প্রথম অধিবেশন ৩০ জানুয়ারি

বিরোধী দল থাকায় সংসদ হবে প্রাণবন্ত

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪৮

গাজী শাহনেওয়াজ
ama ami

নবগঠিত একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে আগামী ৩০ জানুয়ারি। এবারের সংসদের প্রধান আকর্ষণ হবে নতুন মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিদায়ী মন্ত্রী তথা অভিজ্ঞ পার্লামেন্টিরায়নদের আলোচনা-সমালোচনা। আর এখন সবার নজরে রয়েছে কে বা কারা হচ্ছেন চিফ হুইপ বা হুইপ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রধান। এছাড়া বিরোধী দল থাকায় এবার সংসদ হবে প্রাণবন্ত।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গতকাল এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন। ওইদিন বিকেল ৩টায় অধিবেশন শুরু হবে। এর আগে কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক হবে। এটা নতুন সরকারের প্রথম অধিবেশন। শীতকালীন অধিবেশনও। প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশনে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেবেন। তার ওই ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নেবেন সংসদ সদস্যরা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণ-নতুন মন্ত্রীদের নিয়োগের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, নতুন প্রজন্মকে সামনে নিয়ে আসতেই তিনি এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কাজেই নতুন মন্ত্রীদের কাজ ও তাদের দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি নিয়ে এবার সরকার ও বিরোধী দল থেকে গঠনমূলক আলোচনা হবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংসদবিষয়ক অভিজ্ঞজনরা।

এ সংসদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সেই সঙ্গে রয়েছে চমকে ভরা মন্ত্রিসভা। সংসদ বিষয়কসহ ৫১টি সংসদীয় কমিটির সভাপতি-সদস্য এবং স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নিযুক্ত হবে এ অধিবেশনে। এ লক্ষ্যে সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে।

আলোচনা রয়েছে নেপথ্যে থেকে সংসদ পরিচালনায় যারা ভূমিকা রাখেন সেই সরকারদলীয় চিফ হুইপ ও অন্য হুইপ কারা মনোনীত হচ্ছেন—এ নিয়ে আলোচনা রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সরকারি দলে। তবে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন থাকছেন স্বপদে—এটা অনেকটা নিশ্চিত হওয়া গেলেও তার রানিংমেট ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার পদে পরিবর্তন আসতে পারে—এমন আভাস আগেই মিলেছে। এমনকি সরকারদলীয় সংসদ উপনেতা কে হবেন, এ নিয়ে শোনা যাচ্ছে জোর গুঞ্জন। এ পদে আলোচনায় রয়েছেন দুই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু স্নেহধন্য তোফায়েল আহমেদ ও আমির হোসেন আমু।

সরকারের নিরঙ্কুশ বিজয়ের প্রথম দিনের উদযাপনে কিছুটা ছেদ পড়বে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। শুরুতে তার ওপরে শোক প্রস্তাব উত্থাপন হবে।

এদিকে, দশম জাতীয় সংসদ থেকে একাদশ জাতীয় সংসদে সরকার-বিরোধী দলে কিছুটা তফাত খুঁজে পাওয়া যাবে। কারণ এবার বিরোধী দল পুরোপুরিই বিরোধী দল। সংসদকে প্রাণবন্ত ও সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতে ভূমিকা রাখবেন তারা—এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর। দশম সংসদের মতো এবারও বিরোধী দলের আসনে বসছে জাতীয় পার্টি। তবে বিরোধীদলীয় নেতা পদে পরিবর্তন আসছে। গত সংসদে দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান রওশন এই পদে থাকলেও এবার জাপার চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রথমবারের মতো বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন।

এমনকি মহাজোটের শরিক কাউকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না দেওয়ায় তারাও সরকারের সমালোচনায় থাকবেন সোচ্চার। কারণ বিরোধী দলে দক্ষ ও পোড়খাওয়া রাজনীতিক রয়েছেন, এদের মধ্যে জাতীয় পার্টি-জেপির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, জাসদের হাসানুল হক ইনু-মঈন উদ্দীন খান বাদল ও ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন।

এবার ঐক্যফ্রন্টের সদস্যরা সংসদ ও শপথকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছেন। তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সাত এমপি শপথ নেননি। ফলে ওই বৃহৎ জোটটি ছাড়াই এবারও যাত্রা করতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ। অবশ্য শপথগ্রহণের সময়সীমা ৯০ দিন পার না হওয়া পর্যন্ত এটিকে বিএনপিবিহীন সংসদ বলা যাচ্ছে না। শরিকদের দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ানদের প্রত্যক্ষ ভূমিকায় প্রাণবন্ত হবে সংসদ; যাতে বিএনপির শূন্যতা পূরণে শরিকরা ভূমিকা রাখবে।

সূত্রমতে, সংবিধান অনুযায়ী বছরের প্রথম অধিবেশন শুরুর দিন রাষ্ট্রপতি সংসদে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বক্তব্য দেন। পরে রাষ্ট্রপতির ওই ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব জানাতে সাধারণ আলোচনা হয়। আবার চলতি সংসদের কোনো এমপি মারা গেলে অধিবেশন শুরুর পর মুলতবি করা হয়। তাই এবারের অধিবেশন শুরুর পর মুলতবি দিয়ে ওইদিনই আবারও শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।

সংসদ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের দুইবারের সাধারণ সম্পাদক এবং সদ্য বিদায় নেওয়া সরকারের জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হবে প্রথমে। এই প্রস্তারের ওপর মরহুমকে নিয়ে আলোচনার পর সংসদের বৈঠক কিছুক্ষণ মুলতবি করা হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন।

এদিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৭৪ অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। এ জন্য কমপক্ষে এক ঘণ্টা পূর্বে নোটিস দিতে হয়। একজন প্রস্তাবক, একজন সমর্থক ও প্রার্থীর সম্মতি লাগে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবার স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে সংসদে পাঠাবে। দশম সংসদের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে অধিবেশনে নির্বাচন সম্পন্ন হবে। এদিন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

এ বিষয়ে সংসদের আইন শাখার কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ছাড়াও প্রথম অধিবেশনে সভাপতিমন্ডলী মনোনয়ন, শোকপ্রস্তাব; অধ্যাদেশ উত্থাপন (যদি থাকে), সংসদীয় কমিটি গঠন (যদি থাকে), সংবিধান বা আইন অনুযায়ী কোনো রিপোর্ট উপস্থাপন (যদি থাকে) ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ থাকে। তবে রেওয়াজ অনুযায়ী প্রশ্নকাল থাকে না।

নতুন সংসদের শীতকালীন এই অধিবেশন কত দিন চলবে, তা কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। অধিবেশন শুরুর এক ঘণ্টা আগে সংসদ ভবনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সভাপতিত্ব করবেন। এতে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা উপস্থিত থাকবেন। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে বলে এই অধিবেশন দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

গত ৩০ ডিসেম্বর ২৯৯ সংসদীয় আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর নির্বাচিতরা গত ৩ জানুয়ারি সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে চার ধাপে শপথ নেন। এবারের নির্বাচনে ২৫৭টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টি পেয়েছে ২২টি আসন। বিএনপি পেয়েছে ৫টি আসন। ওয়ার্কার্স পাটি, বাসদ পেয়েছে ৩টি আসন, গণফোরাম দুটি (এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মোহাম্মদ মনসুর এবং গণফোরাম নিজস্ব প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে মোকাব্বির খান নির্বাচিত হয়েছেন), বিকল্পধারা বাংলাদেদুধুটি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদদুধুটি, তরিকত ফেডারেশন একটি, জাতীয় পার্টি (জেপি) একটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তিনটি আসনে জয়ী হন।

উল্লেখ্য, দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদপূর্ণ হচ্ছে ২৮ জানুয়ারি। পাঁচ বছর মেয়াদপূর্ণ করেই যাত্রা হচ্ছে একাদশ সংসদের।

পিডিএসও/হেলাল