জাতীয় নির্বাচন

নানামুখী চ্যালেঞ্জে নির্বাচন কমিশন

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:১৪

গাজী শাহনেওয়াজ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও ইসি কর্মকর্তাদের কিছু বেফাঁস কথাও সংকটের সৃষ্টি করেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনায় বসে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বিএনপির জনসমর্থন নেই—মন্তব্য করে দলটির সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। বর্তমানে এসব চ্যালেঞ্জ সামলে নিরপেক্ষতা প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে কমিশন। গতকাল নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচন প্রশ্নে তারা কোনো কিছুতে আপস করবে না। নির্বাচনের দায়িত্বে গাফিলতি পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একইভাবে বিএনপির নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে মনোনয়ন ফরম বিক্রি ইস্যুতে পুলিশ-নেতাকর্মী সংঘর্ষের ঘটনায় প্রকৃত ঘটনার তথ্য চেয়ে গত বৃহস্পতিবার ইসি আগাম চিঠি দিয়েছে আইজিপির কাছে। এতে দলিলসহ প্রমাণের পাশাপাশি নিরপরাধ নেতাকর্মীদের হয়রানি না করতে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। ইসির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েক শ নেতাকর্মীকে হয়রানিমূলক মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে গত শুক্রবার ইসিতে একটা লম্বা তালিকা পাঠানো হয়। তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা নিয়ে ইসির সিদ্ধান্তহীনতা, ইভিএমে ভোট করা নিয়ে অবস্থান এবং নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগাম প্রচারসামগ্রী সরানো নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে নির্বাচন আয়োজনকারী এ সংস্থাকে। সঙ্গে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট-ঐক্যফ্রন্ট ও পৃথক জোটের রাজনৈতিক তৎপরতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে দুটি ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসহ সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে একটি জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা না করা এবং অন্যটি সেনাবাহিনী মোতায়েন ও তাদের ক্ষমতা প্রয়োগের এখতিয়ার নিয়ে। তবে, সেনাবাহিনীর বিষয়টি নির্বাচনের উদ্ভূত পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও ইভিএম ব্যবহার নিয়ে একাট্টা ছিল ইসি, যা প্রতিষ্ঠানটির একগুঁয়েমির অংশ বলে মন্তব্য করেছেন সুশীলসমাজের প্রতিনিধিসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, দু-চারটি দল বাদে অধিকাংশই ছিল এ প্রযুক্তির বিপক্ষে, অর্থাৎ আপাতত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবহার না করা। কিন্তু ইসি হঠাৎ তফসিল ঘোষণার কয়েক দিন আগে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে ইভিএমে নির্বাচন করার ঘোষণা দেয়। এতে ইসি কমিশনাররা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু সহকর্মীদের সঠিক পরামর্শ না মেনে ইসি ইভিএমে নির্বাচন করার দিকে ঝোঁকে। এখন নির্বাচনের অন্যান্য প্রস্তুতির সঙ্গে ইভিএমের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে গিয়ে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ইসি। এর আগে ৩০০ আসনের ১০০টি কেন্দ্রে এ প্রযুক্তির ব্যবহার করার ইচ্ছা থেকে সরে এসে সীমিত পরিসরে অর্থাৎ শহরকেন্দ্রিক কেন্দ্রে ব্যবহারের চিন্তা করছে। কারণ ইভিএম কেনার জন্য একনেক সভায় প্রকল্প অনুমোদন পেলেও অর্থের সংস্থান না থাকায় ত্রিমুখী চিঠি (অর্থ মন্ত্রণালয়-পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-ইসি) চালাচালি চলছে এখন। ফলে জাতীয় নির্বাচনের অন্যান্য প্রস্তুতির সঙ্গে ইভিএমের অর্থের সংস্থানের দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে কমিশন।

একইভাবে, নির্বাচনে সেনাবাহিনীর মোতায়েন নিয়েও দোলাচলের মধ্যে পড়েছে ইসি। গত বৃহস্পতিবার ইসি সচিব রিটার্নিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে নির্বাচনের সাত দিন আগে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেÑএমন ঘোষণা দিয়ে বসেন। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এতে বিকেলে বাধ্য হয়ে কমিশন সচিবের সকালের বক্তব্য কাটছাঁট করে বিকেলে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে জানাতে হয়। নির্বাচনের কয়দিন আগে সেনা মোতায়েন হবে, এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ আওয়ামী লীগ-বিএনপি বরাবরই সেনা মোতায়েন নিয়ে বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। বিএনপির দাবি, বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামাতে হবে সেনাবাহিনীকে। আর আওয়ামী লীগ সরাসরি সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে না থাকলেও প্রচলিত রীতির বাইরে তাদের দায়িত্ব না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে ইসিকে। তবে, আগামী ৩০ ডিসেম্বরের ভোটে স্ট্রাইকিং নাকি বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে ভোটকেন্দ্র পাহারায় থাকবে বিশেষ এই বাহিনী, এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে ইসি।

এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগাম প্রচারসামগ্রী অপসারণ নিয়ে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে কমিশন। কারণ গত ১৫ নভেম্বর এসব সামগ্রী আসার শেষ দিন ছিল, কিন্তু সেখান থেকে আরো তিন দিন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ইসি কাক্সিক্ষত সহায়তা না পাওয়ায় এখনো শহর-গ্রামজুড়ে শোভা পাচ্ছে রাজনৈতিক নেতাদের ছবিসংবলিত পোস্টার-ফেস্টুন। আজ রোববার শেষ হচ্ছে এই প্রচারসমাগ্রী সরানোর শেষ দিন। সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরিতে এসব নির্বাচনের প্রচারসামগ্রী বাধা। এতে ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই শিগগিরই প্রচারসামগ্রী অপসারণ না হলে নতুন করে সংকটে পড়তে পারে ইসি।

আর নির্বাচনে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ করা, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও চাপে রয়েছে ইসি। কারণ বিএনপিসহ অনেক জোট এই কর্মকর্তাদের নিয়ে আপত্তি তুলেছে। একইভাবে, পুলিশের অনেক কর্মকর্তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ থাকলেও নানা কারণে ব্যবস্থা নিতেও পারছে না ইসি। এ ছাড়া মন্ত্রী-এমপিরা স্বপদে থেকেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এ নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে প্রশ্ন তুললেও তা কৌশলে এড়িয়ে যান সিইসি কমিশনের সচিব।

উল্লেখ্য, ৮ নভেম্বর ইসির তফসিল ঘোষণার পর ভোটের তারিখ সাত দিন পেছিয়ে ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারণ হয়েছে। এর আগে ভোটের তারিখ নির্ধারণ ছিল ২৩ ডিসেম্বর। এখনো ভোটের তারিখ পেছাতে ইসির ওপরে চাপ দিয়ে যাচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নানামুখী চাপ সামলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করাই এখন ইসির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

পিডিএসও/হেলাল