চকবাজার ট্র্যাজেডি

লাশের খোঁজে মর্গ থেকে মর্গে

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৫২ | আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৫৬

জুবায়ের চৌধুরী

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬৭ জনের স্বজনদের কান্না যেন ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দিন ধরে শুধু চকবাজারের পোড়া ধ্বংসস্তূপের ছবি! একেকটি লাশ যেন একেকটি অমীমাংসিত গল্প!

সন্তানকে জড়িয়ে মা ও বাবার মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন, চায়ের আড্ডায় চারবন্ধুর খুনসুটি, বিয়ের ২৬ দিন পর স্বামীর এমন করুণ মৃত্যু কিংবা সন্তানের আবদারে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার চকবাজারে আসার নির্মম ও ট্র্যাজিক গল্পগুলো কাঁদাচ্ছে দেশবাসীকে।

ঘটনার পরদিন সকালে ঘটনাস্থলের দৃশ্য দেখলে এর ভয়াবহতার চিত্র যে কারোর গায়ে কাঁটা দেবে। রক্ত হিম হয়ে আসে। পুড়ে অঙ্গার হওয়া প্রাইভেট কার, রিকশা, ঠেলাগাড়ি ও মোটরসাইকেলের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এলোমেলো পড়ে আছে বডি স্প্রে, প্লাস্টিকের পোড়া বর্জ্য। আশপাশের বাড়ির ক্ষতবিক্ষত পোড়া দেয়াল থেকে খসে পড়েছে ইট-সুরকি আর টাইলস। ঘটনাস্থলের চারপাশে বাতাসে সুগন্ধি, কেমিক্যাল আর পোড়া লাশের গন্ধ। এমন নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ বলছে, কী মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটেছে। ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে তছনছ হয়ে গেছে একটি জনাকীর্ণ ও কোলাহলপূর্ণ জনপদ। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর জনপদে যেন জীবন থমকে গেছে। মৃত্যুর মিছিল আর পোড়া লাশের গন্ধ বিভীষিকাময় যন্ত্রণা হয়ে যেন ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়।

এমন গভীর বেদনার দৃশ্য যেন আবার মনে করিয়ে দিল ৯ বছর আগে পুরান ঢাকার নিমতলী অগ্নিকান্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা। আবারও যেন ফিরে এলো আরেক নিমতলী ট্র্যাজেডি। ৯ বছরের ব্যবধানে পুরান ঢাকায় একই শোকগাঁথা রচিত হলো। চুড়িহাট্টায় ঘটল নিমতলীর পুনরাবৃত্তি। বুধবার একুশের প্রথম প্রহর পার হওয়ার সময়ও কে জানত আরো একটি বেদনার প্রহর অপেক্ষা করছে জাতির জন্য। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে যারা নিখোঁজ রয়েছেন তাদের খোঁজে অনেক স্বজনই ভিড় করেছেন মর্গের সামনে। স্বজনহারাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। কেউ কেউ ঢাকা মেডিকেলে লাশ না পেয়ে ছুটে গেছেন অন্য হাসপাতালের মর্গে।

গত দুই দিন ধরে মর্গ থেকে মর্গে প্রিয়জনের লাশ খুঁজছেন তারা। নিহত ৬৭ জনের মধ্যে এরই মধ্যে শনাক্ত হওয়া ৪৬ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। সঙ্গে দাফনের জন্য প্রত্যেকের স্বজনকে ২০ হাজার টাকাও দেওয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের টাকাও দেওয়া হবে শিগগিরই। এদিকে যেসব লাশ পুড়ে যাওয়ায় চেনার উপায় নেই, তাদের স্বজনেরা জানেন না প্রিয়জনের লাশ কোথায় আছে। আবার যারা নিখোঁজ রয়েছেন— তারা বেঁচে আছেন নাকি পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন তা-ও জানেন না অনেকে।

শুক্রবার সকালেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ভিড় করেছেন অনেকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ২১ জনের লাশ শনাক্ত করা যায়নি। খোঁজ মেলেনি অনেকের। পরিচয়হীন ২১টি লাশ বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রয়েছে চারজনের লাশ। ১৫ জনের লাশ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এবং তিনজনের লাশ অন্য দুটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এসব লাশের নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এদিকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে লাশের সন্ধানে আসা স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। যাদের সঙ্গে ডিএনএ মিলে যাবে তারাই তাদের স্বজনদের লাশ ফিরে পাবেন।

৪৬ লাশ হস্তান্তর, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ : পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকান্ডে নিহত ৬৭ জনের মধ্যে শনাক্ত হওয়া ৪৬ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকের লাশ দাফনও করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এ লাশগুলো হস্তান্তর করে কর্তৃপক্ষ। এ দিন বেলা ১১টার দিকে লাশের সন্ধানে আসা স্বজনদের ডিএনএ পরীক্ষা শুরু হয়। যাদের সঙ্গে ডিএনএ মিলে যাবে তারাই তাদের স্বজনদের লাশ ফিরে পাবেন। তবে ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগবে।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার অ্যান্ড এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মনসুর জানান, মোট ৪৬টি লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ২১টি লাশ বিভিন্ন মর্গে রাখা হয়েছে। তাদের স্বজনদের ডিএনএ নমুনা গ্রহণ করছে সিআইডি। বাকিদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য শনিবার পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল মর্গ অফিসে থাকবে। এরপর থেকে সিআইডির ল্যাবে যোগাযোগ করতে হবে।

এদিকে সিআইডির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন জানান, লাশের সন্ধানে থাকা স্বজনদের রক্তের নমুনা রাখা হচ্ছে। সিআইডির অত্যাধুনিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি আছে, সেখানে নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হবে। এখন পর্যন্ত ১৫টি লাশের জন্য ২০ জন স্বজন এসে তাদের ডিএনএ নমুনা দিয়ে গেছেন। যারা নমুনা দিয়েছেন তাদের তালিকা ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। পুরো বিষয়টির জন্য ৭ থেকে ২১ দিন সময় লাগবে।

তিনি বলেন, বেশির ভাগই লাশ পোড়া, এ কারণে সময় লাগবে। এক্ষেত্রে ছয় মাসও সময় লেগে যেতে পারে। ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য নমুনা হিসেবে স্বজনদের তাদের রক্তের পাশাপাশি গালের অভ্যন্তরের টিস্যু সংগ্রহ করা হয়েছে। আর যে ২১ জন লাশ শনাক্ত করা যায়নি, তাদের পেশি, দাঁত ও হাড়ের নমুনাও সংগ্রহ করছেন সিআইডির কর্মীরা। শনাক্তের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের নমুনা হলে শনাক্ত করতে সহজ হবে। বাবা-মা না থাকলে সন্তান এবং স্বামী-স্ত্রীর নমুনা নেওয়া হচ্ছে। এরপর কাউকে না পাওয়া গেলে ভাইবোনের নমুনা নেওয়া হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুই মামলা : চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকান্ডে প্রাণহানির ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে চকবাজার থানার এসআই দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে গতকাল শুক্রবার সকালে জীবন্ত দগ্ধ আরাফাত ইসলাম সিয়ামের (১৯) আত্মীয় হাবীবুর রহমান রুবেল বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেন। এ মামলায় চুড়িহাট্টার হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক হাজি আবদুল ওয়াহেদের দুই ছেলে শহীদ ও হাসানসহ অজ্ঞাত ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য : গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম বলেছেন, ঘটনাস্থল থেকে অনেক ক্লু পেয়েছি। ধারণা করা হচ্ছে তিনটি কারণে আগুন লাগতে পারে। কারণগুলো হচ্ছে— ট্রান্সফরমার, গ্যাস সিলিন্ডার অথবা কেমিক্যাল বিস্ফোরণ। তিনি আরও বলেন, অনেকেই দুর্ঘটনাস্থলে থাকা একটি পিকআপ ভ্যানের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাতের কথা বলে আসছিলেন। কিন্তু সেই পিকআপের সিলিন্ডারটি আমরা অক্ষত অবস্থায় পেয়েছি।

প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক শামসুল আলম বলেন, ঘটনাস্থল এলাকায় বেশ কিছু কেমিক্যালের দোকান ছিল। ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচতলায় প্লাস্টিকের দানার দোকানও ছিল। সেসবই বিস্ফোরকদ্রব্য। এ কারণেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে আগুন লাগার ঘটনায় বিস্ফোরক পরিদফতর থেকে প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাতদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

প্রায় একই কথা বলেছেন ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমানও। তিনি বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে রাসায়নিকের মজুদ ছিল বলে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছিল এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। ভবনগুলোর মধ্যে সুগন্ধির ক্যান ছাড়াও লাইটার রিফিল করার ক্যানও ছিল। এসবই ছিল কেমিক্যাল। ঘটনার পরদিনই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তদন্ত কমিটির সদস্য বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, অগ্নিকাণ্ডে ওয়াহেদ ম্যানসনের নিচতলা ও দোতলার বিম ও কলাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনের সাপোর্ট ধরে রাখতে পারবে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করার জন্য ১১ সদস্যর কমিটি করেছে ডিএসসিসি। ওয়াহিদ ম্যানশন ভবনের অনুমতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এ দিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং অগ্নি দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সুপারিশ দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এ কমিটি আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করবে।

পিডিএসও/তাজ