জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন

অধিদফতর করায় বাধা কী, কেউ জানে না!

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৫৮

জুবায়ের চৌধুরী

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও ৯ বছর ধরে আটকে আছে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন থেকে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন অধিদফতরে রূপান্তরের প্রজ্ঞাপনটি। তবে কী কারণে এটি আটকে আছে সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। দেশের সব ধরনের প্রতিবন্ধীদের একটি ছাদের নিচে সেবা দিতে ২০১০ সালে এটিকে অধিদফতরে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক চেষ্টায় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন অধিদফতরে রূপলাভের দিকে এগিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

২০১৪ সালে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনকে ‘প্রতিবন্ধী উন্নয়ন অধিদফতর’ নামে চূড়ান্ত অনুমোদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে মোতাবেক জনবল নিয়োগের সুপারিশও করা হয়। এরপর একই বছরের ২ এপ্রিল মিরপুরে অধিদফতরের নামে নামফলকও উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এতদিন পরও ফাউন্ডেশনকে অধিদফতরে রূপ দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। বাধ সেঁধেছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ৮ জুন প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনকে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন অধিদফতরে রূপান্তরের প্রস্তাবটি প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে প্রেরণ করবে। তার আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে সমাজকল্যাণ সচিব এবং অর্থ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব যৌথভাবে পর্যালোচনা করবে। সেই সিদ্ধান্ত হালে পায়নি। ফলে আটকে আছে অধিদফতর করার ফাইলটি।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মাহমুদা মিন আরা জানান, ফাউন্ডেশনকে অধিদফতরে রূপ দিতে সব কাজই প্রায় শেষ। এখন শুধু প্রজ্ঞাপন জারিই বাকি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও বেশ আন্তরিক। তবে কী কারণে প্রজ্ঞাপন আটকে আছে, সে বিষয়ে মন্তব্য না করলেও তিনি দাবি করেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। শিগগিরই হয়ত সুখবর আসবে।

প্রসঙ্গত, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে ১৯৯৯ সালে রাজধানীর মিরপুরের ১৪ নম্বরে প্রতিষ্ঠা করা হয় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। কিন্তু এই ২০ বছরে বেড়েছে প্রতিষ্ঠানটির পরিধি ও কাজ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে এর সেবা কার্যক্রম। ৬৪টি জেলা ও ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। এসব সেবা কেন্দ্রে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা পৌনে ৪ লাখ আর সেবাগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৫০ কোটি।

জানা গেছে, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন থেকে অধিদফতরে রূপান্তর হলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কর্মরতদের বেশির ভাগই হবে প্রতিবন্ধী। তাই অধিদফতর রূপান্তর প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্টদের জন্য বিশেষ সুযোগ নিয়ে আসছে। আবার অধিদফতর হলে কয়েকটি বাধাও সৃষ্টি হতে পারে। এখন ফাউন্ডেশনের অধীনে কয়েক হাজার লোক বিভিন্নভাবে কাজ করছেন। অধিদফতরে হলে তা সীমিত হবে। আর প্রস্তাবিত অধিদফতরে লোকবল নিয়োগের সুপারিশ আছে মাত্র ৩২০ জনের। তবে সব মিলিয়ে অধিদফতর করাকেই বড় প্রাপ্তি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ১০৩ প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে প্রতিদিনই নতুন-পুরোনো রোগীরা সেবা নিতে আসেন। এসব কেন্দ্রে রোগীদের জন্য অত্যাধুনিক ফিজিওথেরাপি, ক্লিনিক্যাল থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, ক্লিনিক্যাল স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, হিয়ারিং টেস্ট, ভিজ্যুয়াল টেস্ট, কাউন্সেলিং ও প্রশিক্ষণ সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও বিনামূল্যে সহায়ক উপকরণ যেমন কৃত্রিম অঙ্গ, হুইলচেয়ার, স্ক্র্যাচ, সাদাছড়ি ও ওয়াকিং ফ্রেমসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিটি কেন্দ্রে আলাদা অটিজম কর্নার রয়েছে। ঢাকার মিরপুরে আছে অটিজম রিসোর্স সেন্টার। ২০১১ সাল থেকে চালু আছে স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম। এটি একেবারেই অবৈতনিক স্কুল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অটিজমসহ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে ৩২টি ভ্রাম্যমাণ থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হচ্ছে।

চাকরিপ্রত্যাশী ও কর্মক্ষম প্রতিবন্ধী মানুষকে ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে মিরপুরে ৩২ আসনের দুটি হোস্টেল রয়েছে। আছে পিতৃ-মাতৃহীন প্রতিবন্ধী শিশু নিবাস। ১৫তলার মাল্টিপারপাস জাতীয় প্রতিবন্ধী কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য বেসরকারিভাবে গড়ে উঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রতি বছরই আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। গত দেড় যুগে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে সাভারে ১২ একর জমিতে আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রতিবন্ধী ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রক্রিয়াও চলছে। এখানে স্পেশাল অলিম্পিকের মতো বড় ইভেন্ট হবে। এ রকম নানা সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে উন্নত সেবা দিয়ে যাচ্ছে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটি অধিদফতরে রূপান্তর হলে সেসব সেবা কার্যক্রম আরো বেগবান হবে বলেও আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের।

পিডিএসও/হেলাল