমাদের অনেকের মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক মা-বোনকে নির্যাতন করা হয়েছে। বাড়িঘর, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই সময় কোনো উপায় না পেয়ে মুসলিম দেশ হিসেবে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছি। বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের মাঝে যেন শান্তি ফিরে আসে সে জন্য বাংলাদেশ চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে বহির্বিশ্ব আমাদের অধিকার নিয়ে মিয়ানমারকে চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে।

একই সুর আরেক মাঝি সুলতান মিয়ার কণ্ঠেও। তিনি বলেন, সিদ্ধান্তবিহীন মিয়ানমারের প্রত্যাবাসন নিয়ে মতামত দিয়ে কী হবে? আমরা তো আলোচনার মাধ্যমে যেতে চাই; কিন্তু মিয়ানমার তা মানছে না। মিয়ানমারের নির্যাতন থেকে বাঁচতে চাই। বাংলাদেশে আর পালিয়ে আসতে চাই না। নিজ দেশের নাগরিকত্ব, অধিকার, ফেলে আসা সম্পদ, ভিটাবাড়ি এবং জীবনের সুরক্ষার নিশ্চিয়তা ফেলে স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফিরে যেতে প্রস্তুত আমরা।

শুধু শালবন নয়, লেদা ক্যাম্প, আলীখালি, জাদিমোরা ক্যাম্প থেকেও তালিকায় আসা রোহিঙ্গাদের মনোভাব বোঝা গেল প্রায় একই রকম। তারা বলছেন, আগে দাবিপূরণ তারপর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন।

এ বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, রোহিঙ্গাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রত্যাবাসন স্থলপথে করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে মিয়ানমারকে। প্রতিদিন ৩০০ করে রোহিঙ্গাকে দেশে পাঠানো হবে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ২২ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার কথা রয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল