হাতিরঝিলের আদলে সাজছে বুড়িগঙ্গা

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯, ১৬:২০ | আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০৮:৪৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

বুড়িগঙ্গার দ্বিতীয় চ্যানেলের পুরোটাই দখল আর দূষণের কবলে। চ্যানেলের দুটি শাখার একটি এরই মধ্যে বিলুপ্ত, অন্যটি উদ্ধারে পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। উৎসমুখ থেকে লোহারপুল পর্যন্ত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালাচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ। এদিকে বুড়িগঙ্গা উদ্ধার করে হাতিরঝিলের আদলে সাজাতে ১৩ সদস্যের কমিটি কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আদি বুড়িগঙ্গাকে আগের রূপের ফেরানো সম্ভব হলে বদলে যাবে ঢাকার একটি অংশ।

বুড়িগঙ্গার দ্বিতীয় চ্যানেলটি আদি বুড়িগঙ্গা নামে পরিচিত। ব্রিটিশ আমলে এই চ্যানেলে নোঙর করতো জাহাজ। এখন আর দেখে বোঝার উপায় নেই আগের সেই প্রবহমানতা।

বুড়িগঙ্গার দ্বিতীয় চ্যানেলটি উদ্ধার করতে ১৩ সদস্যের কমিটি ও আট সদস্যের উপকমিটি গঠন করা হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে। সীমানা নির্ধারণ, দখলদারদের তালিকা তৈরির কাজ করছে এ কমিটি। বর্জ্য অপসারণ ও দখল উচ্ছেদ করে চ্যানেলটি পুনরুদ্ধারের পর হাতিরঝিলের আদলে বিনোদন পার্ক, সবুজায়ন করা হবে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে। সচল হবে নৌপথও। কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চললে এ বছরই নতুন রূপ নিতে শুরু করবে আদি বুড়িগঙ্গা।

এই লক্ষ্যে নদী উদ্ধারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) চলমান উচ্ছেদ অভিযানে ৪২ দিনে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। আর দখলমুক্ত হয়েছে নদী তীরভূমির সাড়ে ৯৮ একর জায়গা। এদিকে ঢাকা নদীবন্দর এলাকায় দখলমুক্ত করা জায়গায় ৫২ কিলোমিটার ‘ওয়াকওয়ে’ নির্মাণ করছে বিআইডব্লিউটিএ।

বিআইডব্লিউটিএর প্রকল্পের আওতায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরভূমি সীমানা পিলার স্থাপন, ওয়াকওয়েসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। নদীর তীরভূমি ৫২ কিলোমিটার এলাকায় হাঁটার পথ ছাড়াও ১০ হাজার ৮২০টি সীমানা খুঁটি স্থাপন করা হবে, নির্মাণ করা হবে তিনটি ইকোপার্ক, ১৯টি আরসিসি জেটি, ১০০টি আরসিসি সিঁড়ি, ৪০৯টি বসার বেঞ্চ ইত্যাদি। এ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

গত মঙ্গলবার উচ্ছেদ অভিযানের চতুর্থ পর্বের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম দিনের অভিযানেও দুটি সাততলা ভবনসহ ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৪৭টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে বিআইডাব্লিউটিএ। এদিনও উদ্ধার হয়েছে নদী তীরভূমির প্রায় আধা একর জায়গা।

কামরাঙ্গীরচরের নবাবেরচর এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তরপাড় থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। এ সময় নদীর তীরের ৪৭টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। যা নদীর জায়গা দখল করে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়া নদীর দখলকৃত প্রায় আধা একর জায়গা অবমুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিআইডাব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন।

৪০তম দিনের অভিযানে নদী তীরে গড়ে তোলা দুটি সাততলা পাকা ভবন, একটি দোতলা, পাঁচটি একতলা ভবন উচ্ছেদ করা হয়। এছাড়া ১২টি আধা পাকা স্থাপনা, ১৯টি টিনের ঘর ও আটটি দোকান উচ্ছেদ হয়েছে বলে বিআইডাব্লিউটিএর পক্ষ থেকে জানানো হয়।

বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, এই প্রকল্পের ব্যয়ের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। এজন্য নদীতে সীমানা পিলার স্থাপন করতে হবে। সীমানা পিলার সঠিক স্থানে বসাতে দোকানপাট, স্থাপনাগুলো ভাঙতে হচ্ছে। এখন আর সময় দেওয়ার সময় নেই। আমরা যেখানে মানবিকতা দেখিয়েছিলাম, তারা সেখানেই পুনরায় বসবাসের চেষ্টা করেছে। নদীর ব্যাপারে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

গত ২৯ জানুয়ারি বুড়িগঙ্গা নদীর খোলামোড়া ঘাট এলাকা থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলা অভিযানটি তিন পর্বে পরিচালিত হয়। প্রতি পর্বে ১২ কার্যদিবস হিসেবে তিন পর্বে মোট ৩৬ কার্যদিবস অভিযান পরিচালনা করে বিআইডব্লিউটিএ।

তিন পর্বে চালানো অভিযানে নদী তীরভূমি দখল করে গড়ে তোলা ৫৩১টি পাকা ভবন, ৫৯৮টি আধাপাকা ভবন, ২৪৭টি সীমানা দেয়ালসহ ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৫৭৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে নদীর ৯১ একর জায়গা অবমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া জরিমানার মাধ্যমে আদায় হয়েছে ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। উচ্ছেদকৃত মালামাল নিলামে বিক্রি করে আরো ৫ কোটি ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা আদায়ের কথা জানান বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক। অভিযানে বাধা দেওয়া ও অবৈধভাবে নদী দখলের কারণে ২২ জনকে আসামি করে ছয়টি মামলাও করে সংস্থাটি।

পিডিএসও/হেলাল