পলাতক খুনিরা আজও অধরা

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৯, ০৯:৩৬ | আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৯, ০৯:৪৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যারা হত্যা করেছিল সেই খুনিদের পরবর্তী সময়ে বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পাঠায় তখনকার অবৈধ দখলদার খন্দকার মোশতাক সরকার। এর পরবর্তী সময়ে আসা সামরিক সরকারগুলোও একই কাজ করে। এমনকি খুনিদের বিচারের পথও রুদ্ধ করে রাখা হয়। জারি করা হয় কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অ্যাক্ট’।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইনডেমনিটি অ্যাক্ট বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায়ে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত আদেশ দেন উচ্চ আদালত। পরে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ হলে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কারাগারে থাকা পাঁচ খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। তারা হচ্ছে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন। এ ছাড়া খুনি আজিজ পাশা ২০০২ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা যায় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে। বাকি ছয় খুনিকে দেশের আনার প্রচেষ্টা শুরু হয় পাঁচ খুনির ফাঁসির রায় কার্যকরের পর থেকেই। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তারা এখনো অধরা।

আইনি জটিলতার কারণে ছয় খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এরা সবাই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব নিয়ম থাকায় পলাতকদের ফেরানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও বাংলাদেশ সরকার খুনিদের ফিরিয়ে আনতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরা হচ্ছে খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এ এম রাশেদ চৌধুরী, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও মোসলেম উদ্দিন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কানাডায় পালিয়ে থাকা খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আইনি লড়াই শুরু করেছে বাংলাদেশ। এ লড়াই শেষে তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আশাবাদী সরকার। একই সঙ্গে অন্য দেশে পালিয়ে থাকা খুনিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও নিজ নিজ দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে সরকার আশাবাদী হলেও খুনিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ ও জটিল। খুনিদের ফিরিয়ে এনে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকরের সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

পলাতক খুনিরা কে কোথায় : পলাতক ছয় খুনির মধ্যে এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী আছে কানাডায়। ১৯৭৬ সালে এ খুনিকে বেলজিয়ামে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিলে নূর চৌধুরী কানাডায় পালিয়ে যায়। একইভাবে ১৯৭৬ সালে খুনি এ এম রাশেদ চৌধুরীকে সৌদি আরবের জেদ্দা বাংলাদেশ মিশনে চাকরি দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে তাকেও দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিলে এই খুনি পালিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৭৬ সালে খুনি শরিফুল হক ডালিমকে চীনে কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়। পরে ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকার তাকে কেনিয়ায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করে। এ খুনি বর্তমানে কোথায় আছে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও বিভিন্ন সময়ে তার কেনিয়া, স্পেন ও পাকিস্তানে অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। এ খুনি বারবার বিভিন্ন স্থান পরিবর্তন করছে। ২০১৪ সালে খুনি ডালিমের মৃত্যুর গুজবও ছড়ানো হয়। খুনি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন বর্তমানে জার্মানিতে রয়েছে বলে সূত্র জানায়। অপর খুনি খন্দকার আবদুর রশীদকে সর্বশেষ পাকিস্তানে দেখা গেছে বলে সূত্র জানায়। তবে এ খুনিও বারবার অবস্থান পরিবর্তন করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া খুনি আবদুল মাজেদের অবস্থান ঠিক কোথায় তা নির্ণয় করা যায়নি।

খুনিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া যেভাবে চলছে : খুনিরা যেসব দেশে পালিয়ে আছে সেসব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে খুনিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে দেশগুলোর নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ায় নানা বাধ্যবাধকতার কারণে এ চেষ্টা সফল করা যাচ্ছে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কানাডা থেকে খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি লড়াই শুরু করেছে বাংলাদেশ।

সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরীকে কানাডা থেকে বহিষ্কারের আদেশ দিয়েছিলেন কানাডার আদালত। তবে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে খুনি নূর চৌধুরীর অন্য এক আবেদনে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকায় নূর চৌধুরী কানাডায় বসবাসের সুযোগ পাচ্ছে। এ আবেদনে সে কানাডা কর্তৃপক্ষকে জানায়, মৃত্যুদণ্ডের আদেশ থাকায় বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে।

সূত্র জানায়, কানাডা নীতিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা সমর্থন করে না। এ সুযোগ নিয়ে সহানুভূতি পাওয়ার কৌশল হিসেবেই কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে নূর চৌধুরী আবেদন করে। ঝুলে থাকা এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কানাডার ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে বাংলাদেশ। এ আবেদনটি কানাডার অ্যাটর্নি কার্যালয় খারিজ করে দিলেই খুনি নূর চৌধুরীক দেশে ফিরিয়ে আনতে আর কোনো বাধা থাকবে না। এ ছাড়া খুনি রাশেদ চৌধুরীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং মোসলেহ উদ্দিনকে জার্মানি থেকে ফিরিয়ে আনতে দুই দেশের সঙ্গেই কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। খুনি আবদুুর রশীদকে পাকিস্তানে দেখা যাওয়ার তথ্য পাওয়ার পর এ ব্যাপারে পাকিস্তানকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি নোট পাঠানো হয়। কিন্তু দেশটির সরকার তার কোনো জবাব দেয়নি। এ ছাড়া কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ডালিম ও আবদুল মাজেদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

পিডিএসও/হেলাল