৭০ শতাংশ বাড়িতে মিলেছে এডিসের লার্ভা

ডেঙ্গু নির্মূলে ২ সিটির সাফল্য মিলছে না

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৯, ০৮:১৬

হাসান ইমন

প্রতি বছর পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয়, কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও সচেতনতামূলক নানা উদ্যোগেও ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণে সফল হতে পারছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ডেঙ্গু দমনে উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কোনো উদ্যোগই সফল হয়নি। ফলে এখন রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের বর্ষাকালীন জরিপে প্রথম দুই দিনে প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়িতেই মিলেছে এডিসের লার্ভা। এরই মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) গত বছর লার্ভা ও মশার প্রজনন স্থল ধ্বংসের অনুসন্ধানে ১৮ বাড়ির মধ্যে ১১টিতে এডিস মশার লার্ভার অস্তিত্ব খুঁজে পায়।

আশঙ্কাজনক এমন তথ্যের লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি সংস্থাটি। তবে আজ থেকে ডিএসসিসি ৫৭টি ওয়ার্ডে এডিসের লার্ভা ধ্বংসে মাঠে নামবে বলে জানা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু দমনের দায় দুই সিটি করপোরেশন হলেও, শুধু তাদের দায়ী করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে এডিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় সম্ভব হবে না।

জানা যায়, গত বছর ডিএসসিসি অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভা ও প্রজননস্থল ধ্বংসের অভিযানে নামে। এতে স্থানীয় কাউন্সিলরদের প্রতিটি অঞ্চলে একটি করে কমিটি গঠন করে সংস্থাটি। লার্ভা ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের বিশেষ অভিযানের ডিএসসিসি একটি অঞ্চলের ১৮ বাড়িতে অনুসন্ধান চালিয়ে ১১টিতেই মশার লার্ভার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে গঠিত কমিটি। সূত্র জানায়, ডিএসসিসির অঞ্চল-১ এর কমিটি অঞ্চলটির ১৮টি বাড়ি পরিদর্শন করে। তারা ১১ বাড়িতেই মশার লার্ভা পেয়েছেন। এসব বাড়ির পানির ড্রাম, ফুলের টব, ঘরের আশপাশে পড়ে থাকা মাটির ভাঙ্গা হাঁড়ি-পাতিল, পরিত্যক্ত কলসি, বালতি, বোতল, কনটেনার, টায়ার, পলিথিন ব্যাগ, ছোট-বড় গর্ত, নালা ও পুকুরে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা রয়েছে। ওই সময় গঠিত কমিটি এডিসের লার্ভার ভয়ঙ্কর তথ্য বের করলেও সংস্থাটির মেয়র এডিসের লার্ভার ধ্বংসের আভাস দিয়েছিলেন। তবে এরপরে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। সম্প্রতি ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ায় দুই সিটি করপোরেশন সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে ডিএসসিসি আজ থেকে একযোগে ৫৭টি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এডিস মর্শার লার্ভা ও প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যক্রম চালাবে।

অন্যদিকে ডিএনসিসি মশক কর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে। একইসঙ্গে জনসচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এদিকে বর্ষার আগে ঢাকার দুই সিটিতে মশার ঘনত্ব নির্ণয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর একটি জরিপে ডিএনসিসির ৭টি ও দক্ষিণের ১৪টি ওয়ার্ডকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। কথা ছিল সেই অনুসারে কাজ করবে সিটি করপোরেশন। কিন্তু সেই জরিপের ফলাফলের চেয়ে পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে কয়েক গুণ। ডেঙ্গুর প্রোগ্রাম ম্যানেজার এম এম আকতারুজ্জামান বলেন, এই প্রতিবেদন আমরা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে দিয়ে দেব, যাতে তারা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কীটতত্ত্ববিদ পরিচালিত ১২টি টিম ১০ দিন ধরে এই জরিপ করবে।

এ বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ মো. খলিলুর রহমান বলেন, আমার মনে হয়, গেল কয়েক বছরের তুলনায় ঢাকাতে মশার পরিমাণ অনেক বেশি বেড়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, মশা জন্ম হওয়ার মতো কোনো অবস্থা যদি কারো বাসার ছাদে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রয়েছে সিটি করপোরেশনের। একটা অভিযান পরিচালনা করা গেলে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব।

অন্যদিকে গত এক মাস থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলছে। প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ জন। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ২৪৭ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাস থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ৩ হাজার ৬৪৭ জন। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি বলে মনে করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. শোয়েব মোমেন মজুমদার।

তিনি বলেন, প্রতিদিন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীরা আসছেন। এবারের সংখ্যাটা অনেক বেশি। বলা যায় যে, গত বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচগুণ বেশি। এমনও রোগী আছেন যারা দ্বিতীয়বারের মতো, তৃতীয়বারের মতো আক্রান্ত হয়ে আসছেন। তাদের অবস্থা বেশ জটিল। আর এবারের ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে মূলত তিন নম্বর প্রজাতির মশাগুলো। যেগুলোর কারণে রোগের জটিলতা অনেক বেড়েছে।

পিডিএসও/হেলাল