একাদশ সংসদ নির্বাচন

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতে সতর্ক ইসি

প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:৪৫

প্রতীক ইজাজ
ama ami

জাতীয় নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে; উৎসবের পাশাপাশি উত্তাপও দেখা দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের মিছিল ও সভা-সমাবেশে বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘর্ষের খবর আসছে। বিশেষ করে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা ও ধানের শীষের প্রার্থীদের প্রচারকে কেন্দ্র করে এই উত্তাপ বেশি।

গত সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরুর পর থেকেই এই দুদল পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, লিফলেট বিতরণে বাধা, মাইক ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার অভিযোগ করে আসছে। এমনকি গতকালও রাজধানী ও সাতক্ষীরাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে এমন অভিযোগ এসেছে। এর ফলে ভোটের মাঠে উৎসবের আমেজ ও উত্তাপ দুটোই রয়েছে।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে সব দল ও প্রার্থীর জন্য ভোটের মাঠে সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সব প্রার্থীকেই সমান সুযোগ দিতে চায় ভোটের মাঠে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স অবস্থানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখার নির্দেশনাও দিয়েছে সংস্থাটি। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নির্বাচনের আগে ও পরে মিলে ১০ দিনের জন্য মাঠে নামছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ ক্ষেত্রে প্রতি জেলায় ছোট আকারে সেনাবাহিনীর একটি টিম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই টিম সিভিল প্রশাসনকে সাহায্য করবে। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিবেদন এবং সার্বিক দিক লক্ষ রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গতকালও ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের হয়রানি না করতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তিন শ আসনে নির্বাচন হচ্ছে। যেসব নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে, তা তুলনামূলক কম। তার পরও পুলিশকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এর আগে বিএনপি নেতাকর্মীদের পুলিশ গণহারের গ্রেফতার করছে— ইসির কাছে বিএনপি এমন লিখিত অভিযোগ ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ইসি সচিব। তিনি জানান, ওই কমিটি তদন্ত করে ইসিতে প্রতিবেদন পাঠাবে। কমিশন থেকেও পুলিশকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সিনিয়র কোনো নেতাকে যেন হয়রানি না করা হয়। কিছু অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সেগুলোর ব্যাপারের ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

তবে গ্রেফতারের মাধ্যমে বিএনপি নেতাকর্মীদের নির্বাচনী হয়রানির অভিযোগ সঠিক নয় বলে জানান ইসি সচিব। তিনি বলেন, যাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, তাদের অনেকের নামে আগেই গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। কিন্তু তারা আত্মগোপনে থাকায় তখন গ্রেফতার করা যায়নি। এখন নির্বাচন উপলক্ষে যারা প্রকাশ্যে আসছেন, পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত ইসির আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সমন্বয় সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন। তিনি আহ্বান জানান, নির্বাচনে সবার দায়িত্ব জনগণের জীবন রক্ষা, মালামাল রক্ষা, দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি শান্ত রাখা। পেশাদারি দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট সবার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও মানসিকতা কাজে লাগাবেন। গত নির্বাচনের মতো যেন এবার তাণ্ডব না ঘটে, সে রকম যেন সুযোগ সৃষ্টি না হয়, এখন থেকে সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ রাখতে হবে বলেও জানান ইসি প্রধান। এমনকি নির্বাচন নিয়ে তৃতীয় কোনো শক্তির ষড়যন্ত্র আছে কি না তাও খতিয়ে দেখার তাগিদ দেন সিইসি। ভোটের ভাগ্য যাতে মস্তান-সন্ত্রাসীদের হাতে চলে না যায়, সে ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেন।

এমনকি সুষ্ঠু নির্বাচনে ইসির এমন নির্দেশনা পালনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট সতর্ক থাকবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রধানরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যেকোনো ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে পুলিশ। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় তারা বিশেষ গুরুত্ব দেবে। কেউ নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় জড়ালে এবং ফৌজদারি মামলার যেকোনো আসামিকে আইনের আওতায় নিতে তৎপর থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ব্লক রেইড ও অভিযান জোরদার করা হবে। নির্বাচন ঘিরে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান কর্মকর্তারা।

নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করার কথা পুনর্ব্যক্ত করছেন ক্ষমতাসীনরা। গতকালও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচনে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের প্রার্থীদের ওপর হামলা হচ্ছে। সরকার হিসেবে সহিংসতাকে আমরা এড়িয়ে চলেছি যথাসাধ্য। সার্কুলারের মাধ্যমে আমরা আমাদের সব শাখাকে সহিংসতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছি। যতটা সম্ভব ধৈর্য ধরতে বলেছি।

অবশ্য বিএনপি শুরু থেকেই নির্বাচনী সহিংসতায় সরকারের লোকজন জড়িত বলে অভিযোগ করে আসছে। গতকালও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন বানচাল করে এককভাবে ক্ষমতায় থাকতে চায় আওয়ামী লীগ। ক্ষমতা দখলে রাখতে স্বৈরশাসন কায়েম করছে। নির্বাচনে সহিংসতা বাড়ছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে ইসির ন্যূনতম আগ্রহ নেই বলেও মন্তব্য করেন এই নেতা।

এমন নির্বাচনী উত্তাপ ও উৎসবের মধ্যেই গত বুধবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি এ সরকারের উন্নয়নের মহাসড়ক দিয়ে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে যাত্রার ধারাবাহিকতা যাতে অব্যাহত থাকে, সে জন্য আবার নৌকায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নৌকায় ভোট দিয়ে মানুষ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছিল বলেই গত ১০ বছরে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। বাংলাদেশ আজকে বিশ্বের রোল মডেল। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনতে হবে। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে আজ শনিবার ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ অভিমুখে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করবেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। এসব পথসভায় ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনসহ নেতারা বক্তব্য দেবেন। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারে নেমে গেছে।

তফসিল অনুসারে আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এবার নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে প্রার্থী চূড়ান্তকরণ নিয়ে ঘাম ঝরিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে, জোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে নাটকীয় সব ঘটনা ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সব দলের ও স্বতন্ত্র মিলে ২ হাজার ৫২২ জন প্রার্থী।

ইসি সূত্র মতে, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তৃতীয় শক্তি ষড়যন্ত্র করছে কি না— তা খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন সিইসি। বিশেষ করে সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের নির্দেশ দেন। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। তাদের পেশাদারিত্ব দেখাতে বলা হয়েছে। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কারো অতি-উৎসাহ বা নির্লিপ্ততা মেনে নেওয়া হবে না। এমনকি নির্বাচনের আগে কোনো কারণ ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহি করতে হবে বলেও ইসি নির্দেশনা দিয়েছে। ইসি নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে স্পষ্ট জানিয়েছে, নির্বাচনে কোনো ধরনের সহিংসতা ও প্রাণহানি হোক তা ইসি চায় না।

ইসি সূত্রগুলো আরো জানায়, সব ধরনের নাশকতা ও ষড়যন্ত্র বানচাল করতে ভোটের সময় মোবাইল নেটওয়ার্কের গতি ফোরজি থেকে কমিয়ে টুজিতে নামিয়ে আনা এবং ভোটের আগে তিন দিনের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচন-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থার রুদ্ধদার বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের আচরণ বিধিমালা প্রতিপালন ও সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, মাঠে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারলে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক বলা যাবে না। কোনো কারণ ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করলে সে জন্য জবাবদিহি করতে হবে। সবার প্রতি আইনের প্রয়োগ অভিন্ন হতে হবে।

অন্যদিকে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যেকোনো ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র। এসব সূত্র বলছে, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় তারা বিশেষ গুরুত্ব দেবে। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশন যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা পালনে যথেষ্ট সতর্ক থাকবেন মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা। কেউ নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় জড়ালে এবং ফৌজদারি মামলার যেকোনো আসামিকে আইনের আওতায় নিতে তৎপর থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ব্লক রেইড ও অভিযান জোরদার করা হবে। নির্বাচন ঘিরে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়া হবে।

পুলিশের উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তা আরো জানান, গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি ও দাগি অপরাধীদের গ্রেফতার করতে অভিযান চলছে। নতুন করে কেউ যাতে বেআইনি কাজে সংঘবদ্ধ হতে না পারে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নির্বিঘ্ন রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপর।

পিডিএসও/তাজ