‘চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে উন্নয়ন অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে দেশ’

প্রকাশ | ২৬ জুন ২০১৯, ১৮:০৯

সংসদ প্রতিবেদক

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশি-বিদেশি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে আমাদের আজকের বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ সরকারের জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশের এই উন্নয়ন এবং অদম্য অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছে। আশি’র দশকের তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ কাটিয়ে বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন বিস্ময় হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত উন্মোচিত হচ্ছে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার। রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়ন করে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তুলনীয় এক শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ, সুখী এবং উন্নত জনপদ।

বুধবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে টেবিলে উত্থাপিত এমপি মাহফুজুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি যে, পদ্মা সেতুর মত বৃহৎ প্রকল্প নিজেদের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। পদ্মা সেতুসহ আমরা ১০টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। ২০৪১ সালে ১৬ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি মাথাপিছু আয় নিয়ে বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশে পরিণত হবে। সোনার বাংলায় ’দারিদ্র্য’ হবে সুদূর অতীতের কোনও ঘটনা।

বিএনপি-জামায়াত জোটের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একবিংশ শতাব্দির শুরুতেই আওয়ামী লীগ সরকারের করা এই অগ্রযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। আবার দুর্নীতির চক্রে নিপতিত হয় দেশ। হাওয়া ভবনের নামে তারেক জিয়া চালাতে থাকে লুটপাট। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকের প্রায় সবগুলোতেই বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে থাকে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদে দুই তৃতীয়াংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। আমরা আবার দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার জন্য মনোনিবেশ করি। দেশ সবক্ষেত্রে এগিয়ে যায়।

পুলিশের সাবেক আইজিপি সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকরা স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে রাজী হয়নি। ফলে ২৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হয়নি। আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমারের সঙ্গে আমরা তিনটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন করেছি। চুক্তির একটিতে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে, দুই বছরের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে তথাপিও মিয়ানমার সরকার নানা টালবাহানা সৃষ্টি করে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, চুক্তিতে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, এ সকল বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার অধিবাসীদের নিরাপত্তা, সম্মান এবং স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। চুক্তির এ আদর্শ ও মূল বাণী বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার সরকারকেই উদ্যোগী ভুমিকা গ্রহণ করতে হবে এবং আশ্বাস প্রদান করতে হবে, কেননা মিয়ানমার সরকার নিজেরাই এ সমস্যা তৈরি করেছে। বিশ্ব জনমত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অব্যাহতভাবে আমাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ এ বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনে একটি রিপোর্ট প্রেরণ করেছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তাদেরকে এ বিষয়ে কাজ করতে দিচ্ছে না। মিয়ানমারের অসহযোগীতা সত্বেও আমরা দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক দুইটি পথই খোলা রেখেছি। বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী সকল বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিস্পত্তির বিষয়ে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সরকার দলীয় অপর সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আমাদের সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেড় কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সরকার দেশের বেকারত্ব দূর করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মকে মানব সম্পদে পরিণত করার লক্ষ্যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০)-এর কৌশল ও লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তিনি জানান, টেকসই উপায়ে মাঝারি ও চরম দারিদ্র্য নিরসনের সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রকৃত মজুরি প্রদান। এই লক্ষ্যে এই সব বেকার তরুণদের মানব সম্পদ হিসেবে উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে আমরা বেকার যুবকদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছি। 

সংসদ নেতা জানান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্রমবর্ধিত হারে নারী শ্রম শক্তির অংশগ্রহণের কারণে প্রায় ৩.১ শতাংশ হারে মোট শ্রমশক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পাঁচ বছর মেয়াদে ১২.৯ মিলিয়ন অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যার মধ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য ২ মিলিয়ন কর্মসংস্থান ও অন্তভুক্ত। প্রবাসে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বর্তমান ধারা অপরিবর্তিত থাকবে বলে আশা করা যায়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিদেশে শ্রমিক পাঠানো হয়েছে ৮ লাখ ৮০ হাজার। তিনি বলেন, বিগত ১০ বছরে দেশের ইপিজেডে ৩ লাখ ৫ হাজার ২৪২ জনলোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

বিকল্প ধারা বাংলাদেশের মহাসচিব আবদুল মান্নানের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ খাত ছিল বিদ্যুৎ। ৯ম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল মাত্র ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ক্যাপটিভসহ ২১ হাজার ৬২৯ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর হতে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নও স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বেশি থাকায় বর্তমানে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১২ হাজার হতে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ক্ষমতা বেশি থাকায় বর্তমানে সারাদেশে বিদ্যুতের কোনও ঘাটতি নেই। তবে গ্রীষ্মকালে সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা, গ্যাস সরবরাহের অপ্রতুলতা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। 

সরকার দলীয় সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিলের প্রশ্নের লিখিত জবাবে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা জানান, বয়স্ক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে বয়স্ক মহিলাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি ও চিকিৎসার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার সর্বপ্রথম ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছরে বয়স্ক ভাতা চালু করে। তখন বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ছিল মাসিক ১০০ টাকা এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩ হাজার। 

তিনি জানান, জনপ্রতি মাসিক ভাতার হার আমরা ৫০ টাকা বৃদ্ধি করেছি এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভাতাভোগীর সংখ্যা ৪০ লাখ জন। আগামী অর্থ-বছরে বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধি করে ৪৪ লাখে উন্নীত করা হবে। বয়স্ক ভাতা সহায়তার আওতা সম্প্রসারণ ও ভাতার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে আরও বৃদ্ধি করা হবে।  

পিডিএসও/রি.মা