কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা

অরক্ষিত লেভেলক্রসিং যেন মৃত্যুফাঁদ

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৯, ১০:৪৫

নিজস্ব প্রতিবেদক

রেলের অরক্ষিত লেভেলক্রসিং এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতার কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। সেই সঙ্গে রয়েছে কর্তৃপক্ষের সচেতনতার অভাব। লেভেলক্রসিংয়ে প্রতি বছর শতাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ২ শতাধিক মানুষ। বিদ্যমান লেভেলক্রসিংয়ের প্রায় অর্ধেকই অনুমোদনহীন। গেটম্যান নেই অনেকগুলোয়। ফলে সেখানে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না।

রেলের দুর্ঘটনা নিয়ে এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশের পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মোট ১ হাজার ২৪৯টি লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে ১ হাজার ২৮টি সম্পূর্ণ অরক্ষিত। এ অঞ্চলে সুরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ের সংখ্যা মাত্র ২২১টি। অন্যদিকে অরক্ষিত এসব লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে ৭৫৭টির অনুমোদন দিলেও আর্থিক সংকট বা জনবলের অভাবের কারণে রেল কর্তৃপক্ষ এগুলোর সবক’টিতে এখনো গেটম্যান নিযুক্ত করতে পারেনি।

লেভেলক্রসিংয়ে গেটম্যান না থাকায় গত সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলায় বর-কনেবাহী মাইক্রোবাসে ট্রেনের ধাক্কা লেগে ১০ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো পাঁচজন। দুর্ঘটনার খবর শুনে বরের বাবাও শোক সইতে না পেরে মারা যান।

এ বিষয়ে উল্লাপাড়া ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবদুল হামিদ গণমাধ্যমকে জানান, বরযাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাস উল্লাপাড়া থেকে বেতকান্দি যাওয়ার পথে লেভেলক্রসিং পার হওয়ার সময় রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে প্রায় ২০০ গজ দূরে গিয়ে ট্রেনটি থামে।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সেই অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে অবশেষে ২ জন সিগন্যালম্যান নিযুক্ত করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সিগন্যালম্যান বিপ্লব কুমার দাস (৩০) এই কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। আজ শনিবার আরো একজন যোগদান করবেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, রেলক্রসিংগুলোয় নেই কোনো গেটম্যান, এমনকি অনেক গেটে কোনো ব্যারিয়ারও নেই। ফলে ঝুঁকি নিয়ে যেমন চলছে রেল, তেমনিভাবে লেভেলক্রসিং পার হচ্ছে শত শত মানুষ ও যানবাহন। আর এই ঝুঁকির মুখে লেভেলক্রসিংগুলোয় দুর্ঘটনায় হতাহতের কারণে পরিণত হয়েছে এক একটি মৃত্যুফাঁদে। আকস্মিক দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্টদের মাঝে বেশ দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়, কিন্তু তারপর আবারও পুরোনো অবস্থায় ফিরে যায়।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ লেভেলক্রসিংগুলোকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করেছে। এগুলো হলো স্বীকৃত ও অস্বীকৃত বা অবৈধ। স্বীকৃত ১ হাজার ৪১৩টি এবং অস্বীকৃত ১ হাজার ১২৬টি। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক তৈরির সময় রেল কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে যে ক্রসিংয়ের সৃষ্টি করেছে, সেটিকেই অস্বীকৃত বলা হয়। অবশ্য রেলওয়ের স্বীকৃত রেলক্রসিংয়েরও ৭৪ শতাংশের কোনো গেটম্যান বা গার্ড নেই। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, অরক্ষিত লেভেলক্রসিংগুলোর সুরক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ের যে আর্থিক অসঙ্গতি রয়েছে তা পূরণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে। আর পথচারী ও যানবাহনের আরোহীদের সতর্কতার সঙ্গে পথ চলতে হবে। সামান্য সময় বাঁচানোর জন্য মূল্যবান প্রাণের অপচয় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, যানবাহন ও জীবনের ক্ষতি এড়াতে কোনো কোনো জায়গায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেও লেভেলক্রসিং এলাকায় গাড়িচালকের অসাবধানতাই দুর্ঘটনার কারণ। পাশাপশি রেলগেট পারাপারের সময় জনসাধারণের উদাসীনতাকেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেন তারা।

এদিকে লেভেলক্রসিংগুলোয় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার দাবি করে দুর্ঘটনার জন্য সড়ক পথের যানচালক ও জনগণের নিয়ম মানার অনীহাকেই দুষছেন রেল কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ রেলেওয়ের জিএম মোজ্জাম্মেল হক বলেন, প্রত্যেক গেটেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা আছে, ব্যারিয়ার আছে, গেটম্যান আছেন—কিন্তু তারপরও এ দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় চালকরা জোর করে ঢুকে যান। তারও তো দায়িত্ব দেখেশুনে ক্রসিং পার হওয়া। একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, রেল ক্রসিংয়ের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি খুব বেশি ঘটেনি।

এদিকে লেভেলক্রসিংগুলোয় ফ্লাইওভার বা পাতাল সড়ক তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার পাশাপাশি ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি’ প্রচলিত এই কথাটি মানলে কমে আসবে রেল ক্রসিংয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। এসব অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ের ফলে ট্রেন চলাচলে চালকদেরও পোহাতে হচ্ছে নানা ঝক্কি-ঝামেলা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী তৌফিকুল ইসলাম জানান, রেলক্রসিংগুলো জনবলের অভাবে অরক্ষিত থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে শিগগিরই এগুলো আপগ্রেড করার একটি পরিকল্পনা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিয়েছে।

পিডিএসও/তাজ