পুরান ঢাকা পুনর্গঠন কবে?

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৯, ১২:৫৭ | আপডেট : ১১ জুন ২০১৯, ১৪:৪১

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিমতলী থেকে শুরু করে চুড়িহাট্টা। ৪০০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির পুরান ঢাকা। অধিক সংখ্যক জীবনহানির পরে বারবার উঠে এসেছে সরু গলির প্রসঙ্গ। সরকার প্রধানের নির্দেশনা সত্ত্বেও অগ্রগতি নেই গলি প্রশস্তের। জমির মালিকরা আস্থা রাখতে পারছেন না সেবাদানকারী সংস্থার ওপর। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জায়গা ছাড়তে রাজি নয় এলাকাবাসী। বুড়িগঙ্গার তীরে পুরান ঢাকা কয়েকশ বছর ধরে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে। অপরিকল্পিত নগরায়নের স্রোতে আসা বাড়তি মানুষের চাপ তাকে করেছে অসহায়। বহু আগেই বসবাসের অযোগ্য অংশে পরিণত হয়েছে পুরান ঢাকা।

জরাজীর্ণ ভবন, অপ্রশস্ত রাস্তা, ঘিঞ্জি পরিবেশসহ নানা অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায়ই এখানে দুর্ঘটনা ঘটে। যার সর্বশেষ নজির চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এ ঘটনার পর বিভিন্ন মহল থেকে পুরান ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর দাবি উঠেছে। যদিও এর আগে একবার এমন একটি পরিকল্পনা বেশ কিছুদূর এগোনোর পর থমকে যায়। আটটি মেট্রোপলিটন থানা এলাকা নিয়ে গঠিত পুরান ঢাকা নানা সমস্যায় জর্জরিত। ভবনগুলোর বেশির ভাগই জরাজীর্ণ। পুরান আমলের ভবনগুলোর অনুমোদন তো নেই-ই, গত এক-দুই দশকে নতুন করে গড়ে উঠা অধিকাংশ ভবনই কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেনি। তাতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়েছে।

রাজউকের পক্ষ থেকে পুরান ঢাকার সমস্যাগুলোকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেগুলো হলো—আবাসন; পুরোনো, জরাজীর্ণ ভবন, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস; অতি ঘিঞ্জি পরিবেশ; অপরিকল্পিত, ফুটপাতবিহীন, সংকীর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা; অপরিকল্পিত, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা; ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা; অপর্যাপ্ত, অস্বাস্থ্যকর পানি সরবরাহ; অপ্রতুল খোলা জায়গা ও গাছপালাহীন পরিবেশ; ভূমিকম্প ও অগ্নিদুর্ঘটনার অতি মাত্রার ঝুঁকিযুক্ত এলাকা; দূষণযুক্ত পরিবেশ; অপরিকল্পিত, অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধাদি। এর বাইরে আতঙ্ক হিসেবে পুরান ঢাকার অলিগলিসহ প্রধান সড়কগুলোতে ছড়িয়ে আছে রাসায়নিক পণ্যের বৈধ-অবৈধ গুদাম। নানা সময় এগুলো সরানোর কথা এলেও সেটি কার্যকর করা হয়নি। ফলে ছোট-বড় মিলিয়ে দুর্ঘটনা এখানে নিয়মিত বিরতিতেই ঘটে চলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবমিলিয়েই পুরান ঢাকার একটা পুনর্গঠন প্রয়োজন। শুরুতেই অবকাঠামোর দিকটাতে শৃঙ্খলা আনতে পারলে অন্য দিকেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে। আর যদি তা না করা যায় তবে ছোট-খাটো সংস্কারে পরিস্থিতির বিশেষ কোনো উন্নতি হবে না। এক কথায় পুরান ঢাকার জন্য প্রয়োজন আমূল সংস্কার।

পুরান ঢাকার আমূল সংস্কারের প্রসঙ্গটি আগেও একাধিকবার আলোচনায় এসেছিল। বছর দুই আগে পরিকল্পনা এগিয়ে গিয়েছিল অনেক দূর পর্যন্ত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কাগজে-কলমেই থেকে গেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, গলির মধ্যে আসলে যাওয়া-আসা করাটা খুব কষ্টকর। কারণ পাশাপাশি দুটি রিকশা চলে না। রাস্তাঘাট যেন বড় করা হয়। স্বাধীনতার পরেও দেশের ঐতিহ্যবাহী শহরকে ঘিরে নেওয়া হয়নি কার্যকরী কোনো পরিকল্পনা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, অপরিকল্পিত জায়গায় পরিকল্পিত করার জন্য টোটালি নতুন করে ভেঙে আবার করতে হবে। আর সেটি হতে হবে যৌথ; প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপের মধ্যে। জনগণ দেয় সম্পত্তি আর সরকার দেয় উন্নয়ন। অলিগলি প্রশস্তের মূল সমস্যা জায়গা। নগর প্রশাসন বা সরকারি সংস্থাগুলোর আশ্বাসে নির্ভরতা পাচ্ছেন পুরান ঢাকাবাসী।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, এখানে হাজার হাজার বাড়ি-ঘর হয়ে গেছে। তাদের পুনর্বাসন করার একটা বিষয় রয়েছে। অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে আমাদের সবকিছু করতে হবে। আস্থাহীনতার এই সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

পিডিএসও/হেলাল