ভোটার হালনাগাদ শুরু

রোহিঙ্গাদের জন্য বিশেষ সতর্কতা

প্রকাশ | ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১১:০৬

গাজী শাহনেওয়াজ

দেশের ১৩৫ উপজেলায় ছবিসহ ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে। কয়েক ধাপে এ হালনাগাদ শেষ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে একসঙ্গে চার বছরের ভোটার তথ্য সংগ্রহ করবে ইসি। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে যাদের বয়স ১৮ হবে তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ চলবে ১৩ মে পর্যন্ত।

এদিকে, এবার ভোটার হালনাগাদে নানা ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে কমিশনকে। এর মধ্যে বিশেষ সতর্কতা রয়েছে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকা থেকে দূরে রাখা। পাশাপাশি এবার তালিকায় নাম কর্তনের সময় জীবিত ভোটার যাতে মৃত না হয় সেজন্য সতর্কভাবে তালিকা সম্পন্ন করার তাগিদ রয়েছে ইসির। পাশাপাশি এবারই প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের হিজড়া সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ভোটার করার নিদের্শনা রয়েছে ইসির।

নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব (জনসংযোগ) এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, প্রতি বছর হালনাগাদ করতে গেলে প্রতিবারই জনবল নিয়োগ দিতে হয়। তাছাড়া কোনো বছর গুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্বাচন থাকলে সে বছর ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা কঠিন কাজ হয়ে যায়। যে কারণে ইসি ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যাদের বয়স ১৮ হয়েছে বা হবে তাদের তথ্য সংগ্রহ করবে। এদের মধ্যে যারা এখনই ভোটার হওয়ার যোগ্য তাদের ভোটার করে নেওয়া হবে। বাকিদের মধ্যে যখন যাদের বয়স ১৮ হবে তখন তাদের ভোটার করে নেওয়া হবে।

আর জনসংযোগের সহকারী পরিচালক আসাদুল হক বলেন, এবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ কয় ধাপে চলবে তা এখনো নির্ধারণ হয়নি। তবে মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) যে হালনাগাদ শুরু হচ্ছে এ ধাপে সারা দেশের উপজেলাগুলোর মধ্যে ১৩৫টিতে নাগরিকের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হবে। এ সময় ইসির তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করবে।

এর আগে কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, এবার হালনাগাদে যুক্ত হওয়া নতুন ভোটাররা আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারি তালিকাভুক্ত হবেন। জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের সময় তাদের হাতে স্মার্টকার্ড দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন ইসি সচিব। হালনাগাদে প্রায় ৮০ লাখ নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ হবে। কম বয়সীরা ১৮ বছর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তালিকাভুক্ত হবেন। হালনাগাদের সময় ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশের ছাপও নিয়ে রাখা হবে।

ইসি সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয় ২০১৭ সালে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে ২০১৮ সালে হালনাগাদের কাজ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি ৪২ লাখ।

কমিশন সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি বা তার আগে যাদের জন্ম তারা ২০২০ সালের নতুন ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। এছাড়া ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে যাদের জন্ম তাদের তথ্যও সংগ্রহ করা হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদের তথ্য সংগ্রহের এই কাজ চলবে আগামী ১৩ মে পর্যন্ত।

কমিশন সূত্র জানিয়েছে, এবার ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা ঠেকানো ইসির জন্য চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করে রোহিঙ্গাপ্রবণ ৩২ উপজেলাকে চিহ্নিত হয়েছে। স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে গঠন করা কমিটির সুপারিশ ছাড়া এসব উপজেলায় কাউকে নতুন ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া রোহিঙ্গারা যাতে কোনোভাবেই ভোটার হতে না পারে সে বিষয়ে ১০ দফা নির্দেশনাসহ কঠোর নজরদারি রাখতে মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারীদেরও নির্দেশ দিয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের ৩২ উপজেলা রয়েছে।

বিশেষ এলাকায় বিশেষ কমিটির যাচাই : রোহিঙ্গা অধ্যুষিত বিশেষ উপজেলা হলো কক্সবাজার সদর উপজেলা, চকরিয়া, টেকনাফ, রামু, পেকুয়া, উখিয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া। বান্দরবানের সদর, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, আলীকদম, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি। রাঙামাটির সদর, লংগদু, রাজস্থলী, বিলাইছড়ি, কাপ্তাই, বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি ও বরকল এবং চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, রাগুনিয়া ও কর্ণফুলী উপজেলা।

ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ তথ্য ফরমে প্রদত্ত সব জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর অলাইনে যাচাই করতে হবে। যাচাইকালে (ক) ভাই/বোনের ডাটাবেজে পিতা/মাতার নামের সঙ্গে আবেদনকারীর ফরম-১ এ উল্লেখিত পিতা/মাতার নামের মিল থাকতে হবে। (খ) চাচা/ফুফুর ডাটাবেজে তাদের পিতার নাম ও ঠিকানার সঙ্গে আবেদনকারীর বিশেষ তথ্য ফরমে প্রদত্ত পিতামহের নাম ও ঠিকানার মিল থাকতে হবে। (গ) প্রয়োজনে নিকট আত্মীয়ের মোবাইল নম্বরে কথা বলে তাদের পরিচিতি/তথ্য সম্পর্কিত বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে।

এছাড়া উপজেলা বিশেষ কমিটি প্রতিটি ফরম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাইপূর্বক সিদ্ধান্ত দেবে। রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার বিষয়ে যদি কেউ তাদের সপক্ষে সহযোগিতা অথবা মিথ্যা তথ্য দেন বা মিথ্যা/জাল কাগজপত্র সরবরাহ করেন অথবা সংশ্লিষ্ট কারো গাফিলতি ভোটার তালিকা আইন অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা করতে হবে।

এদিকে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচিতে এবার প্রথমবারের মতো হিজড়া জনগোষ্ঠীদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এর ফলে হিজড়া পরিচয়ে ভোটার হতে পারবেন তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকরা। ভোটার নিবন্ধন ফরমে ‘লিঙ্গ পরিচয়’ অপশনে নারী, পুরুষের পাশাপাশি হিজড়া রাখা হয়েছে।

এ সংক্রান্ত মাঠ অফিসে ইসি থেকে ১৬টি নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, ২০০১, ২০০২, ২০০৩ ও ২০০৪ সালের ১ জানুযারি অথবা তার আগে যাদের জন্ম তাদের এবং বিগত ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে যারা বাদ পড়েছিল তাদের তথ্য নিবন্ধনের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া এ কর্মসূচিতে ভোটার তালিকা থেকে মৃত ভোটারের নাম কর্তন এবং আবাসস্থল পরিবর্তনের কারণে স্থানান্তরের তথ্যও সংগ্রহ করা; তথ্য সংগ্রহকালে কোনো ব্যক্তির তথ্য ফরম পূরণের আগে তিনি এর আগে ভোটার হয়েছেন কি না তা অবশ্যই নিশ্চিত করা; বাদ পড়া ভোটারদের ক্ষেত্রে বাদ পড়ার কারণ যাচাইপূর্বক নিশ্চিত হওয়া; কোনো ব্যক্তির নামের আগে বা পরে কোনো পেশা, খেতাব, পদবি অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি সংযুক্ত না করা; ভোটারযোগ্য ব্যক্তির বাংলা নামের ইংরেজি বানান যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা; বাড়ি বাড়ি যাওয়ার সময় ভোটারযোগ্য অনুপস্থিত ব্যক্তিদের তথ্যাদি অবশ্যই রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করা।

হালনাগাদে উদ্বুদ্ধকরণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদকে সামনে রেখে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি নিতে ইসি থেকে আগেই নিদের্শনায় বলা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের, মসজিদে ইমামদের মাধ্যমে, নারী ভোটারদের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে আলাদা আলাদা প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালাতে বলা হচ্ছে। তথ্য সংগ্রহকারী যাতে প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে সে বিষয়েও তদারকি করবে ইসি।

ইসির কর্মকর্তা জানান, শুধু একটি জায়গায় বসে যেন তথ্য সংগ্রহ করা না হয়, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য নিতে হবে। তথ্য সংগ্রহকারীদেরও নজরদারিতে রাখা হবে।

পিডিএসও/তাজ