এক কর্মকর্তার এত যোগ্যতা!

প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৩৩ | আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৪৬

হাসান ইমন

পড়াশোনা স্থাপত্যবিদ্যায় কাজ করছেন নগর পরিকল্পনায়। যোগ্যতা থাকার পরও অনেকেই প্রকল্প পরিচালনার অতিরিক্ত দায়িত্ব পান না অথচ যোগ্যতা না থাকার পরও তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন তিনটি প্রকল্পের প্রধান হিসেবে। অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা মূল্যায়িত না হলেও অনভিজ্ঞতাই তাকে নিয়ে গিয়েছে শীর্ষ পদে। অনেক যোগ্য এই কর্মকর্তা (!) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনা বিভাগের স্থপতি সিরাজুল ইসলাম। ২০০৪ সালের ১৮ অক্টোবর থেকে বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অস্থায়ী দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ওই সময় প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদের পদ দুটি শূন্য ছিল। ফলে পরবর্তী পদধারী স্থপতিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিভাগটি চালিয়ে নেওয়ার জন্য। এরপর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও অজ্ঞাত কারণে কর্তৃপক্ষ ওই পদে যোগ্য কাউকে নিয়োগ (!) দেয়নি। সাময়িকভাবে দেওয়া দায়িত্বটি দীর্ঘ ১৪ বছরে এসেও শেষ হয়নি। নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে এখনো কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। এছাড়া এ স্থপতিকে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নতুন করে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্প, ঢাকা ইন্ট্রোগেটেড আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ডিআইইউডিপি) ও ঢাকা সিটি নেগব্রোড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট (ডিসিএনইউপি) প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অভিজ্ঞদের এসব প্রকল্পের প্রধান করা হবে। অথচ কোনো রকম অভিজ্ঞতা না থাকার পরও সিরাজুল ইসলামকে অতিরিক্ত তিনটি প্রকল্প প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পে পিডি নিয়োগের রীতি অনুযায়ী সাধারণত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এককভাবে পিডি নিয়োগ দেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও বিভিন্ন প্রকল্পে পিডি নিয়োগ দিয়ে থাকে। কেবল আনুগত্যের জোরে অনেক অদক্ষ কর্মকর্তা পিডি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন- এর ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে। অদক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ায় অনেক প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। ফলে এসবের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ, আর মানুষের করের টাকার অপচয় হচ্ছে।

নিয়োগ বিধিমালায় বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশনের কোনো বিভাগের মূল দায়িত্বে যারা আসবেন তাদের প্রেষণে বা পদোন্নতির মাধমে আসতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে এ পদে নিয়োগের বেলায় বলা আছে—প্রেষণের বেলায় স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। উল্লিখিত ডিগ্রিসহ সমমানের পদমর্যাদায় সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকতে হবে। পদোন্নতির বেলায় বলা আছে, ঢাকা সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কমপক্ষে সাত বছরের অভিজ্ঞতা এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হবে। অথচ ডিসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদটি দখল করে আছেন জনবল কাঠামোর ৩ নম্বর পদবির স্থপতি মো. সিরাজুল ইসলাম। একজন স্থপতির যোগ্যতা হচ্ছে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রিধারী। এছাড়া আইনে আরো বলা আছে, একজন কর্মকর্তা একটি প্রকল্পের দায়িত্বে থাকবেন। তবে বিশেষ প্রয়োজনে একজনকে সর্বোচ্চ দুই প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। যেসব কর্মকর্তা দুইয়ের অধিক প্রকল্পের দায়িত্বে আছেন তাদের বাড়তি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। তবে অভিজ্ঞ ও দক্ষদের একাধিক দায়িত্বে বহাল রাখা যেতে পারে।

অথচ ডিএসসিসির এই স্থপতি সিরাজুল ইসলামকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ছাড়াও নতুন করে আরো বড় তিনটি প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো ঢাকা সিটি নেগব্রড আপগ্রেডিং প্রজেক্টটি (ডিসিএনইউপি) ৮৫০ কোটি টাকার প্রকল্প ও ঢাকা ইনটেগরেটেড আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ডিআইইউডিপি) প্রকল্পটি কোটি টাকার প্রকল্পটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বরে। এছাড়া নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পটি ১২৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি এ বছরের ১৪ আগস্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়। এত বড় প্রকল্পগুলোর দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে আগে ছোট ছোট প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু এ স্থপতি এর আগে কোনো প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, স্থপতি সিরাজুল ইসলামের স্থপতি বিভাগের কোনো সনদ নেই। আসলে তিনি ডিপ্লোমা করে এ পদে এসেছেন। একজন কর্মকর্তার এত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও নতুন করে আরো তিনটি প্রকল্পের দায়িত্ব কিভাবে পেতে পারে? এছাড়া একজন প্রজেক্ট ডিরেক্টরকে অবশ্যই প্রকৌশলী হতে হবে। যদি প্রকৌশলী জ্ঞান না থাকে তাহলে তিনি কীভাবে কাজ করবেন?

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্থপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের যোগ্যতা থাকায় আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি তো জোর করে দায়িত্ব নেইনি। প্রকল্পের বিষয়ে আমার বিষয়ে বিস্তারিত খুঁটিনাটি তথ্য নিয়ে যাচাই-বাছাই করে প্রজেক্ট ডিরেক্টর (পিডি) পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। যদি যোগ্যতা না থাকত তাহলে দায়িত্ব কিভাবে দিয়েছে?

তিনি আরো বলেন, আইন অনুযায়ী চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তারা প্রকল্পের দায়িত্ব পায়, সে হিসেবে আমি দায়িত্ব পেয়েছি।

একজন স্থপতি কীভাবে প্রজেক্ট ডিরেক্ট (পিডি) হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির সচিব শাহাবুদ্দিন খান বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলতে পারবেন।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমি এ পদে নতুন যোগদান করেছি। তবে সিরাজুল ইসলামকে অনেক আগ থেকে চিনি। তিনি পুরনো একজন কর্মকর্তা। আর তিনি একজন দক্ষ কর্মকর্তা। একজন স্থপতি কীভাবে প্রকল্প পরিচালক হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিরাজুল ইসলাম যেহেতু স্থপতি তাহলে তিনি এসব কাজ সম্পর্কে কিছু জ্ঞান রাখেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার পরও তিনি কীভাবে দায়িত্ব পেলেন, সে ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি মোস্তাফিজুর রহমান।

পিডিএসও/হেলাল