রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রস্তুত বাংলাদেশ

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৯, ০৯:৫৬

নিজস্ব প্রতিবেদক ও কক্সবাজার প্রতিনিধি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ। আনুষঙ্গিক যে প্রস্তুতি রয়েছে– তাও চলছে। তবে বারবার কথা না রাখায় এবারের প্রক্রিয়া নিয়েও কিছুটা শঙ্কা রয়েছে, তারপরও প্রত্যাবাসনের জন্য মাঠপর্যায়ে সবধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ। উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে। এ উপলক্ষে সীমান্তের কেরুনতলী এবং ঘুমধুম পয়েন্টে দুটি ট্রানজিট ক্যাম্প সংস্কার করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নবগঠিত রোহিঙ্গা সেলের মহাপরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রত্যাবাসনে সম্মত হওয়াটাই শেষ কথা নয়। তবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুরু হতে যাওয়াটা ইতিবাচক। আমরা সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রথম প্রত্যাবাসনের বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করছে।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, দুই দফায় ২২ হাজার ৪৩২ এবং ২৫ হাজার সাতজন রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদের মধ্য থেকে ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কীভাবে এবং কবে শুরু হচ্ছে সে বিষয়ে মুখ খুলছে না সংশ্লিষ্ট কেউই।

তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে আমি এখনো বিস্তারিত জানি না। এটুকু বলতে পারি, সরকার সিদ্ধান্ত নিলে মাঠপর্যায়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নের জন্য আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছি।

গত রোববারও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন টাস্কফোর্সের সদস্যরা। কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে বৈঠকে ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন হবে–এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রস্তুতির বিষয়ে আলোচনা হয়। কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের প্রস্তুতি শেষপর্যায়ে।

এদিকে মিয়ানমারের নেপিডোতে গত শুক্রবার দেশটির সরকারের মুখপাত্র জ থে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, দুই দেশ আগামী বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়েছে। তবে গত রোববার পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক এক অনুষ্ঠানে বলেন, যেকোনো সময়ে প্রত্যাবাসন শুরু হবে। পর্দার অন্তরালে অনেক কিছুর চেষ্টা হচ্ছে। তবে সব চেষ্টা সফল হবে এমন নয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর দিন-তারিখ না জানিয়ে তিনি আরো বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ আমরা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে উৎসাহিত করব। শুধু বাংলাদেশের নয়, প্রত্যাবাসন রোহিঙ্গাদেরও প্রধান উদ্দেশ্য। তারা সেখানে না ফিরলে সেখানকার সব অধিকার হারাবে।

উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ২ হাজার রোহিঙ্গা রাখাইনে প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়। কিন্তু নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় রোহিঙ্গারা ফিরতে অস্বীকৃতি জানালে পুরো প্রক্রিয়া থমকে যায়।

গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরো প্রায় ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়।

২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গাসহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩১টি ক্যাম্পে জড়ো করে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এরপর কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় তাদের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া চালানো হয়। কিন্তু দফায় দফায় চেষ্টা করেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি। গত বছরের শেষ সময়ে এবং চলতি বছরের শুরুতে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা দিয়েও সে কথা রাখেনি মিয়ানমার।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশটির নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। মিয়ানমার সরকার ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, রোহিঙ্গারা এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়।

সম্প্রতি মিয়ানমারের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, আগামী ২২ আগস্ট প্রায় সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার দিন ঠিক হয়েছে। গত মাসে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের বৈঠকে প্রত্যাবাসন চুক্তির অংশ হিসেবে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মিয়ানমারের হাতে যে ২৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা বাংলাদেশ দিয়েছিল সেখান থেকেই ৩ হাজার ৫৪০ জনকে নেওয়ার বিষয়ে ছাড়পত্র মেলার কথা জানিয়েছিলেন মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মিন্ট থু।

পিডিএসও/তাজ