সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে এবার!

*পুলিশ-মালিক ঐকমত্য *চুক্তিতে নয়, সব গাড়ি চলবে টিকিটে

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৯, ১০:৩২

নিজস্ব প্রতিবেদক

পুলিশের সড়ক শৃঙ্খলা সপ্তাহেই সুপ্রভাত বাস কেড়ে নিয়েছে শিক্ষার্থী আবরারের জীবন। এছাড়াও এই কর্মসূচির মধ্যেও প্রতিদিন অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এদিকে ট্রাফিক সচেতনতায় ট্রাফিক পক্ষ, ট্রাফিক মাস ও ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে মামলা-জরিমানাও। তবুও সড়কে ফিরছে না শৃঙ্খলা। সংশ্লিষ্টরা অমান্য করেই চলেছেন ট্রাফিক আইন।

ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, মামলা ও জরিমানার পাশাপাশি দরকার যাত্রী, চালক, পথচারী ও মালিকদের মধ্যে সচেতনতা, আইন মানা ও ধৈর্য ধরে সড়কে যানবাহন চালানো। তাই মতবিনিময় সভায় সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবার পরিবহন মালিক-পুলিশ একহয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে আয়োজিত ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও সচেতনতাবিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলেই আমরা আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যাই। জবাব দিতে পারি না। কিন্তু এটার পরিবর্তন হওয়া দরকার। বারবার বলছি কাজ হচ্ছে না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের (ট্রাফিক পুলিশ)। ট্রাফিক ব্যবস্থার জন্য আমাদের কিছু পদক্ষেপ নিতেই হবে। এখন আইনের কঠোর প্রয়োগে যেতে হবে। এবার থেকে কোনো পথচারী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ালে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আর বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত হোসেন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ চালকদের নেশা ও চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো। তাই এ দুটি পথই বন্ধ করতে হবে। সামনের মাস থেকেই সব গাড়ি টিকিট সিস্টেমে চলবে। এ সময়ের মধ্যেই বাস মালিকদের টিকিট সিস্টেমে বাস চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, জনগণ যেন ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করে, জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করে, সেজন্য ট্রাফিক বিভাগকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি। দুর্ঘটনা ঘটানোয় বাস যেমন জব্দ করেন, তেমনি দুর্ঘটনার কারণ হলে পথচারীকেও আটক করুন। আটক করে মিডিয়াকে দেখান, দেশের মানুষকে দেখান যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে, জেব্রাক্রসিং ছাড়া রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন। আমরা দুর্ঘটনা ঘটলে পুলিশকেও দায় দিচ্ছি। আবার পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু যেসব যাত্রী জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করছেন না, ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তায় হাঁটেন কিংবা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, কানে এয়ারফোন দিয়ে, মোবাইলফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পারাপার হচ্ছেন, তাদেরও দায়ী করতে হবে।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, বাসের দরজা যদি বন্ধ করে রাখেন এক স্টপেজ থেকে আরেক স্টপেজ পর্যন্ত তাহলে যাত্রী উঠতে পারবে না। এই অবস্থায় যাত্রীওবা কেন বাসটি দাঁড় করাবেন? নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ ছাড়া যাত্রী নামাবেন না। নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠাবেন না। আমি ট্রাফিক বিভাগের প্রতি নির্দেশ দিচ্ছি কোনো পরিবহন যদি এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে যেখানে-সেখানে বাস দাঁড় করায় ও যাত্রী ওঠায়-নামায়, দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে ওই পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। দোষ যদি হয় পথচারীর তাহলে কেন আটক হবে বাস ও বাসের চালক? ভিডিও করুন, জরিমানা শুধু নয়, আটক করুন। আইনগত ব্যবস্থা নিন। যেখানে মালিক-শ্রমিকের দায়িত্ব আছে, সেখানে পথচারীরও দায়িত্ব আছে। এই কাজগুলো এখন আমাদের করতে হবে।

মালিক-শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, চুক্তিভিত্তিক কাজ বন্ধ করুন। বেতনভিত্তিক মজুরি চালু করেন। বাসের রুট ঠিক রাখুন। এক লাইনের বাস অন্য লাইনে চলবে না। এক রুটে যদি বাস দরকার হয় ৫০টা, কিন্তু চলে ৮০টা। চালান সমস্যা নেই। কিন্তু সিটিং সার্ভিস চালু করেন। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়ানো হয়েছে। সেখানে প্রশিক্ষণ নিন।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে আটক করা হবে জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাচ্ছে, কীভাবে সম্ভব এটা? এটা হতে দেওয়া যাবে না।

নেশাগ্রস্ত চালকদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে সমিতির মহাসচিব এনায়েত হোসেন বলেন, চাইলে নেশাগ্রস্ত চালকদের ধরতে যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করান। আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

রাজধানীতে সব গাড়ি টিকিট সিস্টেমে চালানোর প্রসঙ্গ টেনে এনায়েত হোসেন বলেন, ঢাকা মহানগরীতে সব বাস টিকিট সিস্টেমেই চলত। বিএনপির আমলে সাদেক হোসেন খোকা একরাতের মধ্যে বাসের টিকিট কাউন্টারগুলো তুলে দিয়েছিলেন। এরপর রাস্তার পাশে ছাতার নিচে বসেই কাউন্টার তৈরি করে টিকিট বিক্রি চলছিল। ছিনতাইকারীরা টাকা লুট করতে শুরু করল। ফলে বাধ্য হয়ে একসময় চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো শুরু হলো। সেই সিস্টেমই এখনো চলছে। প্রথমে হয়তো আমরা কাউন্টার পাব না। সেক্ষেত্রে রাস্তার পাশে ছাতার নিচে টিকিট বিক্রি করব। এরপর আমরা ধীরে ধীরে আবার কাউন্টারে ফিরে যাব। আমরা টিকিট সিস্টেমে আবার ফিরে আসব। আমরা চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালাব না। এটি বন্ধ হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে। কারণ তাড়াহুড়া করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। চুক্তিভিত্তিক চালানোর ব্যবস্থা না থাকলে কেউ পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালাবেন না।

বাংলাদেশ সড়ক ফেডারেশনের মহাসচিব ওসমান আলী বলেন, ৪০ লাখ গাড়ি রয়েছে সারা দেশে। এর বিপরীতে লাইসেন্সধারী চালক আছেন মাত্র ২৩ লাখ। তাহলে বাকি গাড়িগুলো কীভাবে চলে? এ বিষয়ে বিআরটিএ’কে উদ্যোগী হতে হবে। চালকরা যেন দ্রুত লাইসেন্স পান। রাস্তা থেকে নসিমন-করিমন-ভটভটি-অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করতে হবে। মাঝে মধ্যে পুলিশ এসব বন্ধ করার উদ্যোগ নিলেও জনপ্রতিনিধিরা হস্তক্ষেপ করেন। ফলে এসব পরিবহন আবার চলে। তাই প্রধানমন্ত্রীকে উদ্যোগী হয়ে এসব জনপ্রতিনিধিদের কঠোরভাবে বলতে হবে, যেন তারা এসব ফিরিয়ে আনতে হস্তক্ষেপ না করেন।

পিডিএসও/হেলাল